উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : সংবাদ, প্রতিবাদ ও সাংবাদিকতা

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১২-২০১৮ ইং ০০:০৯:৩৩ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক অজগ্রাম থেকে ছুটে এসেছিলেন পত্রিকা অফিসে। জীবনেও ভাবতে পারেননি যে, কখনো খবরের কাগজের অফিসে ছুটাছুটি করতে হবে। লেখাপড়া জানেন না। পত্রিকা নিজে পড়েননি কোনো দিন। ভারী ভারী বই পুস্তক আর গল্প উপন্যাস তো দূরের কথা। তবু তাঁকে আসতে হলো পত্রিকা অফিসে। খুঁজে বের করতে হলো কোথায় সে পত্রিকা অফিস। না এসে তাঁর উপায় ছিলনা।
খবরের কাগজের লোকগুলো কেমন? এরা কি দারোগা-পুলিশের মত, না হাকিম-উকিলের পাশাপাশি কিছু? দ্বিধা-সংশয় সংকোচের অজানা ভয়ে তিনি বারবার শিউরে উঠেছেন। একা আসতে সাহস হয়নি। সাথে নিয়ে এসেছেন স্কুল পড়–য়া একটি ছেলেকে। গ্রামের সালিশ আদালতে, হাটবাজারে, দলাদলি, মারামারির প্রস্তুতিতে এই তিনিই শির উচিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ান সবার সামনে। তাঁর দাপট প্রতিপত্তিতে অন্য দশজন কাঁপে। তিনি নিজে কাঁপেননি কখনো। কেবল এই একবার পত্রিকার নামেই তিনি কাঁপলেন। সহজ হওয়ার পর জানালেন, আসতে হলো। কারণ এখানে আমার মান সম্মানের প্রশ্ন। তিনি গ্রামের অন্য দু’দশটা শিক্ষিত ছেলেকে পত্রিকায় পাঠাতে পারতেন। কিন্তু বিষয়টি এমন যে, তিনি চান, যা হয়েছে তা যেন আর না ছড়ায়। তাই সশরীরে আগমন।
ঘটনাটি ১৯৮২ সালের। কিছুদিন আগে পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছোট্ট ক’লাইনের একটি খবর ছাপা হয়েছিল। নিতান্তই অপ্রধান অপরিচিত জনৈক সংবাদদাতা প্রেরিত। অমুক থানার অমুক ইউনিয়নের অমুকের বাড়িতে কাজ করতো এক গরীব মাতৃহীন যুবতী। সে ঐ গৃহকর্তার আত্মীয়ও বটে। মেয়েটির আকস্মিক মৃত্যুতে কেউ কেউ সন্দেহ করছেন। সন্দেহ-অবৈধ গর্ভ চাপা দেয়ার জন্য কিছু খাইয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
এ খবরটি তাকে টেনে নিয়ে এসেছে পত্রিকায়। এটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট। দুশমনের দুশমনি। যে করেই হোক এর উল্টা লিখতে হবে। এমনকি হাজার পাচেক টাকা লাগলেও। না, মামলা মোকদ্দমা লাগেনি। মেয়েটি মারা গেছে। মাস দুই আগে। যথারীতি দাফন কাফন হয়েছে। মামলা করে অথবা সামনে এসে ঐ বিদঘুটে কথা বলবে এমন লোক ঐ তল্লাটে নেই। তবু এর প্রতিবাদ তিনি ছাপাবেনই।
প্রতিবাদ ছাপলে আরো কিছু লোক ঘটনাটি জেনে ফেলবে। এ ছাড়া ভেতরের পাতায় ছোট এ খবরটি আর ক’জনই পড়েছে। কি হবে প্রতিবাদে? এসব কথা শুনতে তিনি মোটেই রাজী নন। ভাঁজে ভাঁজে ছিন্ন পত্রিকা খানি এগিয়ে দিয়ে ব্যাখ্যা দিলেন এবার। আমার যারা শত্রু, তারা ঠিকই পত্রিকাটি পড়বে। ঐ টুকরোটি সোনার মত রক্ষা করবে। ছড়াবে চারদিকে। আমার ইজ্জত যাবে। বাড়ীর মেয়ে ছেলেদের বিয়ে-শাদীতে ছোট এ খবরটি ব্যাঘাত বাঁধাবে। লোকে বলবে, এ বাড়ীর ছেলে মেয়েদের বিশ্বাস নেই। বংশানুক্রমিক একটা কলঙ্ক থেকে যাবে। অতএব যে করেই হোক, প্রতিবাদ চাই।
ছোট ছ’সাত লাইনের খবর। পত্রিকার টেবিলে এর ওজন নিতান্তই তুচ্ছ বিবেচিত হয়। কিন্তু অপরদিকের কাছে এটি জীবন-মরণ প্রশ্ন। ঐ যে গল্পের ‘তোষামোদের কাছে যা খেলা, আমাদের কাছে তা ‘মৃত্যু’র কারণ। পত্রিকার টেবিলে যারা শব্দ নিয়ে আপাত তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে লেখা লেখা খেলেন, তাদের চিন্তা ভাবনার দৌড় কতটা প্রসারিত হওয়া উচিৎ-ঐ লোকটির টেনশন থেকে তা অনুমান করা যায় সহজে।
আরেকটি ঘটনার কথা বলি। সেটিও ১৯৮১ সালের। সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠের টেবিল। সোমবার বিকেল। মঙ্গলবারে পত্রিকা বেরোয়। সামনে কাগজ, হাতে কলম হাতে নিয়ে গোমড়া মুখে বসে আছেন দায়িত্বশীল কর্মী। প্রেস ম্যানেজার কপির জন্যে তাগিদ দিচ্ছে। মূল নিউজ বা প্রতিবেদনের বিষয় পাওয়া যাচ্ছে না। ভীষণ যন্ত্রণা। সামনের ট্রেতে বারবার হাতড়াচ্ছেন। কাগজের ওয়ার্থলেস স্তূপ। মেজাজ আরো খারাপ হচ্ছে। বাম পায়ের পাশ ঘেঁষে ওয়েস্টপেপার বাস্কেট। হাত বাড়িয়ে দুমড়ানো-মোচড়ানো এক টুকরো কাগজ তুলে নিলেন তিনি। শনিবারে মূল্যহীন বিবেচনায় ওটি ঝুড়িতে ঠাঁই পেয়েছিল। চিঠিপত্র কলামের জন্যে একজন ছাত্রের লেখা। বিষয়-সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র সংসদের কার্যালয়ে চেয়ার-টেবিল, আসবাবপত্রের অভাব। তাই সংসদের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের কমনরুমের চেয়ার এনে কাজ চালাতে হয়েছে। পত্র লেখকের আবেদন কলেজ কর্তৃপক্ষ যেন ছাত্র সংসদের আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করে দেন।
এই বিষয়বস্তু দিয়ে লিড নিউজ হয়না। কিন্তু উপায় নেই। কপি দিতেই হবে। বিদ্যুৎ বেগে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রতিবেদক। ভাবলেন, সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদ। অনেক দূরের ব্যাপার। আপাতত দায়মুক্ত হই। অতএব লেটার প্রেসের ১৮ ও ৩৬ পয়েন্টের তিন কলাম হেডিং হলো- গুরু ভক্তির অনন্য উদাহরণ ঃ শিক্ষকের চেয়ার ছাত্রদের দখলে। হ্যাঁ, প্রতিবাদ ছাপিয়ে অনুতাপের দহন থেকে রেহাই পেয়েছিলেন তিনি। কাজটি ছিল নেহায়েত অন্যায়। তবে দায়ে পড়ে। টেবিল কর্মীদের মনে রাখতে হবে, দায়ে পড়ে চাপে পড়ে অথবা অসচেতনতায়, যেভাবেই হোক- অন্যায় সব সময়ই অন্যায়। আজকাল দৈনিকের টেবিলে এ ধরনের সংবাদ সংকট দেখা দেয়না। তবে স্ট্যান্ট মেরে চমক সৃষ্টির সাধ জাগতে পারে। দায়িত্বশীল কর্মীকে এই ধরনের সাংঘাতিক সাধ বিসর্জন দিতেই হবে।
বলতে পারেন, পত্রিকার পাঠক নিতান্তই নগণ্য। পড়তে জানেইনা অনেকেই। যাদের অক্ষর জ্ঞান আছে, তাদেরও বড় একাংশের ভিন্ন বিনোদন ও বিশ্রাম নিয়েই জীবন। বাকী থাকে নিতান্ত আঙ্গুলিমেয়, ক’জন। এরা পড়েন, দেখেন পত্র-পত্রিকা। আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকার পাঠক তো আরো সীমিত। কিন্তু তবু ব্যর্থ নয় কিছুই। নিরক্ষর লোকদেরও পরোক্ষে পত্র পত্রিকা প্রভাবিত করে থাকে। জাতীয় পত্র-পত্রিকা অনেকের নাগালের বাইরের জিনিস নিয়ে বেরোয়। কিন্তু একটা নিরক্ষর লোকও যখন জানে যে, তার চেনা-জানা ঘটনা বা বিষয়টি পত্রিকায় এসেছে, দারুণ এক কৌতুহল তাড়িত হয় তখন। কি লিখেছে, একাধিকবার জানতে চায় সে। আঞ্চলিক পত্রিকা তাই নিজ অঞ্চলে বিশেষভাবেই পঠিত হয়। এর গুরুত্ব এ দিক দিয়ে তাই অত্যন্ত বেশি।
সিলেটে এখন নিয়মিত অনেকগুলো দৈনিক বেরুচ্ছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় ১৯৮৪ সালের পর এখানকার পাঠকও বেড়েছে অনেক। সিলেটের পাঠক সমাজ পুরাতন। প্রমথ চৌধুরী ও রামানন্দ বলেছিলেন, ‘প্রবাসী’ ও সবুজপত্রের গ্রাহক সংখ্যায় কলিকাতার পরেই শ্রীহট্টের স্থান। এ যুগে সিলেটের শিক্ষিতের হার কমেছে। কিন্তু পাঠক সংখ্যার ঐতিহ্য অব্যাহত আছে। শতবর্ষের সাংবাদিকতার ইতিহাসের এটাই সুফল। তাই পত্রিকার পাঠক সংখ্যা কম বলে মন খারাপ করার কিছুই নেই। বরং দৈনিক সিলেটের ডাক সহ অন্যান্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ জানেন, সিলেটের পাঠক সমাজ নিয়ে রীতিমত গর্ব করা যায়। পাঠকরাও জানেন পত্রিকা এখানে ওজন দরে বিক্রি করতে হয়না। এই সত্যটিই সংবাদ কর্মী, সম্পাদক এবং সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষকদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়।
দায়িত্ব আছে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও। খুলনা, বরিশাল সহ দূরাঞ্চলের খবর যাচাইয়ের সুযোগ নেই কিন্তু স্থানীয় খবর যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ চেতনাও প্রসারিত হয়েছে। ছাপার অক্ষরে দেখেই আদ্যিকালের চোখে পাঠক বেদবাক্য রূপে যে কোনো বর্ণনাকে এখন গ্রহণ করে না।
পাঠকের এই সুচেতনার সাথে আছে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর প্রতি সহজাত আকর্ষণ। অমুক গ্রামের রাস্তা নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। একজন লোক আহত। এ খবরটি সেই বিশেষ গ্রাম বা এলাকায় যে চাঞ্চল্য আনে তার তুলনা হয় না। ক্লিনটনের বিজয়, অলিম্পিকের বিশ্বরেকর্ড, সেই তুচ্ছ খবরটির সামনে কিছুই না। মানুষের চেতনায়, অনুভূতিতে নাড়া দিতে পারে বলেই আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত বেশি। এ বোধ বিবর্জিত হলে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে একটি পত্রিকা। সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের চেয়ার সমস্যাকে ফেনিয়ে সামান্য মশলা দিয়ে চটকদার প্রতিবেদন করা যেতে পারে, এখানে সেখানে সংঘটিত ঘটনাকে রং চং দিয়ে নিজের মতামত ও ইচ্ছার অনুকূলে পরিবেশন করা যেতে পারে। কিন্তু এটি ঐ পত্রিকা এবং মহান পেশা সাংবাদিকতার জন্যে ক্ষতিকর। যাচ্ছেতাই লিখে এবং প্রচার করে হিরো হওয়ার জন্যে পত্রিকার ঘাড়ে যারা সওয়ার হন, তারা মুখোশধারী সেবক ও আর মুখোশ সার্বক্ষণিক নয়। খসে পড়েই। এরপর খাঁটি চেহারায় নকল লোকটিকে কুড়াতে হয় অগণিত মানুষের ঘৃণা আর অভিশাপ।
রাজনীতির একটি সুবিধা আছে। সহজেই মুখচেনা হওয়া যায়। জনসেবা এবং ইচ্ছা করলে আত্মপ্রতিষ্ঠা-দু’টোই সম্ভব। কিন্তু সাংবাদিকতার প্রথমেই আছে নিজেকে অপ্রধান করে রাখার উদার ইচ্ছা। আড়ালে অথচ সবার মধ্যে থেকেই সমাজের মঙ্গল সাধনের লক্ষ্য এখানে বড়। সাংবাদিকদের নিয়ে মাঝে মাঝে বিরূপ কথাবার্তা শোনা যায় বটে। কিন্তু এখনো সাংবাদিক কী চীজ, তা দেখার জন্যে অনেকের ইচ্ছা জাগে। সেই অনেক আবার তাদেরই অন্তর্গত, যাদের মঙ্গলের জন্যে সাংবাদিক তার মন, মেধা ও মগজ ক্ষয় করে চলেছেন। পেশাকে পুঁজি করে বৈষয়িক চাকচিক্য হাসিলের স্বপ্ন তাই একজন সাংবাদিকের কাছে কাম্য নয়। তাই বলে সাংবাদিক পেট পিঠহীন আচানক কোনো প্রাণী নয়। ওমর খৈয়ামের কথায় : অর্থ নারে মানুষেরে করিতে রসিক/ মানি আমি তোমাদের এ কথাটি ঠিক।/ কিন্তু যদি রসিকের অন্ন নাহি জুটে,/ তখন সে ধরণীর পদপ্রান্তে লুটে।
আর তাই সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষকবৃন্দ এবং সমাজের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিৎ।
কি লাভ এত পত্র-পত্রিকায়? কি হয় এই লেখালেখির আর টাকা খরচ করে? বিষয়ী লোকের মুখে এ বাক্যগুলো উচ্চারিত হয় প্রায়ই। হ্যাঁ নীতিহীন উচ্চাশা এবং আত্মপ্রচার ও আত্মপ্রতিষ্ঠার রগরগে তাড়নায় কাজটি হলে, লাভ তো নয়ই, বরং ক্ষতি আছে প্রচুর। কিন্তু প্রকৃত সেবকের মানসিকতায় পত্র-পত্রিকার প্রকাশনা আর লেখালেখির লাভ অসীম। পেটে ব্যথার টেবলেট খেলেই যেমন হাতে হাতে ফল সুলভ, পত্রিকার সুফল অবশ্যই তেমনি প্রত্যক্ষ নয়।
কোথাও খুন হয়েছে। নির্দোষ একটি মানুষকে স্বার্থান্ধ কেউ মেরে ফেলেছে। এ খবরটি পড়ে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে পাঠকের মনে কি ক্ষণিকের ক্ষোভ দপ করে জ্বলে ওঠেনা? দুর্নীতির খবর জেনে ঘৃণার সঞ্চার হয় না? এমনি মুহূর্তের অগ্নিকণা একদিন অগ্নিগিরি হয়ে সব অন্যায় অবিচার হিংসা আর অত্যাচারকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবেই। তুচ্ছ ঘটনার খবরও আসলে তুচ্ছ নয়। যেমন সেই গ্রাম থেকে আসা লোকটির কাছে সাধারণ একটি খবর অসাধারণ তাৎপর্যে গৃহীত হয়।
এই অস্ত্রকে যারা মিথ্যাচারের বেসাতি বানায় অথবা অজ্ঞতাবশত না জেনেই এ ক্ষেত্রে ফলায় পান্ডিত্য, তাদের কি কোনো শাস্তি নেই? আছে অবশ্যই। কারণ মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির ধর্ম মিথ্যা হয় না। খোলস সরে গেলেই মিথ্যুককে পুড়ে মরতে হবে তারই সৃষ্ট আগুনে। আগুন তার উপাসককেও রেহাই দেয়না।
প্রতিবাদ নিয়ে পত্রিকার দপ্তরে ছুটে আসা লোকটির উদ্বেগ ও আবেগ আমরা দেখি। দেখি না তাদের, আমাদের আড়ালে যারা একেকটি খবর পড়ে উদ্দীপ্ত শাণিত হয়ে ওঠেন। সেই অগণিত অদেখা পাঠকদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, আবেগ-অনুভূতি সামনে রেখেই সাংবাদিক নিতে পারেন সঠিক ভূমিকা।
পত্র-পত্রিকা এখন গ্রাম গঞ্জেও যায়। গণ মাধ্যমের সাথে জনগণের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হচ্ছে দিন দিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিবিসি ভারতীয় সৈনিকদের জন্যে একটি প্রোগ্রাম চালু করেছিল। সৈনিকরা নিজের ভাষায় রেডিও’র মাধ্যমে স্বদেশের আত্মীয়-স্বজনদের উদ্দেশ্যে এ অনুষ্ঠানে কথা বলতেন। এমনি এক সৈনিক নাকি তাঁর কথার শেষে বলেছিলেন, ‘মনির মা, কান দেও, কানে কানে বলি। ঘরের পেছনে আমগাছের তলার গর্তে কিছু টাকা রাইখ্যা আইছি। আমি আসতে না পারলে গর্ত খুইড়া টাকাগুলি তুলিও। সাবধান, আগে ভাগে আর কাউরে বলো না, নইলে চুরি হইয়া যাইব।’
আজকাল একটা বাচ্চাও জ্ঞানের, বুদ্ধির এই বহর দেখাবে না। পত্রিকা সম্পর্কেও জনগণের চোখ খুলেছে। কিন্তু স্বীকার করতে হবে, পাঠ প্রতিক্রিয়া সংবাদপত্রের টেবিলে প্রত্যাশিত মাত্রায় আসেনা। সংবাদপত্রের ভাষায় এটাকে বলে ‘ফীডব্যাক’ সমস্যা। এটি কাটিয়ে উঠতে পাঠক সমাজের সাহায্য খুব প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে সাংবাদিকও মানুষ। প্রেম-বিদ্বেষ, রাগ-ক্ষোভ, পছন্দ-অপছন্দ তারও আছে। অন্য দশজনের মত তাই এখানেও ভুল হতে পারে। ব্যক্তির জ্ঞানেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞ পাঠক সমাজ সংশোধনে এগিয়ে আসবেন।
এটা হলো পাঠকের কর্তব্য। এ দিকে তাকিয়ে সংবাদকর্মী, কলামিস্ট, সম্পাদককে হাতের তীর ছুঁড়ে দিলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, আপনার সামনে কাগজ, হাতে কলম আছে। কথার পিঠে কথা সাজানোর শক্তি ও সুযোগ আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন যা অনেককেই দেননি। এর সুবাদে আপনি মানুষকে অমানুষ বানাতে পারেন। শয়তানকে দেবতার রূপ দিতে পারেন। চোরকে সাউদ, সাউদকে চোর, দোষীকে নির্দোষ সাজাতে পারেন। লুকাতে পারেন শব্দের আড়ালে পাহাড়। শব্দের ভোজবাজিতে অনেকের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেন। কিন্তু নিশ্চয়ই জানেন, শব্দের জাল দিয়ে সকল চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় না। সংখ্যায় কম হলেও এই চোখগুলো অন্তত মিথ্যাচার দেখছে। এতে পত্রিকার প্রতি, বৃহত্তর অর্থে সংবাদপত্রের প্রতি ক্রমান্বয়ে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। এই আস্থাহীনতা সকলের জন্যেই ভয়ানক ক্ষতিকর।
সারাদেশে অসংখ্য পত্রিকা বেরুচ্ছে। পাঠক বাড়ছে। পত্রিকার সাথে সমাজের বিভিন্ন স্তর ও পেশার মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সেই সাথে তাল মিলিয়ে দায়িত্ব বাড়ছে-সংবাদপত্র ও কলম সৈনিকদের। এ দায়িত্ব সুন্দর ও সঠিকভাবে পালনে প্রয়োজন সমাজের সকলের আন্তরিক সহযোগিতা। সচেতন জনতা যেমন গণতন্ত্রের প্রহরী, জাগ্রত পাঠক সমাজ তেমনি সুস্থ সাংবাদিকতার নিয়ন্ত্রণকারী। সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দরতর হোক ভবিষ্যৎ।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT