উপ সম্পাদকীয়

রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি

একেএম দেলোয়ার হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১২-২০১৮ ইং ০১:০৯:২৬ | সংবাদটি ১৫ বার পঠিত

মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বন্ধ শিল্প একে একে চালু করা হবে।’ এর আগে শিল্পমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, একে একে বন্ধ শিল্প চালু করা হবে। এ সম্পর্কিত একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমাদের দেশে শিল্পের অতীত ইতিহাসটা খুব ভালো নয়। বিগত সরকারগুলো বিশ্বব্যাংক আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কথায় ঢালাওভাবে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শিল্পগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ১৯৭৫-পরবর্তী সরকার ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মোট ২৫৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ খাতে ছেড়ে দেয়, যার মধ্যে ১১০টি ছিল বৃহৎ আকারের পাবলিক সেক্টর করপোরেশানের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮২ সালের নতুন শিল্পনীতিতে বেসরকারীকরণের ওপর আরও জোর দেওয়া হয়, মাত্র ছয়টি সেক্টর ছাড়া আর সব সেক্টরে বেসরকারি বিনিয়োগ অবাধ করে দেওয়া হয়। দেশীয় পুঁজিপতি ও বিদেশি সংস্থা বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের আস্থায় আসার জন্য অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বেসরকারীকরণ শুরু হয়। এক বছরের মাথায় ২৭টি টেক্সটাইল মিল ও ৩৩টি পাটকল পানির দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এছাড়া ১৬ মাসের মাথায় ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী ২১টি মাঝারি শিল্প বিক্রি করে দেওয়া হয়। যার ৭৮ শতাংশই ছিল লাভজনক এবং বিক্রি করার কিছুদিনের মধ্যেই যার ৮০ শতাংশ উৎপাদন হ্রাস ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বিশ্বব্যাংকের দলিল অনুসারে, ১৯৮২ সালের শিল্পনীতি অনুসারে পাট ও টেক্সটাইল মিল ছাড়াও আরও ৪৭৪টি শিল্প ও দুটি সরকারি ব্যাংক বেসরকারীকরণ করা হয়। (সূত্র : জুট ইন্ডাস্ট্রি রিহ্যাবিলিটিয়েশন ক্রেডিটÑ প্রজেক্ট কম্পিøশন রিপোর্ট, ১৯৯০)। স্বাধীনতার পরপর রাষ্ট্রীয় পাটকল ছিল ৬৮টি। শাসকশ্রেণির লুটপাট ও অবহেলায় পাটকলগুলোকে লোকসানি বানানো হয়। লোকসান কমানো ও পাট শিল্পের বিকাশের নামে বিশ্বব্যাংকের জুট ইন্ডাস্ট্রি রিহ্যাবিলিটিয়েশন ক্রেডিট প্রোগ্রাম চলাকালে ১৯৮২ সালের নতুন শিল্পনীতির আওতায় ৩৫টি বেসরকারীকরণের পর রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল দাঁড়ায় ৩৩টি। এরপর ১৯৯৪ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে জুট সেক্টর অ্যাডজাস্টমেন্ট ক্রেডিট (জেএসএসি) প্রোগ্রাম যখন হাতে নেওয়া হয়, তখন ২৯ পাটকলের সম্পূর্ণ মালিকানাসহ পাট খাতের ৭৮ শতাংশ মালিকানা ছিল সরকারি খাতে। বিশ্বব্যাংকের ডকুমেন্ট অনুসারে এ ঋণ প্রকল্পের ঘোষিত প্রাধান উদ্দেশ্যগুলো ছিল : রাষ্ট্রায়ত্ত ২৯টি পাটকলের মধ্যে ৯টিকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এবং দুটি পাটকলের ‘বাড়তি’ উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস বা ডাউন সাইজিং; রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো থেকে ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই; বাকি ২০টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মধ্যে থেকে কমপক্ষে ১৮টি পাটকল বেসরকারীকরণ; এ কর্মসূচি নেওয়ার সময় বিশ্বব্যাংকের ডকুমেন্টেই স্বীকার করা হয়েছে পাট খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ নির্ভরশীল। তারপরও রাষ্ট্রীয় কারখানা বন্ধ করা, ডাউন সাইজ করা ও শ্রমিক ছাঁটাই করার পেছনে যুক্তি দেওয়া হয়েছিলÑ লস কমিয়ে শহুরে ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি লাভজনক খাত হিসেবে পাট শিল্পকে প্রতিষ্ঠা করা। বলাই বাহুল্য, বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের মতোই এ প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত পাট শিল্পের বিশিল্পায়নই শুধু ঘটিয়েছে, যার মাধ্যমে পাট উৎপাদনকারী চাষি থেকে শুরু করে পাট শিল্পের শ্রমিক, এমনকি বেসরকারি খাতও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক তার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কলকারখানা বন্ধ করে ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ‘সাফল্যে’ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও স্বীকার করছেÑ বেসরকারি খাতের উৎপাদনক্ষমতা আগের চেয়ে কমে মোট উৎপাদনক্ষমতার ২৫ শতাংশে নেমে আসে, জেএসসি প্রোগাম শুরুর আগে যা ছিল ৩৫ শতাংশ। ১৯৯১-পরবর্তী সরকার আদমজী পাটকল থেকে শুরু করে অনেক বৃহৎ শিল্প বন্ধ দেয়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের আওতাধীন চারটি বৃহৎ চিনি ও প্রায় ২৪টির মতো সহযোগী খাদ্য শিল্প বন্ধ বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, বৃহৎ শিল্পগুলো শুধু বন্ধ বা বেসরকারি খাতে ছেড়েই দেওয়া হয়নি, নিয়মিত সংস্কার বা বিএমআরই না করায় অনেক দিনের পুরোনো শিল্প স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতাও কমে যায়। যেমনÑ বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন চিনিকলগুলোর কথাই বলা যেতে পারে। কুষ্টিয়া চিনিকল ১৯৬১ সালে, কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড ১৯৩৮ সালে, জয়পুরহাট ১৯৬০ সালে, ঝিল বাংলা চিনিকল, ১৯৫৭ সালে, ঠাকুরগাঁও চিনিকল ১৯৫৬ সালে, নর্থ বেঙ্গল চিনিকল ১৯৩৩ সালে, নাটোর চিনিকল ১৯৮২ সালে, পঞ্চগড় চিনিকল ১৯৬৫ সালে, পাবনা চিনিকল লিমিটেড ঈশ্বরদী ১৯৯২ সালে, ফরিদপুর চিনিকল ১৯৭৪ সালে, মোবারকগঞ্জ চিনিকল কালীগঞ্জ ১৯৬৫ সালে, রংপুর চিনিকল ১৯৫৪ সালে, রাজশাহী চিনিকল ১৯৬২ সালে, শ্যামপুর চিনিকল ১৯৬৫ সালে ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল ১৯৩৩ সালে স্থাপিত হয়। এগুলো চলছে এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের একটি শিল্পের স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ২৫ বা ৩০ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। কাজেই ৮০ বা ৮৪ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান কী করে চলতে পারে? যেহেতু বহু আগেই সেগুলোর স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা হারিয়ে বসে আছে। বিএমআর করে কোনোমতে সেগুলো ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে চলছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। চিনি শিল্প হলো কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প। বর্তমানে এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০ লাখের অধিক মানুষ জড়িত। তবে বর্তমান সরকার চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমনÑ দীর্ঘদিনের পুরোনো চিনিকলগুলোকে সংক্ষার, সহযোগী শিল্প গড়ে তোলা, আখ চাষিদের আখ চাষে উৎসাহিত করতে আখের দাম বৃদ্ধি, ই-পুর্র্জিং চালু, সহজেই চাষিদের আখের মূল্য পরিশোধ ইত্যাদি।
একেএম দেলোয়ার হোসেন, এফসিএমএ
চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT