স্বাস্থ্য কুশল

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে শসা

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১২-২০১৮ ইং ০০:৪৪:৪৮ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় করার জন্য শরীরের নিজস্ব একটা ক্ষমতা আছে। সচেতন হয়ে খাদ্য গ্রহণ করলে শরীরে সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। তাই আমাদের আশ পাশের থাকা নানা ফল মূল শাক-সবজি খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে নানা সমস্যার সমাধান করা যায়। খাদ্যের মাধ্যমে রোগ নিরাময় করাকে বলা হয় ডায়োটোথেরাপি। ডায়োটোথেরাপি প্রধানত রোগ নিরাময়কারী খাদ্য গ্রহণে আমাদের সচেতন করে গড়ে তুলে। ফলে ঐ সব খাদ্য নিজেই রোগ দূর করে বা প্রতিরোধ করে।
আমাদের চারপাশে যেসব প্রাকৃতিক খাদ্য রোগ প্রতিরোধে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করে। তার মধ্যে শসা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সবজি। এটি ছোট বড় সকলের নিকট অতি পরিচিত একটি সবজি। লতানো উদ্ভিদে জন্মানো ফলটি লম্বায় ২৫-৩০ সেন্টিমিটার হয়। আবার খাটো জাতের শসা লম্বায় ১৫-২০ সেন্টিমিটার হয়। এটি শীতকালীন ক্ষেতে খামারে প্রচুর চাষ করা হয়। তাছাড়া শসা সারা বছরেই চাষ করা যায় এবং হাট-বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে এ সবজিটিকে খিরাও বলা হয়। এটি উদ্ভিদ জগতের ঈঁপঁৎনরঃধপবধব গোত্রের উদ্ভিদ। এর ইংরেজি নাম ঈঁপঁসনবৎ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ঈঁপঁসরং ংধঃরাঁং শসা কাঁচা খাওয়া যায়, সালাদ করে খাওয়া যায়, মাছ, মাংস এর সাথে তরকারী হিসাবে খাওয়া যায়। তবে কাঁচা খাওয়াটাই শরীরের জন্য বেশী উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ আছে। যা আমাদের স্বাস্থ্য অটুট থাকতে খুবই সাহায্য করে।
শসার খোসা বা বাকল খুবই মূল্যবান। এর কোসে লবণ এবং ভিটামিন থাকে। তাই ভালো করে ধুয়ে বাকল সহ শসা খাবেন। শসা পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, সিলিকা, ক্লোরিন ও ফ্লোরিনের একটি মূল্যবান উৎস। দেহের পানি শূন্যতা, ত্বকের সজীবতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার প্রতিরোধে শসা বিরাট ভূমিকা পালন করে।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী শসাতে খাদ্য উপাদান হলো জলীয় পদার্থ ৯৬.৩ গ্রাম, প্রোটিন ১.৬ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, খনিজ পদার্থ ০.৪ গ্রাম, আঁশ ০.৪ গ্রাম, শর্করা ৩.৫ গ্রাম, ভিটামিন বি১ বা থায়ামিন ০.১৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ রাইবোফ্লাবিন ০.০২ মিলিগ্রাম. ভিটামিন সি ৭ মিলি গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৪ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.৫ গ্রাম, ফসফরাস ২৫ মিলিগ্রাম, খাদ্য শক্তি ২২ কিলোক্যালরি এবং সামান্য পরিমাণে ভিটামিন এ থাকে। শসাতে পটাসিয়াম থাকায় উচ্চ রক্তচাপ কমে যায়। কারণ পরিমিত পটাসিয়াম রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। শসার পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম স্বাভাবিক রক্ত চাপ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শসার ডায়াটারি ফাইবার দাঁত ও মাড়ির নানা রোগ থেকে বাঁচিয়ে আমাদের সুরক্ষা করে। মুখের দুর্গন্ধ, রক্তপড়া দূর করে।
গবেষকদের মতে শসার মধ্যে ফাইটোনিউট্রিয়েট উপাদান আছে যা স্তন ক্যান্সার, মহিলাদের গর্ভাশয়ের ক্যান্সার, মূত্রনালী ও পুরুষের অন্ত্র কোষের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। শসাতে যে পানি থাকে তা শরীরের জমা থাকা ক্ষতিকর ও বিষাক্ত উপাদানগুলো অপ্রসারণ করে রক্তকে পরিষ্কার করে। শসা চামড়ার রোদে পুড়া ভাব দূর করে এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। শসাতে স্টেরল নামক উপাদান থাকে যা শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। শসাতে অ্যারপসিন নামক এনজাইম থাকে যা হজম কাজ দ্রুত করে এবং কোষ্টকাঠিন্য দূর করে। শসাতে সালফার ও সিলিকা যে উপাদান থাকে তা আমাদের মাথার চুল ও নখ উজ্জ্বল রাখে। তাছাড়া আরো যে সকল উপকার শসা থেকে পাই তা নি¤œরূপÑ
যারা ডায়বেটিস রোগে ভোগছেন তারা নিয়মিত সকাল বিকাল শসা খান। দেহের ইনসুলিন তৈরি হবে। এতে আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসবে। যারা উচ্চ রক্ত চাপ বা নিম্ন রক্ত চাপে ভোগছেন তারা নিয়মিত সকাল বিকাল বাকল সহ শসা খান। রক্তের চাপের ভারসাম্য বজায় থাকবে। যারা গ্যাস্ট্রিক আলসার অ্যাসিডিটি বা ঘনঘন ঢেকুর ওঠার রোগে ভোগছেন তারা নিয়মিত শসা খান উপকার পাবেন।
যাদের ঘনঘন পিপাসা জাগে বা শরীরে পানির শূন্যতা দেখা দেয়। তারা নিয়মিত শসা খান সমস্যা কমে আসবে। শরীর পুষ্টি পাবে। কারণ শসার প্রায় ৯৭ ভাগই জলীয় অংশ। প্রচন্ড গরম লাগলে শরীরের ভিতর ও বাহিরে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। যা শরীরে জন্য ক্ষতিকর। এমন অবস্থায় শসা খান বেশ উপকার আসবে, তাপ কমে আসবে। আমাদের শরীরে নানা খাবার থেকে প্রতিনিয়ত টক্সিন নামক এক প্রকার এসিড তৈরি হয়। যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, শসা খেলে এ বিষাক্ত ক্ষতিকর টক্সিন দেহ থেকে বের করে দেয়। নিয়মিত শসা খেলে তার জলীয় অংশ চামড়ার সৌন্দর্য ঠিক রাখে ও সজীবতা বজায় রাখে। যাদের দেহের ওজন বেশী তারা নিয়মিত শসা খান ওজন কমে আসবে। কঁচি শসা বাকল সহ নিয়মিত খান তা চোখের জন্য খুবই উপকার সাধন করবে এবং চোখের নানা রোগ দূর হবে। যারা চোখের নিচে কালো দাগ নিয়ে ভোগছেন তারা শসা চাক চাক করে কেটে চোখের পাতার নিচে লাগিয়ে রাখুন। নিয়মিত কয়েকদিন করলে সমস্যা কমে যাবে। নিয়মিত শসা খান মূত্র পরিষ্কার হবে। কিডনী সুস্থ থাকবে এবং কিডনীতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। যাদের মুখের দুর্গন্ধ হয় তারা শসা কামড়িয়ে অথবা টুকরা টুকরা করে ধীরে ধীরে চিবিয়ে খান সমস্যা কমে আসবে। শসায় ক্ষার তৈরিকারী খনিজ পদার্থের পরিমাণ ৬৪.০৫%, অম্ল তৈরিকারী খনিজ পদার্থে পরিমাণ ৩৫.৯৫%। তাই রক্তে ক্ষারতা বজায় থাকে এবং খনিজ পদার্থগুলো রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে। এ উপকারী সবজিটি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখুন এবং ছোট বড় সকলকে খেতে দিন।
সতর্কতা : টাটকা, কঁচি, বাকল সহ কাঁচা শসা খাবেন। রান্নার সময় তাপে খনিজ উপাদান পটাসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়। তাই কাঁচা খাওয়াই ভালো। শসা কেটে ফেলে রাখবেন না বা ফ্রিজে ভরে রাখবেন না এতে তার জলীয় অংশ বের হয়ে পুষ্টি উপাদন বের হয়ে যায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT