সম্পাদকীয় তুমি নিজে যে রকম ব্যবহার পেতে চাও, সব মানুষের প্রতি সে রকম ব্যবহার করো। -আল হাদিস

কোচিং নির্ভর লেখাপড়া

প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১১-২০১৮ ইং ০১:১২:০৪ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

আমাদের লেখাপড়াটা কি কোচিং সেন্টার নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? প্রশ্নটা অনেকের মনেই আজকাল ঘুরপাক খায়। সত্যি বলতে কি, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই কোচিং নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে বেশি। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তারা সাহায্য নিচ্ছে কোচিং সেন্টারের। এতে অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত লেখাপড়া হলে, শিক্ষকরা পাঠদানে মনোযোগী হলে ছাত্র-ছাত্রীকে কোচিং সেন্টারের প্রতি ঝুঁকতে হতোনা। দেখা গেছে, অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের পেছনে শিক্ষা ব্যয়ের ৩০ শতাংশই কোচিং এর পেছনে ব্যয় করছেন। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত জরিপে বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য। জরিপের তথ্য হচ্ছে একজন শিক্ষার্থী বছরে তার শিক্ষার পেছনে যে টাকা ব্যয় করে তার মধ্যে ৩০ শতাংশ চলে যায় কোচিং আর হাউস টিউশন ফি বাবদ, ১৮ শতাংশ ব্যয় হয় বই খাতাসহ বিভিন্ন শিক্ষা সামগ্রী কেনার পেছনে। ১৭ শতাংশ ব্যয় হয় ভর্তি ও পরীক্ষার ফি বাবদ এবং যাতায়াত ও টিফিন বাবদ ১৬ শতাংশ।
দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো এখানে ওখানে গড়ে ওঠেছে কোচিং সেন্টার। রঙিন পোস্টার, ফেস্টুন, হ্যান্ডবিল আর পত্রিকায় বিশাল সাইজের বিজ্ঞাপন দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে এইসব কোচিং সেন্টার। কোচিং সেন্টারগুলো নামীদামী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং একশ’ ভাগ সাফল্যের নিশ্চয়তা ইত্যাদি প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রচারের এই চটকদারীতে আকৃষ্ট হয়ে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে আসেন এইসব কোচিং সেন্টারে। মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত লেখাপড়া হয় না বলেই শিক্ষার্থীরা আকৃষ্ট হচ্ছে কোচিং সেন্টারের দিকে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাক্সিক্ষত লেখাপড়া হচ্ছে না। হাতে গোনা কয়েকটি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই বিরাজ করছে শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ক্লাসে পাঠদানে অমনযোগীতার অভিযোগ রয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা ক্লাসে পড়ানো বিষয়টি যথাযথভাবে শিখতে বা বুঝতে পারেনা। এই অবস্থায়ই তারা কোচিং সেন্টারগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছে। তাছাড়া অনেক শিক্ষক ক্লাসে যথাযথ মনোযোগ না দিয়ে কোচিং সেন্টারের প্রতি আকৃষ্ট করছেন শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। অথচ এই শিক্ষকরাই যেখানে ক্লাসের পাঠদানে তেমন মনোযোগী নন, তারা কোচিং সেন্টারে ঠিকই মনোযোগ সহকারে পাঠদান করেন। অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে যেতে পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিচ্ছেন। তাই শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাকদের করার কিছু থাকে না।
সরকার কোচিং ও টিউশনি নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন সময়। অথচ তা বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ নেই। শিক্ষাবিদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য হচ্ছে, দেশে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে একটা অশুভ ও দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। এরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। আর পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষা চালু হওয়ায় কোচিং বাণিজ্য শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ইতোপূর্বে হাইকোর্ট থেকেও কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নিদের্শনা দেয়া হয়েছিলো। তখন এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিলো। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। সুতরাং কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানে শতভাগ মনোনিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে শিক্ষকরা বেতন-ভাতা কম থাকার অজুহাতে কোচিংয়ের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের পথ বেছে নেন। কিন্তু এখন শিক্ষকদের বেতন-ভাতা-সম্মান সবই বেড়েছে। তাই এখনই কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার মোক্ষম সময় বলে অভিভাবকেরা মনে করেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT