উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

নাগরী সাধক এরহাসুজ্জামান

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১২-২০১৮ ইং ০০:১১:২৮ | সংবাদটি ১৩ বার পঠিত

অসীমের দরোজা খোলার সোনার চাবি হচ্ছে মৃত্যু। আর তাই প্রত্যেক প্রাণিকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মুসলমানদের জন্মের সাথে সাথে আজান দেয়া হয়, আবার মৃত্যুর পর যে জানাজার নামাজ হয়, সেখানে কোন আজান ছাড়া জামাতে নমাজ অনুষ্ঠিত হয়। এই থেকেই বোঝা যায়- আজান আর জানাজার নমাজের মধ্যবর্তী সময় হচ্ছে জীবন। এই জীবন সবার জন্যই খুব ক্ষণস্থায়ী। সেই জীবনকে কেউ কেউ কর্মের মাধ্যমে অমর করে যান তেমনি একজন হচ্ছেন এরহাসুজ্জামান স্যার। এরহাসুজ্জামান সাহেব ১৯৪১ সালে সিলেট শহরের কাছেই শিবের বাজারের বাগুরা গাউয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মাওলানা নজাবত আলী ছিলেন ভারতের দেত্তবন্দ মাদ্রাসা থেকে পাশ করা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন আলীম। একই এলাকার রাজারগাউ এ ছিলো তার নানার বাড়ী। মায়ের নাম ছুরেতুন নেছা। সাত ভাই বোনের মাঝে তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে ছোট। তার লেখাপড়া গ্রামের মক্তব থেকে, পরবর্তীতে তৎকালিন সিলেট হাই মাদ্রাসা (সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার সাথে অবস্থিত ছিল) পরে সিলেট এমসি কলেজ এবং তার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষা সমাপন করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগদেন। সিলেট সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে তার শিক্ষকতা জীবনের শুরু। এরপর সিলেট এম.সি কলেজ, ময়মনসিংহ এম.এন কলেজে অধ্যাপনা করেন। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসাবে তিনি সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেন। গণিতে গোল্ড মেডেল প্রাপ্ত এই গণিত এর শিক্ষক তার কর্মজীবনে কুমিল্লা টি টি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেটে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নাগরী লিপির প্রচার, প্রসার ও নাগরী লিপি রক্ষায় মূখ্য ভূমিকা রেখে ছিলেন এই নাগরী স্যার নামে পরিচিত প্রফেসার এরহাসুজ্জামান। মূলত মায়ের কাছে তাঁর নাগরী শেখা। দুনিয়ার সকল মানুষই মাটির ভাষায় কথা বলে। ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে। কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়। ভাষা হলো চিন্তার পোশাক। সভ্যতার বিকাশ। যে জাতির ভাষা যত উন্নত, ঐতিহ্যগতভাবে সমৃদ্ধ, সে জাতি ততো উন্নত। আমাদের সিলেটিদের যেমন রয়েছে নিজস্ব ভাষা নাগরী, তেমনি রয়েছে নাগরী হরফে নাগরী লিপি। নাগরী স্যার ইমাম গাজ্জালীর কথার মতো এক মহান ব্রতে আবদ্ধ হয়েছিলেন নাগরীভাষা নিয়ে। মানব জীবনের সবচেয়ে কৃতিত্ব হচ্ছে মুখের ভাষাকে আয়ত্বে রাখতে সামর্থ হওয়া। এক এক সমাজের এক এক মানুষের অর্থবোধক ধ্বনির সমষ্টিই ভাষা। পৃথিবীর অনেক দেশেই রয়েছে প্রাচীন ভাষা এবং লিপির ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং গবেষণা। সিলেটের এই নাগরী লিপির রয়েছে প্রায় ছয়শত বৎসর পুরনো ইতিহাস। এই নাগরী লিপি দিয়ে লিখিত হরফে এক সময় বই ছাপা হত। অধ্যাপক এরহাসুজ্জামান নিজে এই নাগরী বর্ণমালার হরফকে কিভাবে প্রচার, প্রসার করা যায় সে ক্ষেত্রে এক অনন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। আমি যেহেতু খুব ছোট বেলা থেকে ব্যক্তি এরহাসুজ্জামানকে দেখেছি, সেই ছোট বয়স থেকে আমার মনে আজ পর্যন্ত একই প্রশ্ন, এতো সাদামাটা, এতো সাধারণ, লোভ-লালসা ছাড়া কি কারো জীবন হতে পারে? যখন তিনি একজন শ্রেষ্ঠ গণিত শিক্ষক, শুধু গণিত বিষয় পারদর্শি একজন অধ্যাপক, তখনও তার পোষাক পায়জামা- পাঞ্জাবি এবং মাত্র দুইটি পোশাক। কাধে ঝোলানো থাকতো একটা থলে টাইপের ব্যাগ। চির কুমার এই মানুষের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি সাধারণভাবে ছিলেন। বিদায় নেয়ার কিছুদিন আগে আমি যখন তার বাজুরা গাঁওয়ের হাওরের মধ্যখানে অবস্থিত বাড়িতে বসে তার সাথে কথা বলছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল ছোট বেলায় পড়া পাঠ্যবই এর সেই গল্প, সুখী মানুষের কাপড় অর্থাৎ তার এই জীবন দেখে মনে হচ্ছিল তিনিই সবচেয়ে সুখী। তার গ্রামের বাড়ীর পৈতৃক বাড়িতে সুন্দর পাকা দালান থাকা সত্ত্বেও তিনি তার গ্রামের বাড়ীর অদূরে হাওড় পাড়ে ছোট কুঁড়ে ঘরে জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন। পীর-ফকির বলতে যা বুঝায় জানিনা এসবের মানে। তবে শিবের বাজার তথা, অনেকেই তাকে আয়না পীর নামে ডাকতেন। এরহাসুজ্জামানকে নিয়ে অনেকের অনেক গল্প থাকলেও আমার মনে হয় তিনি ছিলেন এক রহস্যময় জীবনের অধিকারী। একজন আপাদামস্তক সাদা মনের মানুষ। এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ দরদ। নিজে নিজে পবিত্র কোরআন হেফজ। বছরের বেশির ভাগ সময় রোজা রাখতেন। সম্পূর্ণ দুনিয়া বিমুখ এই মানুষটি একবার দক্ষিণ সুরমায় এক মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এক সময় সেখানে দশ/বারোজন এতিমকে নিয়ে তিনি বসবাস করতেন। মনে পড়ে তখন ১৯৮৬ সালে তিনি চেঙ্গেরখালে একটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে দেন। এই সাঁকো উদ্বোধনের সময় সিলেট থেকে অনেক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর অর্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণকর কাজ, ধর্মীয় শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং নাগরী লিপির প্রকাশ এবং প্রচারে ব্যয় করতেন। নাগরী ভাষায় ছোট ছোট বই ছাপিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতেন। নানান পেশায় প্রতিষ্ঠিত সহ, সারাদেশে তার অসংখ্য ছাত্র রয়েছে।
জীবনের এমন প্রচার বিমুখ মানুষের হাজার সফলতা বা নাগরী আন্দোলন করে হাতে লিখা নাগরী হরফকে প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীর বুকে ছাপার অক্ষরে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। নাগরী লিপি লালন ও চর্চায় আজীবন অবদান রাখার জন্য অধ্যাপক এরহাসুজ্জামানকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে উৎস প্রকাশ। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।
লেখক : কবি।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT