স্বাস্থ্য কুশল

এইডস : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১২-২০১৮ ইং ০০:৩৯:০৬ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

‘এ্যাকয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম’- সংক্ষেপে ‘এইডস’ যার করাল থাবায় ক্রমশঃ তলিয়ে যাচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষ। এইডস আজ একটি অতি ভীতিপ্রদ নাম। ইতিমধ্যে এ রোগের হাঙ্গর দাঁতে আটকে মারা গেছে বিশ্বের বেশ ক’ লক্ষ মানুষ। এইডস এর জীবাণুর নাম রক্ত পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে এইচআইভি। একবার যদি এ রোগের জীবাণু কারও শরীরে প্রবেশ করে তাহলে মৃত্যুই তার একমাত্র পরিণতি। এ পরিণতির নড়চড় হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। এইডস নামের কালান্তর বিভীষিকা স^াচ্ছন্দ্যে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে বিশ্বের সর্বত্র। তার কোন পাসপোর্টের প্রয়োজন হয়না। দেশ-বিদেশের পর্বত, সমুদ্রের বিভাজন রেখা তাকে কোথাও আটকে রাখতে পারেনা।
এইচআইভি এর প্রধান বাহক যৌনতা। যৌনতার কাধে ভর করে এইডস-এর জীবাণু পার পেয়ে যায় দেশ থেকে দেশান্তরে। প্রধানত একাধিক স্ত্রী পুরুষের সঙ্গে অসুরক্ষিত উপায়ে যৌন মিলন হলেই এ রোগ দেখা দেয়। এছাড়া এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রক্ত অন্য কারো শরীরে প্রবেশ ঘটলে এইডস এর বিস্তৃতি ঘটে। এ রোগে আক্রান্ত মায়েদের গর্ভে জš§ নেওয়া সন্তানরাও এইডসে আক্রান্ত হয়ে জš§ নেয় বলেও বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে সত্যতায় পৌঁছেছেন।
সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এইডস এর চিত্রটা আজ ভয়ঙ্কর। আগামী ক’বছরের মধ্যে এইডস-এ আক্রান্ত হবে পৃথিবীর প্রায় এক দশমাংশ মানুষ-এরূপ একটি প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছেন গবেষণারত প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই এইডস এর শিকার হয়েছেন বেশ কিছু মানুষ। প্রায় তিন হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত বলে বিভিন্ন তথ্য ও পত্র-পত্রিকার খবরে প্রকাশ।
এইডস এর ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকার যতই নীরব থাকুক না কেন-এ মারাত্মক ব্যাধি যে কালক্রমে বাংলাদেশের মানুষকে গ্রাস করতে চলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমাদেরকে এইডস এর করুণ মানবিক ট্রাজেডির কথা বাদ দিলেও এ রোগের ডাক্তার, ঔষধ, চিকিৎসা খাতে গোটা পৃথিবীর অর্থনৈতিক বাজেটের একটা বড় অংশ ব্যয় করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এইডস এর এ ক্ষতিকর দিকটা এখনও খুব একটা বড় হয়ে লোক চোখে ধরা পড়ছেনা। এইডস রোগে আক্রান্ত কোন রোগীকে এখন পর্যন্ত মৃত্যু পথ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসার কোন উপায় বের হয়নি। এমতাবস্থায় এইডস প্রতিরোধে জনগণই বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারেন। আর এ জন্যে প্রয়োজন জনসচেতনতা। একমাত্র জনসচেতনতার মাধ্যমেই এইডস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অরক্ষিত যৌনাচারকে এ রোগ সংক্রমণের মূখ্য কারণ হিসাবে গণ্য করা হলেও এটিই এইডস-সংক্রমণের একমাত্র কারণ নয়। আরও কারণ আছে-যেমন একই সিরিঞ্জের মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির ড্রাগ গ্রহণ এ রোগ ছড়ানোর অন্যতম এক কারণ। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মণিপুর ও তার আশপাশ এলাকায় এইডস-রোগীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে বলে পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে তা সত্যিই আতঙ্কের ব্যাপার। ইদানিং ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যগুলোতেও এইডস ছেয়ে গেছে। এসব প্রদেশের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র থাকার কারণে আমাদেরও ভয়ের যথেষ্ট কারণ আছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের দেশের বিভিন্ন শহরে জানামতে অনেক নিষিদ্ধ পল্ল¬ী রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, রে¯েঁÍারা ও বাসাবাড়িতে রয়েছে অনেক না জানা নিষিদ্ধ পল্ল¬ী। সে সব স্থান থেকে এইডস রোগের জীবাণুর জন্ম নিয়ে রোগাক্রান্ত হওয়া খুবই স্ব^াভাবিক ব্যাপার। দেশের স্বীকৃত এসব নিষিদ্ধ পল্লীতে আজ পর্যন্ত কোনও মেডিকেল টীম সরকারী বা বেসরকারী তরফে পাঠানো হয়েছে বলে জানা নেই। দেহ ব্যবসায়ীদের রক্ত পরীক্ষা করার কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। যৌনকর্মীদের অধিকাংশই এইডস নিয়ে সচেতন নয়। এসব পল্ল¬ীর যৌনকর্মীরা সত্যি সত্যিই এইডসে আক্রান্ত কি-না এ নিয়েও কোন সমীক্ষা এখনও হয়নি। এছাড়া শহরাঞ্চলের ভ্রাম্যমান যৌনকর্মীরা এ রোগ জীবাণু বহন করে এইডস ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় জানা যায় আমাদের দেশে বেশ কিছু এইডস রোগী রয়েছেন। তবে আসল তথ্য কেউই কখনও দিতে পারছেন না। সতর্কতামূলক তেমন কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা নেই।
এইডস সম্বন্ধে আজও অশিক্ষিত ব্যক্তি থেকে রক্ত সংগ্রহের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নয়। অবাধ ও অবৈধ যৌনতা রোধে নিরোগ বা সুরক্ষিত যৌন সংসর্গের সম্বন্ধে দেশের অধিকাংশ লোকেরই কোন ধারণা নেই। তাই এ সব ব্যাপারে অসচেতন জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে হবে, তা না হলে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়, বিস্তৃতি বাড়বেই।
জনসচেতনতা নানাভাবে সৃষ্টি করা যায়। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে এইডস থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, জনসভা, পোষ্টার, আলোচনা সভা, পথনাটিকা বিশেষ সহায়ক। এইডস রোগের কারণ, পরিণতি ও প্রতিরোধের ব্যাপারে বিস্তৃতভাবে এসব মাধ্যমে প্রচার চালালে জনগণ অবশ্যই সচেতন হবেন। শহর, বন্দর থেকে শুরু করে গ্রাম গ্রামান্তরের বিভিন্ন জায়গায় এইডস সম্বন্ধে পুরোপুরি জ্ঞাত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনই অগ্রণী ভূমিকা নিলে জনগণ এ ভয়াবহ ব্যাধি স¤পর্কে ওয়াকেবহাল হবেন। যুব প্রজšে§র কাছে অবাধ যৌনতার সুরক্ষা, নিরোধের ব্যবস্থা, সিরিঞ্জের ব্যবহার, রক্ত গ্রহণের ব্যাপারে সাবধানতা খোলামেলাভাবে জানিয়ে দিতে হবে। সর্বাগ্রে সরকারের সংশ্লি¬ষ্ট বিভাগগুলোকে তৎপর না হলে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি দুরূহ ব্যাপার হবে। চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাহায্য নিয়ে সরকার নিষিদ্ধ পল্লীসহ বিভিন্ন জায়গায় রক্ত পরীক্ষা শিবির করা এবং রক্ত পরীক্ষার পর যাদের এইচআইভি জীবাণু ধরা পড়ে তাদের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। এইডস এর ব্যাপক প্রসার রোধে প্রতিটি বড় বড় শহরে এইডস ক্লিনিক খোলার ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করা যায়। মোটকথা এইডস প্রতিরোধ করা না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§ তথা মানব সমাজকে কোন ভাবেই নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT