উপ সম্পাদকীয়

শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ

মাছুম বিল্লাহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১২-২০১৮ ইং ০১:১১:০৯ | সংবাদটি ২৩ বার পঠিত

বিদ্যালয়ের মতো একটি পবিত্র স্থানে প্রতিনিয়ত ঘটছে অপবিত্র ঘটনা। এর সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁরাও সমাজের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ, অফিশিয়ালি না হলেও সামাজিক প্রথা অনুযায়ী একজন শিক্ষককে আমাদের সমাজ যেভাবে নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধা করে, সেখানকার কার্যাবলিও সে রকম হওয়াটা উচিত। কিন্তু হচ্ছেটা কী? ব্লাস্ট ও আসক যৌথভাবে ১৮ জুলাই ২০১০ তারিখে বিদ্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিষয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১৩ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে রায় প্রদান করে। এই রায়ে উল্লেখ করা হয় যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্তৃক কোনো রকম শারীরিক শাস্তি প্রদান এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, অপমানজনক আচরণ শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে তা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ ও মানবাধিকার পরিপন্থী। শিশু আইন ২০১৩-এর ধারা ৭০ অনুসারে কোনো শিশুকে আঘাত, উত্পীড়ন, অবহেলাসহ এ ধরনের ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেও শিশুদের আত্মসম্মান ও শারীরিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে স্বাক্ষর প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেকোনো শিশুর প্রতি যেন নির্যাতন, অমানবিক ও অশ্রদ্ধাজনক আচরণ করা না হয় সে বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ।
রাজধানী ঢাকার নামিদামি স্কুল ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী মোবাইল ফোনে নকল নিয়ে এসেছে বলে শিক্ষকরা দাবি করেন। তার মা-বাবাকে বিদ্যালয়ে ডাকা হয়। তাঁরা উপাধ্যক্ষের কক্ষে যান। তিনি কিছু করতে পারবেন না বলে অধ্যক্ষের কক্ষে যান। অধ্যক্ষের হাতে-পায়ে ধরে মেয়েটি ক্ষমা চায়, অনুরোধ করেন মা-বাবা; কিন্তু তিনি তাঁদের সবাইকে বের হয়ে যেতে বলেন, টিসি নিতে বলেন। এ অপমান সহ্য করতে না পেরে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রী। আমরা বলছি না যে অরিত্রীকে বা কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় নকল করার সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু এই বয়সী বাচ্চারা যে এ ধরনের আচরণ করতে পারে, সে আচরণ কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে তার ওরিয়েন্টেশন এবং প্রশিক্ষণ নেই শিক্ষকদের। ঢাকার স্বনামধন্য স্কুলে যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে গ্রামাঞ্চলে যাঁরা পড়াচ্ছেন তাঁরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করছেন, তা সহজেই অনুমেয়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সাইকোলোজি বুঝবেন না? একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সম্মান করবেন না? এসব জটিল পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করতে হয়, তা তিনি জানবেন না?
শিক্ষাঙ্গনে শারীরিক শাস্তি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি বিষয় ছিল কিছুকাল আগেও। মা-বাবা এটিকে শুধু সমর্থন করা নয়, তাঁরা বরং শিক্ষকদের উৎসাহিত করতেন তাঁদের সন্তানদের মানুষ করার জন্য শাস্তি প্রদান করতে। কিন্তু সময় পাল্টেছে। শিশুদের অধিকারগুলো স্বীকার করে নিতে হবে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। শিশুরা তাদের যে স্বভাবসুলভ আচরণ করবে, তার সঙ্গে শিক্ষকদের পরিচিতি থাকতে হবে। চাইল্ড সাইকোলজি, প্যারেন্টিং স্কিল, দুরন্ত ও চঞ্চল শিশুদের কিভাবে ডিল করতে হবেÍএগুলোর ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ দরকার শিক্ষকদের। কিন্তু কে এসব চিন্তা করবে?
শ্রেণিকক্ষের ভালো ব্যবস্থাপনা মানে শাস্তি দেওয়া নয়। এ দুটিকে এক করে দেখা যাবে না। শ্রেণিকক্ষে ভালো ব্যবস্থাপনার ভিত্তি জোরজবরদস্তি নয়, বরং এটি তৈরি হয় বোঝাপড়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কার্যকর যোগাযোগের ভিত্তিতে। শারীরিক শাস্তি খারাপ আচরণ শেখানোর চেয়েও গুরুতর ব্যাপার। আমাদের শিক্ষকসমাজকে এটি বুঝতে হবে।
আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানে ‘শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক’ ক্লাসরুমের কথা বলা হয়। কিন্তু বিষয়টি কী এবং কিভাবে শিক্ষকরা করবেন, বিষয়টি কি কর্তৃপক্ষ তাদের বোঝাতে পেরেছে? কিছু শিক্ষক নিজেরাই এসব নিয়ে চিন্তা করেন, বাস্তবে রূপ দেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন, ক্লাসকে আনন্দময় করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করেন; কিন্তু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে অবহিত না বলে তারা ওই শিক্ষকদের উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে কর্নার করে রাখে, সমালোচনা করে এবং চাপের মধ্যে রাখে। সম্পূর্ণরূপে শিক্ষক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শিক্ষার্থীদের নিষ্ক্রিয় ও কৌতূহলশূন্য শিক্ষা গ্রহণের চেয়ে শিশুরা যখন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখে, সেই শেখা বেশি কাযর্কর হয়Íএ বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জানতে হবে। সেটিই উত্তম শিখন, যেখানে শিক্ষক শিখন সহায়তাকারী হিসেবে শিশুকে শেখার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন, তাকে উদ্দীপ্ত করেন ও শিখনপ্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলছি, জীবন অনেক বড়, অনেক আনন্দের, অনেক সুন্দর। কোনো একটি তুচ্ছ কিংবা বড় ঘটনাকে জীবনের সব কিছু মনে করে আত্মহননের মতো পথ বেছে নেওয়া ঠিক নয়। তোমাদের বরং সাহসের সঙ্গে, ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিটি বিষয়কে মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি মানুষ তৈরির কারখানায় পরিণত হয়নি, প্রসেসের মধ্যে আছে। কাজেই তোমরা তার দায় এভাবে কেন নেবে? পুরো সমাজ এ জন্য দায়ী। ভবিষ্যৎ আনন্দঘন দিনের অপেক্ষায় রইলাম তোমাদের সঙ্গে।
লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT