উপ সম্পাদকীয়

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দায় জনগণের

মোঃ আমিনুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১২-২০১৮ ইং ০০:০৮:০২ | সংবাদটি ২৩ বার পঠিত

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে চিন্তা-ভাবনার অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। সমাজকে উন্নততর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ অনেক সৃজনশীল চিন্তা থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাদের সেই চিন্তা-চেতনার গঠনমূলক পদক্ষেপের ফসল বর্তমান সভ্যতা। রাষ্ট্র ও বিভিন্ন সংগঠন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতান্রিক ব্যবস্থা তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে সকল পদ্ধতি বিরাজমান তার মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বিভিন্ন ভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে-যদিও এ পদ্ধতি ত্রুটিমুক্ত নয়। মূলত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়; যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর পর প্রাপ্ত বয়ষ্ক সকল নাগরিকের সমান ভোটাধিকার থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই জনগণের সার্বিক কল্যানের জন্য আইন তৈরী করবে এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করবে। সাধারণত জনগণই রাষ্ট্রের মালিক হিসাবে থাকে-কেননা দলসমূহকে নির্দিষ্ট সময় পর জনগনের কাছ থেকেই ক্ষমতা নিতে হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের বিকল্প নেই। তবে শুধু নির্বাচনেই গণতান্ত্রিক আবহ শক্তিশালী হয় না। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে উপযুক্ত প্রতিনিধি নির্বাচন করাও বিবেচ্য বিষয়। যাকে খুশি তাকে ভোট প্রদান নয়; রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উপযুক্ত প্রতিনিধি নির্বাচনের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে।গণতন্ত্রকে সুরক্ষার জন্যই মেধাবি, সৎ, নির্ভীক, উদ্যমী, পরিশ্রমী ও জনসম্পৃক্ত নেতা নির্বাচন করা প্রয়োজন। এরূপ নেতা তৈরিতে ও তাদের নির্বাচিত করে সংসদে আনার জন্য সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রচেষ্টা থাকতে হবে। দেশকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অবস্থা তুলে ধরে সমস্যাগুলো সাধারণ জনগণকে অবগত করানোও তাদের দায়িত্ব। ক্ষমতায় গেলে এসব সমাধানের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং না গেলে তাদের অবস্থান কি হবে সে সম্পর্কেও সাধারণ মানুষকে জানানো প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার জন্য সভা-সমাবেশ করা এবং মতামত প্রকাশে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা উচিত নয়। অন্যদিকে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ না করার ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকারও নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে উন্নত করার বিকল্প নেই। জাতীয় নির্বাচন এলে নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থা- অনাস্থা নিয়ে দলসমূহের মধ্যে বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনিত হয়। আমার কাছে বোধগম্য হয় না নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু ও সুন্দর রাখার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা মূখ্য হয় কিভাবে? কমিশনের কাজ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আচরণবিধি তৈরী করা এবং রাজনৈতিক দলসমূহ সেগুলো প্রতিপালন করছে কি না তা দেখাশুনা করা। গণতান্ত্রিক দলসমূহ তা প্রতিপালনে নৈতিক ভাবে দায়বদ্ধ। যদি না মানে তাহলে নির্বাচন কমিশনের উচিৎ শক্তহাতে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেই আইন তৈরী করার এবং আইন প্রয়োগে সহায়তা করাও দলসমূহের কাজ। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। যে সকল দল বা প্রার্থী আচরণবিধি ভঙ্গ করে তাদেরকে অযোগ্য ঘোষণা করার বা নিবন্ধন বাতিলের দ্রুত সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নির্বাচনে অনিয়ম বা কারচুপির প্রমাণ হলে দ্রুততার সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ক্ষমতা প্রয়োগে ভীরু এবং দুর্বল চিত্তের ব্যাক্তিদের এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে না যাওয়াই উচিৎ।
আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গলদ বহুমাত্রিক। প্রায় সব গণতান্ত্রিক দলসমূহে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি উপেক্ষা করে চলার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। কাল টাকার মালিক এবং দলবাজ কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে আসা থামাতে সকলেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের দেশের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট মূল্যায়নে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদের সাম্প্রতিক সর্বজন গ্রহণযোগ্য উক্তি “রাজনীতি হল এখন গরিবের ভাউজ” এর মাধ্যমেই প্রতিয়মান হয়। নির্বাচনে দলসমূহ প্রার্থী মনোনয়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে এলাকার লোকজন জানতে পারে না কে কোন দলের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের পর্যালোচনায় প্রার্থী মনোনয়নে বড়দলগুলোর কার্যক্রমে তাই রাষ্ট্রপতির উক্তিই প্রতিয়মান হয়। অনেক সময় মনোনয়ন বেচা-কেনা হয় যা এখন দলসমূহের নীতি-নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। টাকা থাকলে মনোনয়ন পেতেও তেমন সমস্যা হয় না, কেননা দলের ত্যাগী স্থানীয় বড় বড় নেতাদের বগলে নিতে সময়ের ব্যাপার মাত্র। টাকার কাছে ওদের আত্মসমর্পণ দেখে দলীয় রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমনও দেখতে পেয়েছি সাধারণ পরিবারের সন্তান শহরে বিভিন্ন ভাবে কাজ করে অর্থ-সম্পদ কামাই করে গ্রামে এসে গরিব অসহায় মানুষদেরকে ব্যবহার করে আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে ভাল মানুষ সেজে বিশাল বড় নেতা বনে যায়। যেহেতু সে ব্যবসায়ী তাই তার চিন্তায় ব্যবসার হিসাবেই প্রধান্য থাকে। তার এই নোংরা চিন্তাকে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় কিছু দালাল, স্বার্থান্বেষী, পেশীশক্তি সম্পন্ন গোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করে।
আমার দৃষ্টিতে জোট-মহাজোট আর এক গণণতান্ত্রিক খেলা। রাজনীতি হল নীতির অনুশীলনের মাধ্যমে আদর্শের, সুন্দরের, মানবতার, মানব কল্যাণে এবং উন্নয়নের প্রতিযোগিতা করা। এক-এক দলের এক-এক আদর্শ, লক্ষ্য বাস্তবায়নে কিভাবে কাজ করবে যা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে সমর্থন আদায় করা। আদর্শ বাস্তবায়নে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে নিজেদের অবস্থান উচ্চাসনে নিয়ে যাওয়া। দলসূহের মধ্যে থাকবে আদর্শ ও জনকল্যাণের প্রতিযোগিতা। কিন্তু বর্তমানে জোট গঠনে নীতি-আদর্শের কোন বাছ-বিচার নেই। রাজাকার, স্বৈরাচার,ডান-বাম সবেই যেন একাকার ;সবার লক্ষ্যই ক্ষমতার পরম স্বাদ গ্রহণ। রাজনীতির এ ধারা চলতে দেয়া কতটা নৈতিকতা সম্পন্ন তা রাজনৈতিক দল সমূহকে ভেবে দেখা উচিত। আদর্শিক রাজনীতি নাই বললেই চলে-রাজনীতিবিদের কথা সাধারণ মানুষ এখন খুব কমই বিশ্বাস করে। আজ যার নীতি-আদর্শকে তূলো-ধুনা করছে, বাজে ভাষায় ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করছে, পরের দিন তাকে পরম যতেœ আদর করছে।আমার কাছে মনে হয়, এ যেন রাজনীতির নোংরামির মহাখেলা। এ অবস্থা দেখে কারো কষ্ট হয় কিনা জানিনা, কিন্তু খুবই দঃখবোধ হয়। রাজনীতিতে শেষ নেই বলে বিভিন্ন দলের বড় বড় নেতা প্রায়শই বলতে শুনি, যা এই ব্যাক্তি এবং যে দলের নেতা সেই দলের কোন আদর্শ নেই তাই প্রতীয়মান হয়। আগেকার মানুষ রাজনীতিবিদের যেভাবে শ্রদ্ধা-সম্মানের জায়গায় রাখত বর্তমানে সেই জায়গাটা সংকুচিত হয়ে প্রায় শেষের স্তরে চলে এসেছে। এ খেলা না থামালে সমাজ, দেশ কারো জন্য সুখকর হবে না। আগামী প্রজন্ম আমাদেরকে কিভাবে বিচার করবে তা চিন্তা করে দেখা উচিত।
নানা কারণে আমাদের দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রবাহে নানাবিধ বাধা দৃশ্যমান। জাতীয় নেতৃত্বে যাদের অবস্থান সুসংহত তারাও স্থানীয় নেতৃত্ব শক্তিশালী হউক তা চায় না। তাদের ভয় হল যদি তাকে অতিক্রম করে ফেলে। এ ধরণের চিন্তা-চেতনা থাকলে দলে গণতন্ত্র বিকশিত হয়না। আমি একজন নেতাকে প্রশ্ন করেছিলাম- আপনি কি আপনার উত্তরসুরী তৈরী করতে পেরেছেন? তখন তিনি বিব্রতবোধ করেছিলেন এবং যা উত্তর দিয়েছিলেন যা নেহাতই বেমানান ছিল। রাজনীতিতে পরিশুদ্ধতা না এলে সমাজে স্থিতিশীলতা আসবে আশা করা যায় না। বাবা মারা গেলে স্ত্রী অথবা সন্তান সাংসদ হিসাবে মনোনয়ন দেয়া এটা গণতন্ত্রের নীতি অনুসৃত হয় না। কক্সবাজারের বদির পরিবর্তে তার স্ত্রী এবং টাঙ্গাইলে আমানুর এর পরিবর্তে তার বাবা উৎকৃষ্ট জ্বলন্ত উদাহরণ। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকার, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, সাধারণ জনগণ সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
লেখক : শিক্ষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT