উপ সম্পাদকীয়

পাখি পরিবেশের বন্ধু

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১২-২০১৮ ইং ০০:৩২:০৫ | সংবাদটি ১৮২ বার পঠিত

বাংলার মরমী সাধক, সিলেটের কৃতি সন্তান, দেহতত্ত্বের গানের রচয়িতা হাছন রাজা’র একটি গান বেশ জনপ্রিয়। আর গানটি হলো : মন মুনিয়া রে!/ কোনদিন যাইবায় মুনিয়া/ তুমি উড়িয়া রে!/ মন মুনিয়ারে ...
এখানে মানুষের ‘প্রাণ’কে হাছন রাজা ‘পাখি’র সাথে তুলনা করেছেন। আবার, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী রুনা লায়লা’র একটি গানে বলা হয়েছে :
পাখি কাঁচা ভেঙে উড়ে গেলে/ হবে অচেনা!/ এই মাটির মায়া মিছে কায়া/ কিছুই রবে না!/ খাঁচা ভেঙে উড়ে গেলে/ হবে অ-চেনা!/ পাখি খাঁচা ভেঙে উড়ে গেলে/ হবে অচেনা...!
এখানেও মানুষের ‘প্রাণ’কে পাখির সাথে তুলনা করা হয়েছে। এভাবে আমাদের বাংলা সাহিত্যের সঙ্গীতের প্লাটফর্মে দেহতত্ত্বের অনেক গান আছে, যেগুলোতে মানুষের ‘পরান’কে পাখি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এই ‘পাখি’র কত গুরুত্ব! কত কান্না! অথচ, বাস্তবে আমরা প্রকৃতি জগতের পাখিগুলোকে তেমন একটা গুরুত্ব দেই না। কত পাখি আমাদের ঘুম ভাঙায় নানান সুরে ডেকে ডেকে। আমরা অনেকে ফিরেও তাকিয়ে দেখি না উঠোনের নিম গাছটায় অথবা বাঁশঝাড়ের ওই বন পাখিটার গায়ের রং কি রকম। খোঁজ রাখিনা তারা খেয়েছে কিনা। টাইম নাই আমাগো। আমরা আছি পেটের ধান্দায়। এই পেটের ধান্দা করতে গিয়ে আমগো মাইনষের মইধ্যে অনেকে পাখি শিকার করতে আরাম পায়। কেননা, পাখি বেছলে সলিট টাকা। তাই ফাঁদ পেতে অগো পাখি শিকার করতে আরাম লাগে।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় খাদ্যের সন্ধানে বছরের আশ্বিন ও কার্তিক মাসে দেশের চলনবিলসহ অনেক বিলে ডাহুক, কোড়া, ঘুঘু, বক, রাতচরা, পানকৌড়ি, তিসুল বালিহাঁসসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি খাবার সংগ্রহে নামে। প্রতিদিন গড়ে ২০০-৩০০ পাখি শিকার করা হয়। চলনবিলেই পেশাদার শিকারিরা কমপক্ষে ৩৫-৪০টি স্থানে জাল পেতে, বিষটোপ, বড়শিতে মাছ গেঁথে, বাঁশ ও বেতের পাতা দিয়ে ঘরফাঁদ পেতে শিকারে নামে। এসব পাখি প্রকাশ্যে চলনবিলের হাটবাজারে বেচাকেনা চলছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এইসব কাজ কারবার চলে। অথচ, প্রশাসন যদি একটু সতর্ক হয় তবে এমন অবাধে পাখি শিকার পাখি শিকারিদের কাছে অসম্ভব হয়ে পড়তো।
শীত আসছে, আর শীতের সময় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিশেষ করে সাইবেরিয়া থেকে বাংলাদেশের ছোট-বড় বিভিন্ন জলাশয়ে অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। আর ঠিক তখন, পাখি শিকারিদের মধ্যে রীতিমতো পাখি শিকার উৎসব চলবে। শিকারিদের মুখে পান-সুপারি আর হাসি লেগেই থাকবে। কেউ কেউ নারীর নেশা ও মদের নেশায় মেতে থাকতে কমফোর্ট ফিল করবে। এসব নেশা যারা করে না, তাঁরাও ঘরের বউয়ের নেশায় মাতাল হয়ে রাতে ঘুমঘোরে বউকে বলবে :
বধূ কোন আলো/ লাগলো চোখে/ লাগলো চোখে বধূ/ কোন আলো লাগলো চোখে/ এ-বধূ কোন আলো/ লাগলো চোখে ...
পাখি প্রকৃতির শোভাবর্ধনকারী, প্রকৃতির বন্ধু এবং পাখি আমাদের এই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই দেশের প্রচলিত আইনে পাখি শিকার আইনত অপরাধ। ১৯৭৪ সালের বন্য প্রাণী রক্ষা আইন এবং ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে বলা হয়েছে, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর জেল, এক লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে অপরাধীর দুই বছরের জেল, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, বাস্তবে এই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না। যদি প্রয়োগ হতো, তাহলে এভাবে অবাধে পাখি শিকার হতো না। তাই পাখি নিধন রোধে সরকারের পাশাপাশি সকলকে যেমন সচেতন পাবলিক, পরিবেশবাদী সংগঠন, প্রিন্ট অথবা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের এগিয়ে আসা খুবই জরুরি এবং অবশ্যই, পাখি শিকারের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, পাখি মানব পরিবেশের বন্ধু। আর এই বন্ধুকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আসুন আমরা সকলে মিলে বলি :
ডাহুক যেখান ডাক দিয়ে যায়/ বাতাস বাজায় বাঁশি/ জনমে জনমে বারে বারে যেন/ এই দেশেই ফিরে আসি।/ মাগো, এই দেশেই ফিরে আসি .../ অথবা,/ প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ-এর ভাষায়ই বলি-/ আবার আসিব ফিরে/ ধানসিঁড়ি নদীর তীরে/ এই বাংলায়, হয়তো মানুষ নয়/ হয়তো বা শঙ্খছিল-শালিকের বেশে/ এই কার্তিকের নবান্নের দেশে ...
প্রিয় পাঠক, শঙ্খছিল-শালিক যেমন পাখি, তেমনি ডাহুক, কোড়া, ঘুঘু, বক-এসব পাখিও ‘পাখি’। তো, এই কার্তিকের নবান্নের দেশে আমরা পাখি শিকারি যারা আছে, তাদের কাছ থেকে ওইসব পাখি কিনে এনে মজা করে রান্না করে খাই কেন? কিভাবে? শিকারিরা এইসব পাখি অবাধে শিকার করে ক্যামনে? আমরা এর প্রতিবাদ করি না কেন? ওইসব প্রাণী ‘পাখি’ বলে, তাইতো। কিন্তু পাখি তো পরিবেশের বন্ধু। পরিবেশের বন্ধু ওই ‘পাখি’দের প্রতি একবার সকলের বন্ধুর হাত বাড়াই। চলো বদলে যাই।
লেখক : আইনজীবী-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ
  • বাজারে ভেজাল : ভোক্তারা অসহায়
  • শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা
  • আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ কি আসন্ন?
  • বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট
  • পাকা ধানে আগুন নিভিয়ে দিতেই হবে
  • রমজানের সাধনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ
  • আমাদের নজরুল
  • বালিশাচার
  • পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ
  • নিরাপদ পানির বিকল্প নেই
  • মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফারুক আহমদ চেয়ারম্যান
  • আমাদের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য ও স্বাস্থ্য
  • এবার বোরো ধানে চাল নেই
  • পারমাণবিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব
  • মায়েদের ভালো থাকা
  • দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক!
  • ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক : যুদ্ধ কি অনিবার্য
  • নগরীর দৃশ্যমান সমস্যা ও প্রতিকার প্রসঙ্গে
  • যুদ্ধে যেতে হবে ভেজালের বিরুদ্ধে
  • Developed by: Sparkle IT