সম্পাদকীয়

মাটি পুড়িয়ে ইট নয়

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৮ ইং ০০:১৪:০৫ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত


ইটভাটা আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। এখন ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইট উৎপাদন ও ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করতে পারবে সরকার। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়- ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ ২০১৩ সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশের গেজেট জারি করা হয়েছে। সংশোধনীতে আইন লংঘনের শাস্তি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড বহাল রাখা হয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে দ্বিগুন থেকে পাঁচগুন পর্যন্ত। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া ইট প্রস্তুত নিষিদ্ধ। এজন্য জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। তবে কংক্রিট বালি ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি কংক্রিট কমপ্রেস্ড ব্লক ইট তৈরিতে কোন লাইসেন্স লাগবে না। লাইসেন্স ছাড়া ইট তৈরি, ভাটা স্থাপন ও পরিচালনা করলে অনধিক এক বছরের কারাদন্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আগে এই জরিমানার পরিমাণ ছিলো এক লাখ টাকা। এছাড়া লাইসেন্স নেয়ার সময় ইট তৈরির জন্য মাটির উৎস কী, সেটা হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে। সেই সঙ্গে নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা স্থাপন ও কৃষিজমি, পাহাড়, টিলা কেটে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার কিংবা মজাপুকুর, খাল, বিল, দীঘি, নদ-নদী, হাওর-বাওড়, পতিত জায়গার মাটি কেটে ইট তৈরির করলে সাজার বিধান বলবৎ রয়েছে।
মাটি দিয়ে ইট তৈরিই হচ্ছে আমাদের দেশের চিরাচরিত প্রথা। সাধারণত ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি দিয়েই তৈরি হয় ইট। আর জমির এই উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ার ফলে জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কমছে ফসল উৎপাদন। অপরদিকে ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ। ফলে উজাড় হচ্ছে বৃক্ষসম্পদ। পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। এছাড়া জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইটভাট স্থাপন করায় ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সরকার দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে ইট তৈরির জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়ে আসছে। কিন্তু কেউ মানছেনা এই নির্দেশনা। সর্বোপরি প্রচলিত সনাতন পদ্ধতিতে ইটতৈরি বন্ধ করে বিকল্প কংক্রিট ব্লক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কংক্রিট ব্লক হচ্ছে বালু বা পাথরের গুঁড়া ও সিমেন্ট মিশ্রিত বিকল্পভাবে তৈরি ইট। জানা গেছে, পোড়ামাটির বিকল্প হিসেবে যথাযথ প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে ব্লক, থার্মাল ব্লক, ইন্টারলিংক ব্লক ও কমপ্রেস্ড স্ট্যারিলাইজড আর্থ ব্লক। এসব ব্লক দেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে তৈরি শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নদীর বালু ও সিমেন্ট দিয়ে ব্লক তৈরি করা যায়। এতে রক্ষা পাবে কৃষি জমি ও বন্ধ হবে পরিবেশ দূষণ। পোড়ামাটির ব্লকের চেয়ে এই ব্লকের ওজন কম হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কম। সহজ প্রযুক্তি, স্বল্প শ্রমে এটি তৈরি করা যায়। এই ইট শব্দ ও তাপ নিরোধক, ব্যয় সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ বান্ধব। দেশের ১৬টি কারখানায় বর্তমানে তৈরি হচ্ছে এই ব্লক। যা সরকারী বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েক ধাপে এই ব্লকের ব্যবহার সম্প্রসারিত করে ২০২০ সালের মধ্যে পোড়ামাটির ইট ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বেসরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর তাগিদ দেয়া হয়েছে।
প্রতিবছর দেশে কমপক্ষে আড়াই হাজার কোটি পোড়ামাটির ইট তৈরি করা হয়। এতে সাড়ে ছয় কোটি মেট্রিকটন মাটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর বিনষ্ট হচ্ছে চার হাজার হেক্টর কৃষিজমি। আর এই মাটির তৈরি ইট পোড়াতে ৫০ লাখ টন কয়লা, ৩০ লাখ টন কাঠসহ অন্যান্য জ্বালানী ব্যবহার করা হচ্ছে। এইসব ইটভাটা থেকে দুই কোটি টন কার্বন নির্গত হচ্ছে। যা দূষিত করছে বাতাস। সারাদেশে ইটের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজন বছরে তিনশ’ কোটি ব্লক ইট। একটি ব্লক পাঁচটি পোড়ামাটির ইটের চাহিদা পূরণ করে। পোড়ামাটির ইটের তুলনায় ব্লক ইটের উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ কম। পোড়ামাটির ইট তৈরি বন্ধ হয়ে গেছে চীনে অর্ধশতাব্ধি আগে। সারা দেশে এক হাজারের বেশি পোড়ামাটির ইট তৈরির ভাটা রয়েছে, এগুলোকে ব্লক তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT