উপ সম্পাদকীয়

রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিণতি

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৮ ইং ০০:০৭:৫১ | সংবাদটি ১৮ বার পঠিত

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, যা একটি যুদ্ধের সূচনা করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট মি: পেত্রো পোরোশেংকু। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এই বলে সতর্ক করেছেন যে, এর ফলে বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।
২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ভূখন্ড ক্রিমিয়া দখলে নেবার পর থেকেই উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। সংকট অব্যাহত থাকাবস্থায় নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাশিয়া ও ক্রিমিয়ার মধ্যবর্তী নৌরুট কের্চ স্ট্রেইটে ইউক্রেনের দুটি গানবোট ও টাগবোটে গোলাবর্ষণ করে এবং এক পর্যায়ে ঐ তিনটি বোট ২৩ জন নাবিকসহ আটক করে রাশিয়ার বন্দরে নিয়ে যায়।
২৫শে নভেম্বর ইউক্রেনের ঐ বোটগুলো কৃষ্ণ সাগরের ওডিসি বন্দর থেকে আজোভ সাগরের মারিউপোলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে কের্চ স্ট্রেইট অতিক্রমকালে রাশিয়ার কোস্ট গার্ড দ্বারা আক্রান্ত হয় বলে অভিযোগ করেছে ইউক্রেন।
কার্চ স্ট্রেইট হলো রাশিয়ার মূল ভূখন্ড ও ক্রিমিয়ার মধ্যে নৌ চলাচলের মাধ্যম বা নৌরুট। এটি হলো কৃষ্ণ সাগর ও আজোভ সাগরের সাথে সংযোগকারী নৌরুট। ২০০৩ সালে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী কার্চও আজোভ সাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অর্থাৎ ঐ দুটি রাষ্ট্রেই সমান অংশীদারিত্ব স্বীকৃত হওয়ায় উভয় রাষ্ট্রেরই নৌ চলাচলের অবাধ অধিকার রয়েছে। অথচ রাশিয়া ইউক্রেনের ঐ অধিকারের বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেন দাবি করছে, সে দেশের জাহাজগুলোর অবাধ যাতায়াতে বাঁধা দিয়ে রাশিয়া যেমন ২০০৩ সালের মস্কো-কিয়েভ চুক্তির বরখেলাফ করেছে, তেমনি দেশটি আন্তর্জাতিক আইনেরও লংঘন করেছে।
ইউক্রেনের জাহাজগুলোয় রাশিয়ার আক্রমণ ও বাঁধাদানের বিষয়টি ফ্রিডম অব মেরিটাইম ট্রাফিক এবং জাতিসংঘের ল অব দ্য সী কনভেনশন এর আর্টিকেল ৩৮ ও ৪৪ এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৯৭৪ সালের ১৪ ডিসেম্বরের ৩৩১৪নং প্রস্তাবের মর্ম অনুযায়ী ইউক্রেনের জাহাজে রাশিয়ার আক্রমণ একটি আগ্রাসন বলে দাবি করছে ইউক্রেন। কারণ, ঐ প্রস্তাব অনুযায়ী কোনো একটি দেশের আর্মস ফোর্সেস, বা ন্যাভাল ফোর্সেস যদি অন্য দেশের আর্মস ফোর্স, নেভাল ফোর্স ইত্যাদির ওপর আক্রমণ করে তবে আক্রমণকারী দেশটি আগ্রাসী শক্তি হিসেবে বা আগ্রাসনকারী বলে গণ্য হবে।
অন্যদিকে, রাশিয়া দাবি করেছে যে, ইউক্রেনের জাহাজগুলো অবৈধভাবে কোনোরূপ পূর্ব অনুমতি ছাড়াই রাশিয়ার জলসীমায় অনুপ্রবেশ করেছিলো। রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) এর মতে, কিয়েভ জাতিসংঘ কনভেনশনের সমুদ্র আইনের আর্টিকেল ১৯ ও ২১ এর বিধি ভঙ্গ করেছে। ঐ সকল আর্টিকেল অনুযায়ী প্রত্যেকটি দেশ তার নিজ দেশের জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতের অধিকার লাভ করেছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী সমুদ্র পাড়ের রাষ্ট্রগুলোর সমুদ্রে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত জলসীমায় সীমান্ত স্বীকৃত। অর্থাৎ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রে সমদ্র পাড়ের একটি রাষ্ট্রের জলসীমার সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত আন্তর্জাতিক আইনে। রাশিয়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিক আইনের বিধি উপেক্ষা করে ইউক্রেনীয়ান জাহাজগুলো ১২ নটিক্যাল মাইলের ভেতরে প্রবেশ করেছিলো এবং নিরাপত্তার স্বার্থেই রাশিয়ান ট্রুপস ঐ জাহাজগুলো লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করে এবং জাহাজগুলোকে আটক করে নিয়ে যায়।
দেশ দুটি পরস্পর পরস্পরকে দোষারূপ করে চলেছে। তবে সার্বিক বিষয়টি কিন্তু দোষারূপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এ ঘটনা বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। অন্যদিকে, দেশ দুটির মধ্যে এখন তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থাৎ ২০১৪ সালের পরে এই প্রথম এমন উত্তেজনাপূর্ণ দ্বন্দ্বে জড়ালো রাশিয়া ও ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী।
ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পেরোশেংকু তার দেশে জরুরি অবস্থা এবং সামরিক শাসন জারি করেছেন এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পূর্ণ যুদ্ধাবস্থায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এর মানে এই নয় যে, যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ইউক্রেনে জরুরি অবস্থা ও সামরিক আইন জারি করা এবং সশস্ত্র বাহিনীকে যুদ্ধাবস্থা প্রস্তুতিমূলক অবস্থায় রাখার বিষয়গুলোকে মারাত্মক উত্তেজক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছেন পুতিন। রাশিয়া এটিকে যুদ্ধের হুমকি বলেই মনে করছে এবং হুমকি মোকাবেলায় রাশিয়াও প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থাৎ নীট ফলাফলটা হলো রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, যা গোটা ইউরোপ এবং এমনকি, বিশ্বব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
বিশ্ববাসী ও রাশিয়া-ইউক্রেন এর মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত এবং কোনো কোনো রাষ্ট্র ইউক্রেনের জাহাজগুলোতে আক্রমণ বা জাহাজগুলো আটক করে রাশিয়ার বন্দরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় রাশিয়াকে দোষারোপ করে চলেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেছেন, ইউক্রেনের প্রতি বৈরী আচরণের প্রতিবাদে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো রাশিয়ার এই আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে উত্তেজনা নতুন কোনো বিষয় নয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত প্রজাতন্ত্র ইউক্রেন স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরবর্তী সময়ে ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার উদ্যোগ নিলে রাশিয়া তাতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। উভয় দেশের মধ্যে শত্রুতার শুরু মূলত: এখান থেকেই।
আর ২০১৪ সালে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। নিজেদের ভূখন্ড দাবি করে রাশিয়া সামরিক অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চলটি দখল করে নিয়ে এটিকে রাশিয়ার ভূখন্ড হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইউক্রেন একটি দুর্বল রাষ্ট্র বিধায় হারানো ভূখন্ড উদ্ধার করতে না পারলেও উভয় দেশের বৈরীতা স্থায়ী রূপ নেয়। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ায় এবং আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রগুলো কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে রাশিয়ার ওপর বাণিজ্যিক এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো এবং সে নিষেধাজ্ঞা এখনো অব্যাহত আছে। কিন্তু রাশিয়াকে তার অবস্থান থেকে টলানো যায়নি।
রাশিয়া নানাভাবে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে ২০১৪ সালের পর থেকে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীদেরকে শক্তিশালী অস্ত্রসামগ্রী এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে চলেছে এবং ফলে পূর্বাঞ্চলে সর্বদাই অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে।
রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার ভূখন্ডের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে। ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কের্চ স্ট্রেইট। ফলে ক্রিমিয়ার সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার দখলদারিত্ব বজায় সহ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা দুষ্কর ছিলো। তাই দেশটি কের্চ স্টোইটের ওপর রাশিয়া-ক্রিমিয়া সংযোগ স্থাপনকারী ১২ মাইল দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে ইউক্রেন তাতে আপত্তি জানালেও রাশিয়া সেতুটি নির্মাণ করে এবং বিগত মে মাসে প্রেসিডেন্ট পুতিন সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এ সেতুটি নির্মাণের ফলে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে রাশিয়া সহজেই সমরাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে পারবে, এটিই ইউক্রেনের জন্য বড় ভয়। ফলে ইউক্রেনের নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার শংকা রয়েছে।
অন্যদিকে, কের্চ স্ট্রেইট হলো ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরের সাথে যোগাযোগের একমাত্র নৌরুট। ২০০৩ সালে উভয় রাষ্ট্রের চুক্তির ফলে এই স্ট্রেইট দিয়ে অবাধে চলাচল করার সুযোগ পেয়েছিলো ইউক্রেন। কিন্তু সম্প্রতি স্ট্রেইটটির ওপর একক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রাশিয়া। ফলে ইউক্রেনের সব ধরনের জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করেছে রাশিয়া। ফলে ইউক্রেনের বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে। একইভাবে রাশিয়া কের্চ স্ট্রেইট ও আজোভ সাগরে সামরিক জাহাজের সংখ্যাও বৃদ্ধি করেছে। রাশিয়া প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ইউক্রেনগামী বা বহির্গামী জাহাজগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে। এভাবে ইউক্রেনকে ভয় প্রদর্শন করে চলেছে রাশিয়া। ফলে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
তবে ইউক্রেনীয়ানরা বলছেন,-‘আমরা আমাদের স্বাধীনতা ও ভূখন্ড রক্ষার জন্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লড়াই করে যাবো। আমরা আমাদের ভূখন্ডের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে প্রস্তুত। আমরা যেকোনো মূল্যে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করবো।’
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT