উপ সম্পাদকীয়

যে তিন কারণে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জিতবেন না ট্রাম্প

ফাতিহ ওকতেই প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১২-২০১৮ ইং ০০:৩৬:২৮ | সংবাদটি ২৬ বার পঠিত

ট্রাম্প প্রশাসনের কার্যক্রম ও বাগাড়ম্বর-উভয় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা উঁকি দেয়। এমন একটি যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রাখতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রয়োজন বাকি বিশ্বকে তাদের পক্ষে রাখা।
কিন্তু সেটি সম্ভবত ঘটছে না তিনটি কারণে- ১. যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির লিভার যথেষ্ট শক্তিশালী নয় ২. যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি বিশ্বের জাতীয় স্বার্থের বেশিরভাগই এমন একটি ব্যবস্থাপনায় বিন্যস্ত নয় ও ৩. যুক্তরাষ্ট্র রিসোর্স বা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক অসুবিধায় রয়েছে।
চীনের গতিরোধের জন্য শুল্কারোপ দিয়ে খুব বেশি সুযোগ পাওয়া যাবে না। বর্তমানে চীনের জিডিপির ২০ শতাংশ রফতানি থেকে আসে। চীনের মোট রফতানির ১৮ শতাংশ হয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রে এবং চীনা রফতানির অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন প্রায় ৭০ শতাংশ। একে গুণ করলে যে কেউ বের করতে পারবেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের সম্পূর্ণ রফতানি দেশটির জিডিপির মাত্র দুই দশমিক ৫ শতাংশ।
এ সামান্য পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে শুল্ক বাড়ানোর প্রভাব চীনের মুদ্রা ও অর্থনীতি সংক্রান্ত নীতির ওপর বড় ধরনের চাপ ফেলতে পারবে না। বড় ধরনের শুল্কারোপ ভোগ ও বিনিয়োগ ব্যয় হ্রাসের দিকে চালিত করতে পারে এমন বিভিন্ন প্রত্যাশায় পরিবর্তনের মাধ্যমে করারোপের প্রভাবকে হয়তো বড় করা যাবে অথবা এর মাধ্যমে শক্তপোক্ত একটি অর্থনীতিকে কিছুটা সংকটে হয়তো ফেলা যাবে; কিন্তু এ অর্থনীতির অতীত পারফরমেন্স বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে চীন সরকার তেমন ঝুঁকিকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সক্ষমতা রাখে।
বাড়তি শুল্কারোপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন, চীনের রফতানিনির্ভর পণ্য উৎপাদকদের কারখানা স্থানান্তর (বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে) করাতে চাইছে। এ ধরনের কারখানা স্থানান্তর হতে পারে একেবারে সীমিত পর্যায়ে এবং স্থানান্তর করে যুক্তরাষ্ট্রে নেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অ্যাপলের সাবেক ও বর্তমান সিইওদের প্রত্যয়ন মোতাবেক আন্তর্জাতিক সরবরাহ (সাপ্লাই) চেইনে চীনের বর্তমান অবস্থান তাদের যোগ্যতা ও শ্রমশক্তি, দেশটির উন্নত অবকাঠামো এবং অভিজাত উৎপাদন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে হয়েছে, সস্তা শ্রমশক্তির কারণে নয়। এগুলো হচ্ছে দেশটির আকার, সংস্কৃতি এবং সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক উন্নয়ন পদ্ধতির ফল এবং অন্য কোনো প্রার্থীর সঙ্গে কাছাকাছি পর্যায়েও এগুলো মেলার সম্ভাবনা নেই।
তাই শিল্প স্থানান্তর কম মূল্য সংযোজন, শ্রমঘন পণ্য এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সীমিত হতে পারে, বিশেষত চূড়ান্ত সংযোজন পর্যায়ে এবং কারখানা স্থানান্তর হবে সস্তা শ্রমের অর্থনীতির প্রতিবেশী কোনো দেশে। চীন ও অন্য বিদেশি ফার্মগুলোর এ ধরনের উৎপাদন কার্যক্রম কয়েক বছর ধরে সস্তা শ্রমের প্রতিবেশী দেশে ঘটেছে এবং তা চলমান।
যেহেতু এটি চীনের সর্বনিু মজুরি নীতির মাধ্যমে উৎসাহিত একটি প্রক্রিয়া, দৃশ্যত যা নেয়া হয়েছে দেশটির অর্থনীতির উচ্চমূল্য সংযোজন কার্যক্রম অর্জনের জন্য; সেহেতু এটি চীন সরকারের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়াও (যেমনটি করা হয়েছে জেটিই ও ফুজিয়ান জিনহুয়ার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে) চীনের গতিরোধের জন্য যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সম্ভবত চীনের প্রযুক্তির নাগাল ধরার পথকেই ত্বরান্বিত করে। স্বল্পমেয়াদে চীন নিজেদের প্রযুক্তিগত সম্পদকে ঢেলে সাজাবে প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য।
জেটিই মার্কিন প্রযুক্তির ওপর খুবই নির্ভরশীল; কিন্তু হুয়াওয়ে তেমনটি নয়, বরং নিজেদের চিপ দিয়ে তৈরি হচ্ছে। জেটিইকে আরেকবার প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের বিষয়ে বাধ্য করা হলে দুটির একীভূতকরণ একে রক্ষা করতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একে ধরে রাখার মতো প্রযুক্তি চীন যে কোনো জায়গা থেকে নিতে পারে-ফুজিয়ান জিনহুয়াকে বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্র থেকে মুক্ত করে এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীরা যদিও একটি ফ্যাক্টর; কিন্তু এটির সোর্স হতে পারে জাপানি, ইউরোপিয়ান, দক্ষিণ কোরিয়ান, এমনকি আংশিকভাবে অভ্যন্তরীণ সরবরাহকারীরাও।
যেমনিভাবে অকার্যকর, তেমনিভাবে নিজেদের নীতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বেশি দাম চুকানোরও। চীনের পাল্টা আঘাতের পাশাপাশি (যেমনটি সবারই জানা) মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি মধ্যম ও স্বল্প আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও কমিয়ে আনবে উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধির কারণে।
মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার রুখে দেয়ার অর্থ হল একই সময়ে মার্কিন উৎপাদকদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজারে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অপরিহার্যভাবে অন্য দেশের প্রতিযোগীদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া। এমন একটি নীরস ব্যয়-সুবিধা কাঠামো বা এসব নীতি সফলতার খুব বেশি চান্স রাখে না।
সফলতার চান্স বাড়তে পারে যদি ট্রাম্প প্রশাসন অন্য দেশগুলোকে পাশে পায়, বিশেষত যেসব দেশের একলা চলার মতো অগ্রসরমান অর্থনীতি আছে। শুল্ক বৃদ্ধি এবং চীনের ওপর অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার প্রভাব কোয়ালিশন বা জোটগত অর্থনীতির সম্পূর্ণ আকারকে আরও বাড়াবে এবং প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ সত্যিকারার্থে তখনই ছোবল দিতে পারে, যখন অন্য প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশ এতে যোগ দেয়। যা হোক, এমন জোট সদস্য খুঁজে পেতে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠিন সময় পার করতে হবে তিনটি কারণে।
প্রধান যে বিষয়টি এ জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে গঠন করতে হবে তা হল যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। কিন্তু চীনা বাজার বর্তমানে গাড়ি থেকে মুদি- অনেক পণ্যের জন্য তুলনামূলক বড় বাজার এবং অতি শিগগিরই এটি সর্ববৃহৎ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। যদিও কিছু পণ্য ও সেবার জন্য বিধিনিষেধ রয়েছে, তারপরও চীনা বাজারের বেশিরভাগই উন্মুক্ত এবং অগ্রসর দেশগুলোর উৎপাদকরা এরই মধ্যে রফতানি এবং দেশটিতে পণ্য উৎপাদনের পূর্ণ সুবিধাটি নিচ্ছে।
বেশিরভাগই উন্নত অর্থনীতির শিল্প উৎপাদকরা বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে চীনের স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করছে এবং তারা চীনে শিল্প আয়ের ১৫ শতাংশের অনুঘটক। হংকং থেকে তাইওয়ানের এসব পণ্য উৎপাদক বেশি বেশি উৎপাদন করে রফতানি বাজারের জন্য। চীনের সব ধরনের শিল্প আয়ের এক-চতুর্থাংশ আসে বিদেশি অর্থায়নের ফার্ম থেকে।
বস্তুত, চীনের বাজারে ভোগ্য ও উৎপন্ন পণ্যের বেশিরভাগ লাভজনক অংশই এখন উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো কর্তৃক ছড়ি ঘোরানো, যেখানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদকরা মূল্যস্পর্শকাতর ক্ষুদ্রাংশের মালিকানায় রয়েছে। ফলস্বরূপ, অন্য দেশগুলো, বিশেষত উন্নত অর্থনীতি ও অন্য যারা এ মর্যাদায় যেতে চায়, তারা সহজেই চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে না যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্টতার কারণে।
দ্বিতীয়ত, যদিও চীনের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগকে কিছু দেশ আমলে নেয় এবং অন্যদের হয়তো কিছুটা উদ্বেগ আছে (যদিও সেটি ট্রাম্প প্রশাসনের মতো নয়), তাদের ইস্যুগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অত বড় নয় যাতে বাণিজ্য যুদ্ধের মতো ঝুঁকি নেয়া যেতে পারে, যে বাণিজ্যযুদ্ধ বাণিজ্যিকই থেকে যাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
চীন যদি এ সংঘর্ষে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে তাহলে অনেক দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে না। অনেক দেশের ক্ষেত্রে চীনের নেতৃত্ব একটি বিশ্ব ঝুঁকি তৈরি করতে পারে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে চললেও তেমনটি থাকতে পারে। উদীয়মান অনেক অর্থনীতির দেশ নিজেদের মতো ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ নীতির প্রকল্প রাখছে অথবা চীনা স্বপ্ন বা চায়নিজ ড্রিম দেশগুলোর নিজেদের সরকার কর্তৃক চালিত অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধক হচ্ছে না।
ফল হিসেবে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এ সংঘর্ষে সক্রিয় অংশ নিচ্ছে। তারা নিজেদের নীতিগুলোকে দ্বিমুখী আকৃতি দিতে যাচ্ছে, যাতে করে জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ রক্ষা হয় এবং সবার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
তৃতীয়ত, নিজের বেল্ট অ্যান্ড রোড বা এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে প্রভাব বিস্তার করেই বিশ্বে অনেক দেশের জন্য বিনিয়োগ ও অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে পড়েছে চীন। এ ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ নেই।
২০১৭ সালে ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জিডিপি ছিল যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ও ২৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন এবং তাদের জাতীয় সঞ্চয় হার ছিল যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ৪৮ শতাংশ। এ থেকেই বোঝা যায় বিনিয়োগে দেশ দুটি কত ব্যয় করতে পারবে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় সাড়ে তিন ট্রিলিয়ন হলেও চীনের বেলায় ১১ ট্রিলিয়ন। এটি বিবেচনায় নিলে বলা যায় চীন সরকারের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এসব সম্পদ ব্যবহারের ওপর। চীন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্রকল্পে যত ব্যয় করতে পারবে তা অনেক বেশি।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের জেতার সম্ভাবনা তেমন নেই। কিন্তু এটি নিয়ে কারোরই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা উচিত হবে না; এ ধরনের একটি যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করবে।
সংক্ষেপে বললে, একটি বাণিজ্যযুদ্ধ যেহেতু অজেয়, ফলে এটি অনেক তীব্র সংঘর্ষে রূপ নেয়ার আশঙ্কা রাখে। নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উত্থানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি বিশ্ব পরিচালনার আইন নিয়ে বৃত্তের বাইরে গিয়ে ভাবার সময় মনে হয় এসে গেছে-কেবল চীনের বেলায় নয়, ভারতসহ লাইনে থাকা অন্য অর্থনীতির বেলায়ও।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT