উপ সম্পাদকীয়

যাত্রাপালা

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১২-২০১৮ ইং ০০:১৩:৪২ | সংবাদটি ১৮ বার পঠিত

যাত্রা হলো লোক নাট্যের একটি জনপ্রিয় শাখা। ঐতিহ্যমন্ডিত কোনো লোক বিষয়কে নাট্যরূপ দিয়ে তার যে অভিনয় প্রদর্শন করা হয় তাকেই বলা হয় যাত্রা। খোলা আসরে সোচ্চার কণ্ঠে অতিরিক্ত অঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে অভিনয়, সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে যাত্রাগান বা পালা অনুষ্ঠিত হয়।
যাত্রা শব্দটির সাধারণ অর্থ গমন বা গমনার্থে পদক্ষেপ গ্রহণ। অতীতে কোনো স্থানে যাত্রা বা গমন উপলক্ষে সে সব অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো, কালক্রমে সে সব বুঝাতেই শব্দটি ব্যবহৃত হতে থাকে। ধারণা করা হয় যে, প্রাচীন ভারতে কোনো দেবতার উৎসব উপলক্ষে নৃত্যগীত পূর্ণ যে শোভাযাত্রা করা হতো তাকেই যাত্রা বলা হতো। রথযাত্রা এ রকম একটি উৎসব। যাত্রা হচ্ছে প্রাচীন লোক সাহিত্যের ক্রম বিবর্তিত রূপ। প্রথম শিবোউৎসব, তারপর কূষ্ঠোউৎসব তৎপর রোমান্টিক প্রণোয়পাখ্যান ইত্যাদির প্রচলন হয়। আর এভাবেই বাংলাদেশে যাত্রাপালার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। শ্রী চৈতন্য পূর্বে যে যাত্রার অভিনয় হতো তার প্রমাণ আছে শ্রী ভাগবতে। বৈষ্ণব ধর্ম প্রবর্তিত হলে কৃষ্ণযাত্রা দেশের সর্বত্র ব্যাপ্তি লাভ করে। অষ্ঠাদশ শতক থেকে যাত্রা বিশেষভাবে প্রসার লাভ করতে থাকে। এ সময়ের যাত্রা জগতে শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাশ প্রভৃতিরা ছিলেন খ্যাতির শীর্ষে।
উনিশ শতকে পৌরানিক যাত্রার ব্যাপক প্রচার হয়। মতিলাল রায়, নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের পৌরানিক যাত্রার দল সে যুগে বিশেষখ্যাতি অর্জন করে। বিশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার শ্রেষ্ঠ যাত্রা রচয়িতা ছিলেন মুকুন্দ দাস। তিনি যাত্রার ভিতর দিয়ে দেশাত্মবোধ, রাজনৈতিক, মুক্তি সংগ্রাম ও সমাজ সংস্কারের কথা প্রচার করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ভাগ, দুর্ভিক্ষ মহামারী ইত্যাদি কারনে যে সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেয় তার থেকে উত্তরণের জন্য যাত্রা শিল্পে নবরূপ ও নবপ্রাণ সঞ্চারিত হয়। প্রাচীন যাত্রাগুলিতে ধর্ম, পদ্য সংলাপ ও সঙ্গীতের প্রাধান্য ছিলো। কিন্তু আধুনিক যাত্রা অভিনয় ও সংলাপ প্রধান। উপরন্তু বর্তমানে তাতে আধুনিক সঙ্গীতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যাত্রায় সুসংবদ্ধ কাহিনীর সংযোগ ও সংলাপের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় তা এখন একটি উন্নতমানের শিল্প মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। গীত ও অভিনয় পারদর্শী লোকের সমন্বয়ে যাত্রার পৃথক পৃথক দল গড়ে ওঠেছে। এসব দল পেশাদার ও ভ্রাম্যমান।
যাত্রা দল গঠনের জন্য একজন উদ্যোক্তা থাকেন যাকে বলা হয় মালিক বা সরকার। দলের সর্বময় কর্তা বা স্বত্ত্বাধিকারীকে বলা হয় অধিকারী। একটি ভালো এবং বড় যাত্রা দল গড়ে তোলার জন্য মোটা অংকের পুঁজির দরকার হয়। যাত্রা দলে শিল্পী, কলাকুশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৫০-৬০ জন লোক থাকে। এদের মধ্যে পুরুষ শিল্পী, মহিলা শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, যন্ত্রী, ডেসম্যান, প্রমপটার, ম্যানেজার, বাবুর্চি, চাকর ইত্যাদি থাকে। প্রধানত অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং নৃত্য শিল্পীদের গুণগত মানের ওপরই যাত্রা দলের খ্যাতি নির্ভর করে।
সাধারণত ভাদ্র-আশ্বিন মাসে যাত্রা দলের অভিনয় পালা চলে। কোথাও কোথাও ফাল্গুন মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজা উপলক্ষে যাত্রাদল দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। মাঠ বা হাটবাজার সংলগ্ন খোলা জায়গায় টিন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি প্যান্ডেলে যাত্রার আসর বসে। অভিনয় মঞ্চ থেকে প্যান্ডেলের ঠিক মাঝখানে চতুর্দিকে খোলা অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে। মঞ্চের উপরিভাগে ত্রিপল অথবা টিনের ছাউনি থাকে। মঞ্চের দু’পাশে থাকে বাদ্যযন্ত্রীর বসার স্থান। প্যান্ডেলের ভিতর দর্শকদের বসার জন্য প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও স্পেশাল এই চার শ্রেণির স্থান নির্ধারণ করা হয়। আসরে দর্শকপূর্ণ হলে কাঁসার ঘণ্টা বা হুইসেল বাজিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মঞ্চে প্রবেশের ইঙ্গিত দেয়া হয়। সাধারণত মহিলা শিল্পীদের উদ্বোধনী সংগীত ও কয়েকটি নৃত্য পরিবেশনের পর যাত্রার কাহিনী শুরুর জন্য প্রথম অঙ্কের ঘণ্টা বাজে। প্রথম অঙ্ক শেষ হলে পুনরায় সামান্য নৃত্যগীত হওয়ার পর দ্বিতীয় অঙ্ক শুরু হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে যাত্রা অভিনয় চলতে থাকে।
যাত্রা সচরাচর গভীর রাত থেকে ভোর রাত পর্যন্ত চলে। পূর্বে যাত্রার বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মন্দিরা, খোল, বাঁশি, করতাল, ঢোল ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে ব্যবহৃত হয় হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোলক, ড্রাম, কঙ্গো বেহালা, কর্নেট, অর্গান, বাঁশি, ক্লারিওনেট প্রভৃতি আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।
যাত্রা বাংলাদেশের লোকজ ও মৌলিক সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী অঙ্গ। সাধারণ মানুষের বিনোদন মাধ্যম হিসেবে যাত্রা অতীতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে বিনোদনের আধুনিক মাধ্যমের প্রবর্তন এবং দর্শক শ্রোতাদের রুচি পরিবর্তনের কারণে এর চাহিদা অনেক কমে গেছে। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনও আলো-অন্ধকারের মধ্যে প্রশস্ত মাঠ বা খোলা ময়দানে শত শত দর্শক গভীর আগ্রহ সহকারে যাত্রাপালা উপভোগ করেন। বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোর, খুলনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলে যাত্রাপালার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT