সাহিত্য

অনিন্দ্য মুখোশ

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ০২-১২-২০১৮ ইং ০০:১০:৪৮ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

দু’জনের সম্মুখ দেখা হতেই বিস্মিত হয়ে গেলো দু’জনার চোখ। উপলব্ধির তন্ত্রীগুলো নিস্ক্রীয় হয়ে গেলো- মনে হলো দু’জনে দু’টি আকাশে অবস্থান করছে। এমন অবস্থার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলো না। মিঠু ভাবতেই পারে নি আজ এমনি একটি যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তের আবির্ভাব হবে তার জন্য। যার উপস্থিতি মিঠুর কাছে এক অসহীয় দুর্ঘটনা, যার অবয়ব জীবনে কোনদিন দেখবে না বলে প্রতীক্ষা করেছে সে, যে মিঠুর জীবনকে করেছে দুর্বিষহ বেদনাদায়ক- সেই রুমীই এখন মিঠুর মুখোমুখি! রুমীও এমন কখনও চায়নি। এতো কাছে থেকেও পরস্পরের যোজন দূরত্ব।
একে অপরের দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে চোখ ফেরায় দু’জনই অন্যদিকে। সামনের স্টলের বইগুলো নাড়াচাড়া করে দেখতে যাবে মিঠু। মেলায় এবার বেশ কিছু নতুন বই এসেছে। বেশি কবিতার বই। মিঠু ভাবে-এতো কবিতার বই কি বিক্রি হয়! কবিতার পাঠকের সংখ্যা কেমন? এসব ব্যাপারে তার জানতে ইচ্ছে করে। অথচ এ নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করতে মন চায় না। আজ তার সব পরিকল্পনাই এলোমেলো হয়ে গেছে। অথচ সে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল অনেক পরিকল্পনা নিয়ে। কিন্তু যেন সব ভুলে গেছে সে। এভাবে জীবনের অনেক পরিকল্পনাই তার ধুলিস্যাৎ হয়েছে কিছু কিছু অনাকাংখিত ঘটনায়। একটা কবিতার বই বের করার সুপ্ত বাসনা ছিলো তার দীর্ঘদিনের। প্রতিটি বই মেলা এলেই তার মনে হয়- এবার হলো না, আগামী বছর বই মেলায় একটা বই প্রকাশ করা যায় কিনা দেখা যাবে। এভাবেই চলে গেলো বছরের পর বছর। হয় না বই প্রকাশ। সেই সামর্থ্য হয় না কোন বছরই। আর প্রকাশকরা তো বিনে পয়সায় বই বের করে দেবে না। ভাবতে ভাবতে এই স্টল থেকে অন্য স্টলে যেতে থাকে মিঠু। দু’তিন পদক্ষেপ ফেলতেই পেছন থেকে কে যেন ডাক দেয়- ‘এই যে শুনুন।’ দাঁড়ায় মিঠু। পেছনে দেখে রুমী চেয়ে আছে তার দিকে দু’চোখে যন্ত্রণার ছাপ। অনুনয়-বিনয়ের সুরে আবারও ডান হাত একটু বাড়িয়ে ‘একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।’ মিঠু পেছন ফিরে রুমীর মুখোমুখী ‘হয়। ‘কী কথা?’- রুমী তার বা দিকে একটু দূরে কিছুটা কোলাহলমুক্ত স্থানটিকে দেখিয়ে বললো- ‘ওখানে চলুন।’
দু’জন চুপচাপ মুখোমুখী দাঁড়িয়ে মিনিট খানেক। নিস্তব্ধতা ভাঙ্গে রুমীই প্রথম- : সম্ভবত তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলেই আজ এখানে আমাকে আসতে হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত একবারও মনে হয়নি বইমেলায় যাই। আজ সকালেই হঠাৎ মনকে কে যেন তাড়া দিলো। চলে এলাম। এখানে এসে তোমার সাক্ষাৎ পেলাম। গত পাঁচ বছরে একটি মুহূর্তের জন্য তোমার স্মৃতিকে তাড়িয়ে দিতে পারিনি। কেন কী কারণে তুমি আমাকে ভুল বুঝেছো। কেবলমাত্র সেটা বোঝার জন্য আমি এতোদিন সাধনা করেছি- জীবনে যদি কোথাও কোনদিন তোমার সঙ্গে একটিবারের জন্য দেখা হয়! আজ আমার এই সাধনা পূর্ণতা পেলো। শান্তনা এখানেই যে, অন্তত তোমার সামনে তো দাঁড়াতে পেরেছি। কী বলবে না কিছু?
: কী বলবো?- মাটির দিকে চেয়ে আছে মিঠু মাথা নীচু করে।
: কলেজে তোমাকে খুঁজেছি অনেক। তার পর থেকে কতো যে চেষ্টা করেছি, তোমার কোন খোঁজ পাইনি। বাড়ির ঠিকানাটাও জানি না। অবশেষে পথ ভুলে যাওয়া পথিকের মতো এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বন্দী হয়ে পড়ি আপনবৃত্তে। কিন্তু না। কিছু দিনের মধ্যেই সেই বৃত্ত ভাঙ্গার জন্য ওঠে পড়ে লেগে যায় আমার পরিবার। আমাকে নতুন পথের ঠিকানা দিতে চায় তারা। ঘোরাতে চায় তারা আমার জীবনের মোড়। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর বিয়ে দিয়ে দেন আমাকে এক প্রবাসীর সঙ্গে। কিন্তু আট- পৌরে ঘর সংসার আমার জন্য তো নয়! বিদেশে যাওয়ার পর সে কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে রেখে চলে যায় অন্যত্র, অন্য নারীর কাছে।.... কিছুক্ষণ নীরব থাকে রুমী। ‘আমি কি তোমাকে খুব বেশি বিরক্ত করে ফেলেছি?
: না।
: তবে কিছু বলছো না যে?
: চলি, আমার কাজ আছে। -অন্যদিকে চেয়ে চেয়ে বললো মিঠু।
: যাবে তো অবশ্যই। ধরে রাখার শক্তি যখন ছিলো তখন পারিনি। এখন তো আমার সব শক্তি-সামর্থ্য হারিয়ে গেছে।
-কথাগুলো শেষ হতে না হতেই হাঁটতে শুরু করলো মিঠু মেলার বহির্মুখী পথে।
এই তো সেদিনও একে অন্যের অদর্শনে খাঁ খাঁ মরুভূমি হয়ে যেতো হৃদয়। পার্ক-রেস্তোরাঁয় হাতে হাত ধরে তাদের ছিলো অবাধ বিচরণ। লোকে বলতো মানিকযুগল। মিঠুর কাধে হাত রেখে বলতো রুমি- ‘আচ্ছা, যদি কোনদিন তোমার আমার মাঝখানে প্রকান্ড দেয়াল এসে দাঁড়ায়, যদি আমাদের দু’জনকে দু’দিকে ঠেলে দেয়, তখন?’-মিঠু অবশ্য রুমির এসব কথা হেসে উড়িয়ে দিতো-‘আরে দূর, তা কি কখনও হয় নাকি।’ কিন্তু আজ সেটাই বাস্তব হয়ে গেলো পাঁচ বছরের ব্যবধানে।
আসলে মিঠু জগতের কঠিন বাস্তবতা অনুভব করেনি কখনও। দেখেনি কখনও মানুষের ভেতরকার যাদুকীয় দর্পণ। দেখেছে সে শুধু রুমীর বাইরের অপরূপ সৌন্দর্য্য-লাবণ্য, দেখেনি তার অন্তরের পাথরটি। আর তাইতো সেদিন রুমীর কথায় কান দেয়নি সে। ‘তবে কি রুমি অনুভব করেছিলো। এমনি এক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছিলো তাদের জন্য! তবে কি এটা তার খেয়ালী মনের সাময়িক বিনোদন? কিন্তু তার কাছে যেটা কিছু সময়ের খেলা, আমার কাছে তো তা মৃত্যুসম যন্ত্রণার মতো।’
-ভাবে মিঠু। কিন্তু কোল কিনারা পায় না।
মিঠুর জীবন থেকে পালিয়ে গেছে রোমাঞ্চিত দিনগুলো; পালিয়ে গেছে কবিতা লেখার সময়গুলো, হারিয়ে গেছে গানের সুর। আজ কেবল মনে পড়ে সেই প্রথমদিনের কথা, প্রথম পরিচয়ের কথা, প্রথম চোখাচোখির কথা; সেই অভিষেক অনুষ্ঠানের কথা। মিঠু তার ভরাট কন্ঠে গেয়েছিলো সেদিন যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো... রবি ঠাকুরের সেই গানটি, ‘আমারও পরানও যাহা চায় তুমি তাই তুমি তাই গো’.....
হল ভর্তি দর্শকের তুমুল করতালি কুড়িয়েছিলো মিঠু সেদিন। আর রুমী সংগোপনে একটি গোলাপ দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলো মিঠুকে। মিঠুও জবাবে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দিয়ে একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করেছিলো ‘ধন্যবাদ’। রুমীর কাছে যা ছিলো সাতরাজার ধন। আর সেই থেকেই উচাটন মনের হটফটানি শুরু; সেই থেকেই শুরু ‘টিনএজ লাভ’। শুরু হয় একে অন্যের কাছে আসা। ধীরে ধীরে মিঠুর সাথে রুমীর সম্পর্কটা গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো। তখন থেকেই মিঠু হয়ে ওঠে রুমীর নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তব কিংবা কল্পনার প্রধান অনুসঙ্গ। মিঠুও ভবিষ্যতের স্বপ্নজগৎ গড়ে তুলে রুমীকে ঘিরে। বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বলতায় পেয়ে বসে তাদের। সমাজ-সভ্যতা ভুলে তারা একে অন্যের প্রেমে বুঁদ হয়ে পড়ে।
রুমীর ভালোবাসায় কতোটুকু হৃদয়ের ছোঁয়া ছিলো কিংবা তাতে কী পরিমাণ খাদ ছিলো, অথবা এর পেছনে কি কোন ছলনা ছিলো- এসব নিয়ে ভাবেনি মিঠু; কারণ তারুণ্যের প্রথম প্রেম এরকমই হয়। এতে বাস্তবতার চেয়ে থাকে আবেগের আধিক্য। মিঠু নিজের মতোই ভাবতো রুমীকে; সে নিজে যেমন অকৃত্রিমভাবে ভালোবাস রমীকে, তেমনি রুমীও তাকে তীব্রভাবে কাছে পেতে চায়, হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিতে চায় তাকে। এই রকম একটা বদ্ধমূল বিশ্বাস নিয়ে মিঠু সারাক্ষণই থাকতো প্রাণচঞ্চল। স্বচ্ছ নির্মল আয়নার মতো যে ভালোবাসা ছিলো মিঠুর সেটা যে চোরাবালির স্তূপ, তা বুঝতে খুব একটা দেরী হয়নি তার।
সেই জ্বালাময় ক্ষণটির কথা মনে পড়লেই মিঠু ভুলে যায় সবকিছু, হারিয়ে ফেলে নিজেকে। সেই মুহর্তটুকুই তছনছ করে দিয়েছে তার স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা ঝলমলে বাগানটি। এই ক্ষণটির চেয়ে চরম এবং পরম সত্য আর দ্বিতীয়টি নেই তার জীবনে। ছায়াহ্নের আবছা আলো-আঁধারে মিঠু দেখেছিলো সেদিন তাদের হোস্টেলের করিডোরে এক কোণে দু’টি মানব প্রাণীর অস্তিত্ব। একটি ছেলে আরেকটি মেয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ছেলেটির দু’টি বাহু মেয়েটির কাঁধে রেখে খোশগল্পে মগ্ন। মিঠু খুব সহজেই চিনতে পেরেছিলো সেই মেয়েটিকে। তার মাথা নাড়ানোর সাথে সাথে পিঠের ওপর চুলের বেনীটাও দুলছিলো; মনে হচ্ছিলো একটি গোখরা সাপ পিঠ বেয়ে নীচে নামছে। কলেজে রুমী ছাড়া আর কেউ এতো কারুকার্যময় করে চুলে বেনী বাঁধতে পারে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT