উপ সম্পাদকীয়

দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ চাই

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-১২-২০১৮ ইং ০৩:১০:৫৬ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত দেশ। বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে দারিদ্র্য প্রধান সমস্যা। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে এদেশের সমাজজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত। দারিদ্র্য আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নতি ও অগ্রগতির ধারাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে পারছেনা এদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ। দারিদ্র্যের প্রভাবে আমাদের দেশের মানুষ মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও অপকর্ম করছে। দারিদ্র্যর ব্যাপকতার ফলে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও চিত্তবিনোদনসহ তাদের জীবনের কোনো মৌলিক চাহিদাই সঠিকভাবে পূরণ করতে পারছেনা। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ বর্তমানে দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হবার কারণে এদেশের আর্থ-সামাজিক জীবনে দারিদ্র্য অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। আমাদের জীবনের এমন কোন দিক নেই যা দারিদ্র্যের প্রভাবমুক্ত।
দেশের প্রতিটি সমস্যার সাথেই দারিদ্র্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। দাম্পত্য কলহ, পারিবারিক ভাঙন, আত্মহত্যা, যৌতুকপ্রথা, পতিতাবৃত্তি, অপরাধপ্রবণতা প্রভৃতি দারিদ্র্যের কারণেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দারিদ্র্যের ব্যাপকতার কারণেই বাংলাদেশে কৃষি খাত, ক্ষুদ্র কুটির শিল্পসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উন্নতি ঘটছেনা। দারিদ্র্যের প্রভাবে দেশে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বার্ধক্য, অকালমৃত্যু, অন্ধত্ব, দুর্বলতা, অসুস্থতা প্রভৃতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দারিদ্র্যের প্রভাবে দেশে সামাজিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ, যুব অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দারিদ্র্যের কারণে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারায় দেশে বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে। দারিদ্র্যের প্রভাবে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘হায়রে দারিদ্র্য! তুই সকল অশান্তির মূল।’ এক কথায় বলা চলে, দারিদ্র্য হল সকল সামাজিক সমস্যার মূল উৎস এবং আমাদের দেশে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। দারিদ্র্য শুধু একটি সামাজিক সমস্যাই নয়; বরং বহু সামাজিক সমস্যার জন্মদাতাও। তাই দারিদ্র্য গোটা বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক অভিশাপ।
বাংলাদেশে দারিদ্র্যের ব্যাপকতার জন্য একক কোন কারণ দায়ী নয়; বরং বহুবিধ কারণেই এদেশে দারিদ্র্য ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিস্তারের বহুবিধ কারণের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে-(১) অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থা। (২) অনগ্রসর শিল্প ব্যবস্থা। (৩) ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা। (৪) মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা। (৫) কুসংস্কার ও ভাগ্যের উপর নির্ভরশীলতা। (৬) প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপকতা। (৭) দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র। (৮) সম্পদের অসম বন্টন। (৯) দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। (১০) অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতা। (১১) ভয়াবহ বেকারত্ব। (১২) ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি। (১৩) সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। (১৪) প্রাকৃতিক সম্পদের অপূর্ণ ব্যবহার। (১৫) বাস্তবমুখী নীতি ও পরিকল্পনার অভাব। (১৬) মহিলাদের কর্মসংস্থানের অভাব। (১৭) সরকারি সম্পদের অপচয়। (১৮) নিয়োগ দানে স্বজনপ্রীতি। (১৯) প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। (২০) ব্যাপক হারে দুর্নীতি। এভাবে আরো অনেক কারণ রয়েছে যেসব কারণে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্রতম দেশ। এই দারিদ্র্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে জাতিসংঘের কোন এক মহাসচিব বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছিলেন-‘ইধহমষধফবংয রং ধ পড়ঁহঃৎু ড়ভ নড়ঃঃড়সষবংং নধংশবঃ.’ সত্যিই দারিদ্র্যতা, অশিক্ষা, নি¤œ মাথাপিছু আয়, অপুষ্টি, জনসংখ্যার আধিক্য, ব্যাপক দুর্নীতি, বেকারত্ব, সম্পদের স্বল্পতা-সবমিলিয়ে বাংলাদেশ নিকট অতীতেও তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কিছু সাহসী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ধরনের স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে তা সত্যিই বিরল ঘটনা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, সামরিক শাসন ও শোষণ ইত্যাদি সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেশ যথেষ্ট উন্নত হলেও তৃণমূল পর্যায়ে দারিদ্র্য দূর হচ্ছে না। সরকারের দেয়া তথ্য মতে-এখন দেশে হতদরিদ্রের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে ৩ কোটি ৮৮ লাখ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এ তথ্যটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ থেকে নেয়া হয়েছে। ২০১০ সালের জরিপে এদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। সংখ্যায় হিসাব করলে তখন হতদরিদ্রের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ কোটি (বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১৮ অক্টোবর-২০১৮)। এটা হচ্ছে সরকারের দেয়া গতানুগতিক হিসাব। এটা হচ্ছে জনগণের কাছে সরকারের সাফল্যের বর্ণনা দেয়ার হিসাব। প্রশ্ন হল-সরকারের দেয়া দারিদ্র্য সংখ্যা তথ্যের সাথে বাস্তবতার কি কোন মিল আছে? ১০ বছর আগে চালের কেজি ছিল ১০ টাকা এখন হয়েছে ৪০ টাকা, ১০ বছর আগে বিদ্যুৎ বিল যে পরিবার থেকে দেয়া হত ২০০ টাকা এখন দিতে হচ্ছে ১০০০ টাকা। চালের কেজি যখন ১০ টাকা ছিল তখনও জনগণ চাল কিনতে হিমশিম খেয়েছিল। বর্তমানে জনগণের মাথাপিছু আয় কয় টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে? আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। এদেশের জনগণ মাছ-ভাত খেয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চায়। দ্রব্যের মূল্য যদি বৃদ্ধি হয়, কমমূল্যে যদি মাছ-ভাত কিনতে না পারে-তাহলে শান্তিতে বসবাস করবে কিভাবে? দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে জনগণ অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করবেন। আর অপুষ্টিতে ভুগবেন! এটা কি দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রমাণ? আমরা সবাই জানি, দুর্নীতি হচ্ছে আমাদের দেশের দারিদ্র্যের মূল কারণ। ২০ বছর আগে এদেশে যেমন দুর্নীতি ছিল সেই দুর্নীতি এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। শুধু তাই নয়; সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি সেক্টরে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এখন চলছে ওপেন-সিক্রেট দুর্নীতি। তাহলে দারিদ্র্য নিরসনের প্রমাণ কোথায়? দেশে বর্তমানে ৬৪ লাখ উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকারত্বের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে চাকুরি না পেয়ে বেকারত্বের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করবে! দারিদ্র্যের দুঃখ এর চেয়ে আর কি হতে পারে?
দারিদ্র্য আমাদের সকল উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। দারিদ্র্যের প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করে এসব দূরীকরণে সকল কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, জনগণের জীবনে শান্তি-স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সরকারের মহান দায়িত্ব।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT