ধর্ম ও জীবন

ধর্মহীনতা ও কুসংস্কার প্রসঙ্গ

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১১-২০১৮ ইং ০১:২৪:৫৫ | সংবাদটি ৩৫ বার পঠিত

মানবজীবনে ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। ধর্ম ছাড়া মানবজীবন সম্পূর্ণ অচল। ধর্ম মানুষকে সৎ ও মহৎ করে তোলে। ধর্মই মানুষকে সকল অন্যায় অপকর্ম থেকে বিরত রাখে। যারা ধর্ম মানে না তারা অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম। ইহা সুন্দর, শাশ্বত ও সত্য ন্যায়ের ধর্ম। ইসলামের সকল আইন সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন। ইসলামের প্রকৃত অনুসারীদেরকে বলা হয় মুসলমান। কেউ যদি বলে ‘ব্যক্তিগত জীবনে আমি আল্লাহর উপর আস্থা রাখি কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে আমি আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখি না’। তাহলে এরূপ ব্যক্তি প্রকৃত মুসলমান হতে পারবে না। অথবা কেউ বললো ‘আমি ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বিধান মানি কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক জীবনে আল্লাহর বিধান মানি না’। তাহলে এরূপ ব্যক্তি কখনও মুসলমান হতে পারবে না। অথবা কেউ বললো ‘আমি ধর্মনিরপেক্ষ’। ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মকে ছেড়ে দেয়া, ধর্মদ্রোহী হওয়া, ধর্মের বিরোধীতা করা। মুসলমান হওয়ার পূর্ব শর্ত হচ্ছে ইসলামকে অবশ্যই জীবনের সকল ক্ষেত্রে ধর্ম হিসেবে মেনে নিতে হবে। একজন মুসলমান কখনও ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। একজন মুসলমান ‘আমি ধর্মনিরপেক্ষ’ এই বাক্যটি উচ্চারণ করতে পারে না। মানুষ যখন ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যায় তখন সে সকল মানবীর গুণাবলী হারিয়ে ফেলে। তার মধ্যে মনুষ্যত্ব থাকে না। যার ধর্ম নেই, তার মধ্যে মানবতাও নেই। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ একটি মানবতা বিরোধী মতবাদ। এটা একটি মানব রচিত মতবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী লোকদের কোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কারণ যারা ধর্ম মানে না তারাই তো ধর্মনিরপেক্ষ। সুতরাং যারা ধর্ম মানে না, ধর্মীয় বিধানের বিরোধীতা করে তাদের ইবাদত কবুল হবে কেমন করে? যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা সেখানেই ইসলাম ও মুসলমানের বিরোধীতা। ইসলামের নামকে পৃথিবীর বুক থেকে মিটিয়ে দেয়ার জন্যই সেই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের উৎপত্তি হয়েছে। যে ঘৃণ্য মতবাদটি আমাদের সমাজকে কুলষিত করছে, ইসলাম ও মুসলমানদের চরম ক্ষতি সাধন করেছে সেই ঘৃণ্য মতবাদটিই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ। ঈমান, ইসলাম ও মুসলমানিত্ব রক্ষা করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে আমাদেরকে অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতার করালগ্রাস থেকে ধর্ম, দেশ ও জাতিকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদই হচ্ছে দেশ, জাতি ও ইসলামের চরম শত্রু।
আমাদের সমাজে অনেক লোক আছেন যারা সঠিক ও সুন্দরভাবেই ধর্ম-কর্ম পালন করে থাকেন। কিন্তু দেখা যায়Ñ তারা নানাবিধ কুসংস্কারে লিপ্ত। এসব কুসংস্কারে লিপ্ত থাকায় তাদের যে অনেক পাপ হচ্ছে তা তারা আদৌ বুঝতে পারছেন না। অনেকে এসব কুসংস্কারযুক্ত কাজ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথেই করে থাকেন, আবার কেউ কেউ অন্যের দেখাদেখি করে থাকেন। বিষয়টি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অনেকে এসব কুসংস্কারযুক্ত কাজগুলোকে অনেক ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের উপরও প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কুসংস্কারযুক্ত কাজকেই তারা ধর্মীয় কাজ মনে করেন। কুসংস্কারযুক্ত কাজ করাকে তারা পাপ মনে করেন না। এভাবে অসংখ্য অগণিত কুসংস্কারে তথা পাপাচারে নিমজ্জিত আমাদের সমাজ। আমাদের সমাজে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত আছে সেগুলোর কয়েকটি নি¤েœ উপস্থাপন করলামÑ
১. বিয়ে উপলক্ষ্যে বর-কনে দেখাকে কেন্দ্র করে ‘সালামি’ আদান-প্রদান করা। ‘সালামি’ কম দিলে নিচ বংশের লোক মনে করা হয়ে থাকে, এমনকি কোন কোন স্থানে ‘সালামি’ কম দেয়ার কারণে বিবাহ ভঙ্গের ঘটনাও ঘটে থাকে। ২. সন্তান জন্মের নয় দিনের সময় ‘নওয়াই’ করা। এ সময় নানা বাড়ি থেকে মূল্যবান খাদ্যদ্রব্য ও কাপড়-চোপড় নিয়ে আসা। অন্যথায় সন্তান দুর্ভাগ্যবান হবে বলে ধারণা করা। ৩. সকালে কোথাও যাত্রাকালে খালি কলস দেখলে যাত্রা শুভ হয় না। এরূপ ধারণা করা। অথচ যাত্রার সাথে খালি কলস বা ভরা কলসের কোন সম্পর্কই নেই। ৪. রাতের বেলা ভাঙা আয়না দেখলে নাকি ভাঙা কপাল হয়। ৫. পান বাধা থাকাবস্থায় অবিবাহিত মেয়ে তা খুললে তার বিবাহ হয় না। ৬. জিহ্বার মধ্যে নিজের দাঁতের কামড় পড়ে গেলে অন্য লোক গালি দিচ্ছে মনে করা। ৭. যে নারীর গর্ভে মেয়ে সন্তান জন্ম নেয় তাকে ‘অলক্ষী’ মনে করা। ৮. বিশ রোজার পূর্বে ইফতারি দিতে হবে নইলে স্বামীর হায়াত কমে যাবে। ৯. পুরুষ বা মহিলার ডান চোখের কম্পন করাকে বিপদ আসার লক্ষণ ধারণা করা। ১০. মৃত্যু লোকের মৃতের দশ দিন পর ‘দশা ছাড়ানো’ আবার বিশ দিনে পর ‘বিশা ছাড়ানো’। ১১. বিবাহিত নারীর হাতে চুড়ি না দিলে স্বামীর হায়াত কমে যায় বলে ধারণা করা। ১২. শবে বরাতে আতশবাজি করা। এভাবে অনেক কুসংস্কার আছে যা বিশ্বাস করলে ঈমান থাকে না। কোনো কোনোটি বিশ্বাস করলে কবীরা গুনাহ হয়ে যায়। কুসংস্কারে লিপ্ত থাকার কারণে এভাবে নানা ধরণের পাপে নিমজ্জিত হয়ে থাকেন সাধারণ মুসলমানরা। এসব কুসংস্কার থেকে মুক্তি লাভের একমাত্র পথ হচ্ছে ধর্মশিক্ষা লাভ করা। শিক্ষিত লোকেরা সাধারণত এসব কুসংস্কারে লিপ্ত হন না।
ধর্মহীনতা ও নানাবিধ কুসংস্কারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আমাদের সমাজ। ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মহীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতায় মানবতার কোনো কল্যাণ নেই। ইহ-পরকালীন কল্যাণের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মূলে আমাদেরকে অবশ্যই কুঠারাঘাত করতে হবে। সেই সাথে সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে হবে। ইসলাম শান্তি ও মুক্তির ধর্ম। ইসলামের সকল নীতিই আমাদের শান্তি ও মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT