উপ সম্পাদকীয়

হাফিজ মোবাশ্বির আলী

ডা. আতিক মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১২-২০১৮ ইং ০১:০৭:১৭ | সংবাদটি ১৬ বার পঠিত

সিলেট শহরের বিখ্যাত শেখঘাট মহল্লায় ১৮৮৫ সালের কাছাকাছি সময়ে হাফিজ মোবাশ্বির আলী (রঃ) এর জন্ম। তখন ছিল বৃটিশ আমল। বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে সাথে তখন ইসলামের প্রচার এবং প্রসারও চলছিল এ অঞ্চলে। হাফিজ মোবাশ্বির আলীর পিতা হাজী আব্দুল বারী ছিলেন সে যুগের একজন প্রখ্যাত আলেম। তিনি বহুকষ্টে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। আমরা জানি সে যুগে হজ্ব পালন করা অতীব কঠিন ব্যাপার ছিল।
হাফিজ মোবাশ্বির আলীরা ছিলেন ছয় ভাই এবং দুই বোন। তাঁর তিন অগ্রজ অল্প বয়সেই ইহলোক ত্যাগ করেন। অনুজদের মধ্যে একজন ছিলেন হাফিজ আব্দুল মুনিম এবং অন্যজন ছিলেন মনিরুল হক। তাঁর সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মাহমুদ আলী সাহেব ছিলেন দরবেশ প্রকৃতির লোক। অতি অল্প বয়সেই তিনি কোরআনে হাফিজ হন এবং ইসলামী শিক্ষায় বুৎপত্তি লাভ করেন। উল্লেখ্য যে, কোন এক রমজানের রাতে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে যায়। তিনি পরিবারের সবাইকে ডেকে বললেন, ‘আমি অন্তর্দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি- সমগ্র পৃথিবী সেজদায় পড়ে আছে।’ এ কথাটি বলে তিনি যে গৃহত্যাগ করলেন, আর কোন দিনই গৃহে ফিরলেন না। অনেক চেষ্টা করেও তাঁর আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।
হাফিজ মোবাশ্বির আলী নিজ গৃহেই শিক্ষা জীবন শুরু করেন। প্রসঙ্গতঃ একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রঃ) তাঁর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়াসহ দক্ষিণ সুরমা থেকে এ দিক দিয়েই (শেখঘাট) সুরমা নদী পার হয়ে সিলেট শহরে প্রবেশ করেন। কথিত আছে বর্তমান শেখঘাট মহল্লার জামে মসজিদটি যে স্থানে অবস্থিত সেখানেই তিনি প্রথম পদার্পন করেন, বেশ কয়েকদিন সেখানেই অবস্থান করেন।
হাফিজ মোবাশ্বির আলীর পিতামহ শাহ মোহাম্মদ আনোয়ার সাহেব ছিলেন তাঁর প্রথম গুরু। তিনি দিল্লী মাদ্রাসা থেকে টাইটেল ডিগ্রী লাভ করেন। হাফিজ মোবাশ্বির আলীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় দক্ষিণ সুরমার বিখ্যাত আলেম সুলতান উদ্দীন আহমদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়। প্রতিষ্ঠানটি আজ পর্যন্তও শিক্ষার সঠিক মান অক্ষুণœ রেখেছে। উক্ত মৌলানা সুলতান উদ্দীন আহমদই হলেন তাঁর প্রধান শিক্ষা ও দীক্ষা গুরু। তাঁর কাছেই তিনি তফসির ও হাদিস শরীফে জ্ঞান লাভ করেন এবং তাঁর সর্বাত্মক চেষ্টায়ই তিনি কোরআনে হাফিজ হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। হাফিজ মোবাশ্বির আলী দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে লোকজনকে স্বেচ্ছায় জ্ঞান দান করতেন। শেখঘাট মক্তবের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক। শিক্ষায় অনগ্রসর সকল শ্রেণীর মানুষকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি মক্তবটি প্রতিষ্ঠা করেন।
সিলেট শহরের সমকালীন সকল আলেম-ওলামাদের সাথে তাঁর প্রগাঢ় হৃদ্যতা ছিল। মৌলানা মোজাম্মেল আলী (ফুলবাড়ী), মৌলানা রইছ উদ্দীন (বরইকান্দি), মৌলানা মোঃ মুশাহিদ (বায়মপুরী), মৌলানা বশির উদ্দীন (বাঘা), মৌলানা রমিজ উদ্দীন, মৌলানা আব্দুস সালাম, দরগা শরীফের সম্মানিত ইমাম মৌলানা আকবর আলী প্রমুখকে নিয়েই তিনি দ্বীন-ইসলামের দাওয়াত দানে আজীবন যুক্ত ছিলেন। ভারতের প্রখ্যাত আলেম এবং বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা মৌলানা হোসেইন আহমদ মাদানীর সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দেশপ্রেম যে ঈমানের অঙ্গ, এ কথাটি তিনি নির্দ্বিধায় প্রচার করতেন। তাঁর শেখঘাটের বাসভবনে প্রতি বৃহস্পতিবার জিকিরের আয়োজন হতো। প্রখ্যাত আলেমগণ এতে অংশ নিতেন। মৌলানা মোজাম্মেল আলী, মৌলানা রইস উদ্দিন সাহেবকে নিয়ে হাফিজ মোবাশ্বির আলী অত্র অঞ্চলের মানুষকে কোরআন-হাদিস শিক্ষা দিতেন। স্বেচ্ছায় দ্বীন-ইসলামের সেবায় নিবেদিত প্রাণ হওয়ার প্রেরণা তিনি বংশ পরম্পরায় পেয়েছিলেন। তাঁর পিতামহ শাহ মোঃ আনোয়ার দিল্লী মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করেছিলেন। তিনি ফারসি ভাষায় ইসলামী গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন। নিজ হাতে তিনি কোরআন শরীফ লিখে মানুষের কাছে বিতরণ করতেন। শাহ মোঃ আনোয়ারের পিতা মৌলানা মাহমুদ হোসেন এবং তাঁর পিতা মৌলানা শাহবাজ বাংলা ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন অর্থাৎ প্রাচীনকাল থেকেই ইসলামের প্রচার ও প্রসারে হাফিজ মোবাশ্বির আলীর বংশধর এতদ অঞ্চলে নিজেদেরকে নিবেদিত রেখেছিলেন। প্রখ্যাত আলেম মৌলানা হোসেন আহমদ মাদানীর জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাথেও তাঁর গভীর সংযোগ ছিল।
১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে তিনি বিমান হামলায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করেন। এর আগে তাঁর নিজ মহল্লায় শেখঘাট জামে মসজিদে যোহরের নামাজে ইমামতি করেন এবং তাঁর শেষ দোয়া ছিল ‘হে আল্লাহ! আমার প্রাণের বিনিময়েও তুমি এ দেশকে শান্তির পথে নিয়ে যাও!’
তাঁর চেহারা ছিল যেমনি সুন্দর, ব্যক্তিত্বও ছিল তেমনি আকর্ষণীয়, হাঁটতেন অতি ধীরগতিতে। তিনি মানুষের সেবা করতেন তীব্র আবেগের সঙ্গে। তাঁর কর্মময় জীবন ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। তিনি সবাইকে দেখতেন আত্মীয়-পরিজনের মতো। তাই এলাকার লোকজন তাঁকে মামা, চাচা, দাদা, নানা বা উস্তাদজি ইত্যাদি বলে উম্বোধন করতেন। সত্যনিষ্ঠার জন্য এখনো মানুষ তাঁর স্মৃতিকে আকড়ে রেখেছে।
লেখক : সাবেক সহযোগী অধ্যাপক, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT