উপ সম্পাদকীয়

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক

ওয়ালী নোমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-১২-২০১৮ ইং ০০:২২:২২ | সংবাদটি ২৬ বার পঠিত

ছোটবেলায় সিনেমা হলে গিয়ে অনেক ছবি দেখতাম। চলচ্চিত্রের একটা অদৃশ্য ক্ষমতা আছে, যা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে দর্শকের মনের মাঝে। সিনেমার প্রধান চরিত্রের প্রভাব নিজের মধ্যে দেখতে পেতাম। সেই থেকে বুঝেছিলাম, সমাজ জীবনে সিনেমার প্রভাব সামান্য নয়। দেবী সিনেমাটি দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণটি হলো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা। আর সেটিও আবার তার সৃষ্ট পাঠকনন্দিত চরিত্র মিসির আলিকে প্রথমবারের মতো রুপালি পর্দায় দেখার সুযোগে। পরিচালক অনম বিশ্বাস, প্রযোজক জয়া আহসান, প্রযোজনা সংস্থা ‘সি’তে সিনেমা’-এর (অনুদানে বাংলাদেশ সরকার) কল্যাণে দেবী ছবিটি নির্মিত হয় এবং সিনেমাটির পরিবেশক জাজ মাল্টিমিডিয়া। ১৯ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে দেবী সিনেমাটির প্রদর্শন শুরু হয়।
রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্স, গণমাধ্যম ও বিপণন বিভাগ থেকে জানা যায়, প্রথম দিন থেকে প্রতিটি শো-ই প্রায় হাউসফুল। ভিআইপি হলের টিকিটের দাম ডাবলের চেয়েও বেশি। তা-ও দর্শক কমছে না। দর্শক প্রতিক্রিয়া বেশ ভালো।
পঞ্চম সপ্তাহে চলছে ৯টি সিনেমা হলে, তৃতীয় সপ্তাহে চলে দুটিতে, দ্বিতীয় সপ্তাহে আটটিতে, প্রথম সপ্তাহে আট সিনেমা হলে। শুধু স্টার সিনেপ্লেক্সে, বসুন্ধরা সিটি, ঢাকায় যদি গণনা করা যায়, তা হলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ১২টি শো চলে এবং প্রতিটি শোতে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন দেখতে পারলে, ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার ২০০ জন এ দেবী ছবিটি দেখেছে, যার ৫০ শতাংশই তরুণ ও কিশোর।
এখন আসি সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে, DebiMisirAliMovie ফ্যান পেইজটিতে ফলোয়ার হচ্ছে ১,১৭,৫৫৫ জন এবং পেইজটি লাইক দিয়েছে ১,১৫,৬১২ জন। এ পেইজটিতে মিসির আলির ট্রেলারেও ধূমপানের দৃশ্য যুক্ত আছে, যা চলচ্চিত্রের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউবে আপলোড করা আছে। ফেইসবুক ফ্যান পেইজ ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার ইউটিউবে ট্রেলারের ভিউয়ার সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। DebiMisirAliMovie ফেইসবুক ফ্যান পেইজে পোস্টে দেখা যায়, আরিয়া নামে একজন কম বয়সি ভক্ত হাজির হয় ‘দেবী’ থিমড পোশাকে হ্যালোইনের আয়োজনে। আমাদের তরুণ ও কিশোর সমাজের মধ্যে এ চলচ্চিত্রের একটা প্রভাব এসেছে বলেই ভক্তের এ আয়োজন। কিন্তু আমরা কি বলতে পারি, ধূমপানের দৃশ্য দেখানো ও সিগারেটের বিজ্ঞাপনের প্রভাবে কিশোররা ধূমপানের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে না? নিশ্চয়ই হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। আমাদের অজান্তে মিসির আলিকে দেখে একজন উঠতি বয়সি কিশোর ছেলে সিগারেট খাওয়া শুরু করতে পারে। একটি চলচ্চিত্র যেমন সমাজের কথা বলে, তেমনি একটি সমাজ তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন দেখা যাক, তরুণদের মধ্যে এ সিনেমাটি দেখার প্রবণতা কেমন? ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেজ (ইংরেজি : Internet Movie Database সংক্ষেপে : IMDb) একটি অনলাইনভিত্তিক ডাটাবেজ, যেখানে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং ভিডিও গেম, অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলী, কাল্পনিক চরিত্র, জীবনী, কাহিনি সংক্ষেপ, বিভিন্ন তথ্য এবং পর্যালোচনা সংরক্ষিত থাকে। সাইটটি অ্যামাজন ডট কমের অঙ্গ সংস্থা আইএমডিবি ডট কম ইনকরপোরেটেড দ্বারা পরিচালিত। ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেজ ওয়েবসাইট থেকে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো : দেবী সিনেমাটি দেখেছে এমন ১ হাজার ৬৬৬ ব্যবহারকারীর মধ্যে সিনেমাটি গুণগত মান নির্দেশনাসূচক (Rating) পেয়েছে ১০-এর মধ্যে ৮.৬ এবং ১৮ থেকে ২৯ বয়সের কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ৬৪০ জন গুণগত মান নির্দেশনাসূচক (Rating) দিয়েছে, যা অন্যান্য বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। যে বয়সটিকে তামাক কোম্পানি টার্গেট করে থাকে ধূমপান শুরু করাতে। আমাদের গড় আয়ু ৭৩ হলে, ১৮ থেকে ২৯ বয়স থেকে একজন ধূমপান শুরু করলে তামাক কোম্পানি আরও ৫৫-৪৪ বছর পর্যন্ত তাদের সিগারেট বিক্রি করতে পারবে। সুতরাং তামাক কোম্পানি সবসময় এ বয়সের কাছে ধূমপান ব্যবহারে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকে। সিনেমা একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যার প্রধান চরিত্রকে ব্যবহার করে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশকেও বেছে নিয়েছে তামাক কোম্পানি তার ব্যবসা পরিচালনা করতে।
দেবী চলচ্চিত্রে অন্যতম প্রধান চরিত্রের মিসির আলিকে ১২ বার কিছু সময় নিয়ে ধূমপান করতে দেখা যায় এবং আরও উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, চলচ্চিত্রের শেষের দিকে যখন মিসির আলির দিকে অনেক বেশি নজর দর্শকের, তখন ঢাকা টোব্যাকোর উইনস্টোন সিগারেটের প্যাকেট খুলে সিগারেট বের করা ও পরে তা শার্টের পকেটে রেখে দেওয়ার দৃশ্য কিছু সময় দর্শকের নজর কাড়ে। তাতে বোঝা যায়, চলচ্চিত্রটিতে একটি নির্দিষ্ট সিগারেট ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন করা হচ্ছে। শুধু সিনেমাতেই নয়, সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবে আপলোড করা, মিসির আলিকে নিয়ে নির্মিত ট্রেলারে ধূমপানের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপন আমরা বিশ্বের অনেক সিনেমায় দেখে থাকি। ইউরোপভিত্তিক চলচিত্রের প্রদর্শনের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণার ফলাফল নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬-তে The Guardian পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, যখন কোনো দেশে তামাকের বিজ্ঞাপন ও প্রোমোশন বন্ধ থাকে, সিগারেট কোম্পানি চলচ্চিত্রকে বেছে নেয় নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে। ১৯৮৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৭০ শতাংশ চলচ্চিত্রে ধূমপানের দৃশ্য দেখা যায়, যার ৯ শতাংশ চলচ্চিত্রে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিগারেট প্রদর্শিত হয়। ইউরোপের ১৫টি বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ৯২ শতাংশ জনপ্রিয় হয় ১৮ বছরের কম বয়সের দর্শকের মাঝে।
এবার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর থেকে কোনো সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য দেখানো যাবে না। কোনো সিনেমায় কাহিনির প্রয়োজনে অত্যাবশ্যক হলে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার দৃশ্য রহিয়াছে এইরূপ কোনো সিনেমা প্রদর্শনকালে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে লিখিত সতর্কবাণী, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে, পর্দায় প্রদর্শনপূর্বক উহা প্রদর্শন করা যাইবে।
সিনেমায় তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শন নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিধান ৫-এর উপধারা (১) এর দফা (ঙ) এর শতাংশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কোন সিনেমার কাহিনীর প্রয়োজনে অত্যাবশ্যক হইলে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য রহিয়াছে এইরূপ কোন সিনেমা প্রদর্শনকালে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে লিখিত সতর্কবাণী নিম্ন বর্ণিত পদ্ধতিতে পর্দায় প্রদর্শনপূর্বক উহা প্রদর্শন করিতে হইবে, যথা ঃ- (ক) তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শনকালে পর্দার মাঝখানে পর্দার আকারের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ স্থান জুড়িয়া কালো জমিনের উপর সাদা অক্ষরে বাংলা ভাষায় “ধূমপান/তামাক সেবন মৃত্যু ঘটায়” শীর্ষক স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদর্শন করিতে হইবে এবং উক্তরূপ দৃশ্য যতক্ষণ চলিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সতর্কবাণী প্রদর্শন অব্যাহত রাখিতে হইবে; (গ) প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য রহিয়াছে এইরূপ সিনেমা আরম্ভ হইবার পূর্বে, বিরতির পূর্বে ও পরে এবং সিনেমা প্রদর্শনের শেষে অন্যূন ২০ (বিশ) সেকেন্ড সময় পর্যন্ত সম্পূর্ণ পর্দা জুড়িয়া “ধূমপান/তামাক সেবন মৃত্যু ঘটায়” শীর্ষক সতর্কবাণী বাংলা ভাষায় প্রদর্শন করিতে হইবে।
আইন অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবে এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করিলে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দন্ডের দ্বিগুণ হারে দন্ডনীয় হইবেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে পাঠকনন্দিত মিসির আলি, তরুণ সমাজের মাঝে একটি অনুকরণীয় চরিত্র। প্রধানমন্ত্রীর ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে, রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত দেবী চলচ্চিত্র কি কোনো উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব পালন করতে পারে না? তাই সব পরিচালক, প্রযোজকের এবং প্রযোজনা সংস্থার কাছে আমাদের প্রত্যাশাÑ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) মেনে চলচ্চিত্র তৈরি করুন।
লেখক : মিডিয়া ম্যানেজার, টোব্যাকো কন্ট্রোল প্রজেক্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT