সম্পাদকীয়

শহরমুখী জনস্রোত থামছেনা

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১১-২০১৮ ইং ০০:৫৬:৩৩ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত


শহরমুখী জন¯্রােত থামানো যাচ্ছে না। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নত করার পাশাপাশি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার প্রবণতা কমেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়লেই গ্রামে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে; এলাকায় কাজ পেলে মানুষ আর শহরমুখী হবেনা। ফলে শহরে মানুষের অযাচিত চাপ কমবে। সরকারও দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহবান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বিশ্বব্যাপী এই অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া তা অর্জন করা যাবে না।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সূত্র ধরে বলা যায় গ্রামীণ জনপদের চিত্র অতীতে যেমন ছিলো এখন তেমন নেই। পাল্টেছে সবকিছুই। যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, মোবাইল ফোন-ইন্টারনেট ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা গ্রামে এখন সহজলভ্য। যে কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা বদলে গেছে অনেকটাই। তারপরেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহুরে জীবন বেছে নিচ্ছে।
বাংলাদেশ মানে-ছায়া সুনিবিড় সবুজ গ্রাম-জনপথ, নদী-হাওর-বিল, মেঠোপথ, দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। বাংলাদেশ মানে রাখালের বাঁশির সুর আর পাখীর গানে উন্মাতাল সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা। কিন্তু চিরায়ত বাংলার এই দৃশ্য এখন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। সময়ের দাবি পূরণ করতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গ্রামকে সাজানো হচ্ছে নতুন রূপে; তার ওপর ছড়ানো হচ্ছে বর্ণিল পলেস্তারা। গ্রামে সব ধরনের সুবিধা দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এমন অনেক গ্রাম রয়েছে, যেখানে বলা যায় শতভাগ নাগরিক সুযোগ সুবিধাই রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দশ বছরের ব্যবধানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গ্রামের জনবল বেড়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় রূপান্তর ঘটেছে অর্থ সরবরাহের ক্ষেত্রে। আগে গ্রাম থেকে অর্থ শহরে যাওয়ার যে প্রবণতা ছিলো, এখন তা নেই। বরং এখন শহর থেকেই বিত্তবানরা গ্রামীণ বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। গ্রামে ছোটবড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানমূলক নানা প্রকল্পে নিয়োজিত হচ্ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। স্থাপিত হচ্ছে ছোটবড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। ২০০৩ সালের শুমারী অনুযায়ী শহরে ৫১ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এবং গ্রামে ৪৮ দশমিক ৩১ ভাগ প্রতিষ্ঠানে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চলতো। ২০১৩ সালে গ্রামে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০০৩ সালে গ্রামে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিলো ৩৮ হাজার। দশ বছর পর এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯২ হাজার। এইসব পরিসংখ্যানে এটাই স্পষ্ট হয়েছে, গ্রামীণ অর্থপ্রবাহ বাড়ছে।
প্রকৃতঅর্থে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গ্রামের অবদান অতীতেও খুব একটা কম ছিলো না। আমাদের শহুরে ভোগ বিলাসী জীবন যাপনের প্রধান উপাদানই আসে গ্রাম থেকে, অতীতে যেমন বর্তমানেও তেমন। ধান-চাল থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, সব্জি সবই আসে গ্রাম থেকে। অর্থাৎ কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রাম বাংলার কৃষকেরাই। অথচ ‘আধুনিক স্মার্ট সমাজ ব্যবস্থায়’ কৃষি বা কৃষকদের মূল্যায়ন নেই। এই গ্রামের কৃষকের মাটির ঘরে জন্ম নিয়েও, গ্রামের আলো বাতাসে বেড়ে ওঠেও ‘সুসভ্য’ অনেকেই গ্রামীণ মানুষকে, গ্রামকে ‘ক্ষেত’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার দৃষ্টতা দেখায়। এই হীন মানসিকতা দেশের সার্বিক অগ্রগতির অন্তরায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অগ্রগতির চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সেখানে গ্রাম আর শহরের মধ্যে অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, কালচার-কোন ক্ষেত্রেই পার্থক্য নেই। সেসব দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগুনোর জন্যই সরকার গ্রামের চিত্র পাল্টানোর দিকে নজর দিয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকেও ভূমিকা রাখতে হবে। গ্রাম ছেড়ে নয়, বরং গ্রামে থেকেই গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে শহুরে জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT