সম্পাদকীয়

নারী সহিংসতা প্রতিরোধ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১১-২০১৮ ইং ০০:৫৮:২৫ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত


আন্তর্জাতিক নারী সহিংসতা দূরীকরণ দিবস আজ। সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারীরা। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বে নারী সহিংসতা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে আজ নারী সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বব্যাপী নারী সহিংসতা বা নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই দিবসটি পালিত হয়। তবে আমাদের দেশে এই দিবসটি পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ আমাদের দেশে নারী সহিংসতা বিশ্বের যেকোন দেশের তুলনায় বেশি। আর তা শুধু বেড়েই চলেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শুধু নারী নয়, পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এই বিষয়টিকেই এখন গুরুত্ব দিতে হবে বেশি। এর পাশাপাশি নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, কন্যা শিশুদের প্রতি জন্মলগ্ন থেকেই পরিবারের অভ্যন্তরে অসম আচরণ এবং পুরুষতান্ত্রিক অবকাঠামোতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা এই দিবস পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পুরুষ শাসিত এই সমাজের একটি ব্যাধি হচ্ছে নারী নির্যাতন। সমাজ সভ্যতা যতো এগিয়ে যাচ্ছে সামনে, ততোই যেন এই প্রবণতা বেড়ে চলেছে। মানুষ যতোই সচেতন হচ্ছে, ততোই যেন নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের অজ্ঞতাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে উদাসীনতা। দেখা যায় সমাজের শিক্ষিত সচেতন ও প্রভাবশালী মানুষের দ্বারাই নারী সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বেশি। ফলে প্রভাবপ্রতিপত্তির মাধ্যমে তারা অপরাধ থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। নারীর ওপর পুরুষের অবিরাম ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে সাম্প্রতিককালে এই নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। দারিদ্র, বেকারত্ব ও অশিক্ষার কারণে পদে পদে নির্যাতিত হচ্ছে নারী। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে অসংখ্য নারীর জীবন হয়ে ওঠেছে দুর্বিসহ। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, তালাকসহ নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। তাছাড়া, এইসব আইন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সচেতনও নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এদেশে সহিংসতার শিকার হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য নারীর মৃত্যু হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জরিপে বলা হয় নারীর ওপর তার পুরুষ সঙ্গীর শারীরিক নির্যাতনের বেলায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে শতকরা ১৪ ভাগ মাতৃমৃত্যু ঘটছে গর্ভকালীন নির্যাতনের কারণে। শতকরা ৬১ জনের বেশি পুরুষ এখনও মনে করে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করা বৈধ। এছাড়া, নারীর প্রতি শতকরা ৮০ ভাগ সহিংসতা ঘটে পরিবারের ভেতরে। অন্যদিকে দেশে সংঘটিত মোট খুনের ঘটনার ৫০ ভাগই হচ্ছে স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যার ঘটনা। নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে গ্রামাঞ্চলে। শহরাঞ্চলেও শতকরা ৬০ ভাগ নারী স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন। মৌখিক নিপীড়নের শিকার হন ৬৭ শতাংশ নারী। তাছাড়া যৌতুকের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে বছরে গড়ে ছয়শটি।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে অতীতেও। অবশ্য তখন মানুষের মধ্যে এতো সচেতনতা ছিলোনা। তখন নারী নির্যাতন যে একটা অপরাধ সেটাও অনেকে জানতো না। এখন সময় পাল্টেছে। শিক্ষা দীক্ষায় এগিয়েছে মানুষ। সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে সকল ক্ষেত্রেই। কিন্তু নারী নির্যাতনের মতো একটি মারাত্মক স্পর্শকাতর বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। অবশ্য অনেক পুরুষ ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্ত্রীকে মারধর করা সমর্থন করেন না। আবার ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়েও অনেকে নির্যাতনের ঘটনাকে ‘জায়েজ’ করছে। নারী সহিংসতা রোধে আছে আইন, বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক সনদ ও চুক্তি। কিন্তু এগুলোর কোন বাস্তবায়ন নেই। এসব আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষও সচেতন নয়। সর্বোপরি আইন প্রয়োগকারী ও আইন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী ও দরিদ্র মানুষের প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে। নারী সহিংসতা রোধে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT