সম্পাদকীয় অন্যায় করলে, পাপ করলে অন্তরে যে পীড়া উপস্থিত হয়, মানুষের সেইটুকুই সচেতন ভগবান, সেইটুকুই জাগ্রত সত্য। -কাজী নজরুল ইসলাম

স্ত্রীকে লাইভে রেখেই ...

প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১১-২০১৮ ইং ০১:৩২:৫৮ | সংবাদটি ১১২ বার পঠিত

ঘটনাটি কিছুটা অভিনব। প্রবাসী স্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কলে আলাপ করছিলেন স্বামী। এই অবস্থায় স্ত্রীকে লাইভে রেখে স্বামী আত্মহত্যা করে বসলেন। আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। তবে এই ‘নতুন ধরনের’ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। বেড়ে চলেছে এই আত্মহত্যার প্রবণতা। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন কোন ব্যক্তির জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, উপলব্ধি, অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, নিজেকে অসহায় ভরসাহীন মনে করে, তখনই ধর্মকর্ম ভুলে মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রচন্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে। আবার জাগতিক দুঃখ, কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে আত্মরক্ষা করতে দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। দেশে বর্তমানে বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষ শতকরা ১৬ ভাগ। সেই হিসেবে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় দুই কোটি ১৫ লাখ মানুষ মানসিক রোগী। আর এই রোগের চিকিৎসাও হচ্ছেনা সেভাবে। দেশে মাত্র তিনশ জন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। সবচেয়ে বড় কথা আত্মহত্যা একটা অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশের হিসেবে শুধু ২০১৭ সালেই দেশে আত্মহত্যা করেছে ১১ হাজার ৯৫ জন। গড়ে দৈনিক ৩০ জন আত্মহত্যা করেছে। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১০ হাজার ছয়শ’ এবং ২০১৫ সালে ১০ হাজার পাঁচশ’ জন। তার মানে প্রতি বছরই আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরে যতো মানুষ আত্মহত্যা করে তার দশজন আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। বেশিরভাগই আত্মহত্যা করছে আবেগতাড়িত হয়ে। হতাশা, প্রেমে ব্যর্থ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য, মা বাবার সঙ্গে ঝগড়া, ইভটিজিং, যৌতুক, সম্ভ্রমহানি, দারিদ্র ইত্যাদি কারণে তরুণ-তরুণী আত্মহত্যা করছে। আত্মহত্যার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আত্মহত্যার উপকরণে সহজলভ্যতা। আবার আত্মহত্যার ঘটনা ফলাও করে প্রচার হলে বা কেউ প্রত্যক্ষ করলে তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ অভিমত দিয়েছেন। সারা বিশ্বেই এখন আত্মহত্যা একটি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার বেড়েছে ৬০ শতাংশ। পৃথিবীতে যতো মানুষ আত্মহত্যা করে তার মধ্যে দুই দশমিক শুন্য ছয় জন বাংলাদেশি। আর সারা বিশ্বে বছরে কমপক্ষে দশ লাখ মানুষ আত্মহনন করছে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যা করছে। আশংকা করা হচ্ছে ২০২০ সালেই এই সংখ্যা বাড়বে, অর্থাৎ প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যা করবে।
জানা গেছে, ল্যাটিন ভাষার ‘সুই সেইডেয়ার’ থেকে ‘সুইসাইড’ বা আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে। যার সহজ অর্থ নিজেকে হত্যা করা। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যাকে এক ধরনের ‘অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় সব ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপকর্ম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আর ইসলাম ধর্মে ‘আত্মহত্যা হারাম’। এটি জঘন্যতম একটি কবিরাহ গোনাহ। আত্মহত্যার ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল কুরআনেও বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে আত্মহত্যার প্রতিফলন চিরস্থায়ী জাহান্নাম। আর হিন্দুধর্ম মতে আত্মহত্যা মানে হলো সরাসরি নরকে গমন। আত্মাকে বিনাশ করা যায় না। যারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তাদের আত্মাগুলো সহজে মুক্তি লাভ করে না। সুতরাং ধর্মীয় বিধি বিধান, সমাজ উপেক্ষা করে যারা আত্মহত্যার মতো গর্হিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে, তাদের মনের শক্তি-বিশ্বাস আরও বাড়াতে হবে এই ভেবে যে, মানুষ সৃষ্টির সেরা। জীবন পথে চলতে হবে সব সমস্যাকে মোকাবেলা করেই। সমস্যার সমাধান আত্মহত্যা নয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT