উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

দেশী মাছের আকাল ও সংরক্ষণ

লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৮ ইং ০০:১৯:২৫ | সংবাদটি ১৭ বার পঠিত

আমাদের দেশে শুকিয়ে যাচ্ছে খাল বিল নদী নালা হাওড় ডোবার মতো প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো। তার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে সেচের মাধ্যমে দেশীয় প্রজাতির মৎস্য আহরণের হিড়িক। ক্রমশই কমে আসছে আমাদের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে বসবাসরত জংলী মাছের সংখ্যা। বিপন্ন হতে চলেছে অনেক মাছের বংশ। বাংলার বুকে এখন আর খুব একটা দেখা যায় না নিরাপদ মাছের অভয়ারণ্য। যেখানে মায়েরা প্রজননে বাঁধার সম্মুখীন হবে না। চলার পথে আসবে না কোন শিকারির তাড়না। যেখানে হবে দেশী-বিদেশী পাখীদের বিচরণ ক্ষেত্র। এমন জলাশয় প্রকৃতি কামনা করে। কিন্তু আমাদের প্রকৃতি প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ ভূলুণ্ঠিত। এর বিশেষ কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অধিক হারে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। বিভিন্ন কায়দায় দেশীয় প্রজাতির মৎস্য আহরণ করা হচ্ছে। সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কায়দা হলো সেচের মাধ্যমে অথবা বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা। সেচের মাধ্যমে হাওড় খাল বিল ডোবা শুকিয়ে মৎস্য আহরণ করা হয়। মাটির ভিতরে কাঁদায় আশ্রয় নেয়া মাছ যেমন-বাইম, গুতুম, চিকরা এরাও রক্ষা পায় না শিকারির ছোবল থেকে।
প্রবাদ রয়েছে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ থেকে এই প্রবাদের সার্থকতা উধাও হয়ে গেছে। মূলত দেশী মাছের আকালের কারণে বাঙালির পাতে আর আগের মতো মাছ ওঠে না। অত্যন্ত সুস্বাদু দেশী প্রজাতির মাছ অনেকটা বিলুপ্তির পর্যায়ে চলে গেছে। যেসব দেশী মাছ এখনো টিকে আচে সেগুলো অনেক দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। মূলত অপরিকল্পিত কৃষি, মাত্রা ছাড়ানো সার ও কীটনাশকের প্রয়োগ আমাদের দেশী প্রজাতির মাছের প্রভূত ক্ষতি করেছে। টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, পাবদাসহ অসংখ্য মাছ অনেকটাই রূপকথায় পরিণত হয়েছে। এগুলোর হাইব্রিড সংস্করণ বাজারে পাওয়া গেলেও সেগুলোর স্বাদ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার দেশী এসব মাছ খামারে উৎপাদন করতে গিয়ে এগুলোর আকার আকৃতি একেবারে পরিবর্তন হয়ে গেছে। চাষের এসব মাছ খেতে অনেক ক্ষেত্রে রুচি হয় না। দেশী মাছ রক্ষায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) বিলুপ্তপ্রায় দেশী মাছ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের চেষ্টায় কিছু আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয়ে মাছের জন্য অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়েছে। এসব অভয়াশ্রমে দেশীয় মাছের একটা আশ্রয় হয়েছে। নতুন করে দেশী বিভিন্ন মাছের দেখা মিলছে। বিলুপ্তপ্রায় ২২ প্রজাতির মাছ এর মাধ্যমে ফিরে আসার নমুনা দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশে ৮০০ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২৬০ প্রজাতি মিঠা পানির ও ৪৭৫ প্রজাতি সামুদ্রিক। এগুলোর মধ্যে ২৮ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে আরো ৫৪ প্রজাতির মাছ। বিএফআরআই বিলুপ্তপ্রায় ১৮ প্রজাতির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে। ২০১৮ সালে অভ্যন্তরীণ মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের মধ্যে ইলিশ অন্যতম অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণের উদ্যোগের ফলে এর উৎপাদন বেড়েছে। ২০১৭-১৮ সালে দেশে পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে এর উৎপাদন ছিল তিন লাখ টন। কৃত্রিম উপায়ে চাষাবাদ বাড়ানো এবং সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন বাড়ার কারণে বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ আসছে মাছ থেকে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বে গড়ে প্রাণিজ আমিষের বিশ শতাংশ আসে মাছ থেকে। একইভাবে যদি দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য আগের মতো ফিলে আসে তাহলে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ রেকর্ড অর্জন করতে পারবে। বিএফআরআই দেশী মাছ সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়ায় আমরা আশাবাদী।
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশী মাছের প্রাচুর্য এখনো আগের অবস্থায় আসেনি। আইড়, চিতল, ফলিসহ প্রায় প্রত্যেকটি প্রজাতির মিঠা পানির মাছের দৃষ্প্রাপ্যতা রয়েছে। বাজারে এসব মাছের একেবারে আকাল। কখনো এসব দেশী মাছের সরবরাহ সীমিত আকারে দেখা গেলেও দাম অত্যন্ত চড়া থাকে। দেশী এসব মাছ আগের উৎপাদন ব্যবস্থায় আনতে হলে ব্যাপক মাত্রায় চেষ্টা-প্রচেষ্টা দরকার। বিএফআরআই যে চেষ্টা চালাচ্ছে, এর মাধ্যমে বিলুপ্ত মাছগুলোর সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এসব মাছ পৌঁছাতে হলে কৃষিব্যবস্থার সংস্কার দরকার। বিশেষ করে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জলাশয় ও নদ-নদী রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া। বেহাত হয়ে যাওয়া জলমহালগুলো উদ্ধারের মাধ্যমে সেগুলোতে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক : কিলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT