ধর্ম ও জীবন

মুহাম্মদী আলোকায়ন : সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১২-২০১৮ ইং ০১:১৬:০০ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

চারদিকে জমকালো অন্ধকার। মারামারি, হানাহানি, চুরি, ডাকাতি, খুন, নারী নির্যাতন, ক্ষমতার লড়াই, ক্ষমতার দাপট, সুদ, ঘুষ চলছে একেবারে দিনদুপুরে, সবার সামনে। নেতারা, নেতাদের সন্তানেরা, নেতাদের সাঙ্গপাঙ্গরা যা খুশি তা করছে। চলছে প্রকাশ্য বেহায়াপনা। স্থানে স্থানে নর্তকীদের নৃত্য আর মদের আসর। সমাজপতিরা আয়োজন করছেন বিভিন্ন প্রকার বেহায়াপনার। যিনি ভদ্রলোক কিংবা সুশীল সমাজের সদস্য, তিনি তো এগুলো দেখবেন না বা দেখার চেষ্টাও করবেন না। ঘটনাচক্রে যদি তাদের সামনে কোন বিষয় এসে যায় তখন তারা এড়িয়ে যাবেন অনাগত বিপদের ভয়ে। সমাজপতি কিংবা সমাজপতিদের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। কথা বললে প্রকাশ্য কিংবা গোপনে খবর হয়ে যায়। বিচারপতিরা সব সমাজপতিদের কথায় ওঠা-বসা করেন, বিচারের রায় দেন। অসহায় কিংবা সাধারণ মানুষের কোন সহায় নেই, নেই কেঁদে যাওয়ার জায়গা। যতই অবিচার-বেবিচার হোক, নিরবে বসে সহ্য করতে হবে। ব্যবসায়িরা ব্যবসা করে নিরাপদে বাড়ী ফিরতে পারেন না, দস্যুরা-হাইজ্যাকাররা সব লুটে নিয়ে যায়। বখাটেদেরকে টেক্স দিয়ে ব্যবসা চালাতে হয়। নিজের শহর ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে নিরাপদে ব্যবসা করে বাড়ী ফিরা যায় না। পরিস্থিতি খুবই নাজুক, একেবারে অন্ধকার।
এই নাজুক পরিস্থিতির অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে আরবদেশের মক্কা শহরে জন্ম হলো এক ছেলের। তাঁর মা আমেনা, বাবা আব্দুল্লাহ। বাবা জন্মের আগেই ছেলেকে এতিম করে পৃথিবী ছেড়ে গেলেন। এতিম বলে এই ছেলের কেউ ‘দাইমা’ হতে চাইলো না। দুর্বল, খুবই দুর্বল নারী হালিমা অবশেষে নিলেন এতিমের দায়িত্ব। বয়স মাত্র ছয়ে পা রাখতে না রাখতে এতিম এই ছেলে হারালো তাঁর মা। মা-বাবাহীন ছেলে বড় হলেন প্রথমে দাদা এবং পরে চাচার কাছে। এতিম বলে তাঁকে সবাই আদর করেন। একদিন ইয়ামন থেকে একদল ব্যবসায়ী এলেন মক্কায়। তাদের সবকিছু লুটে নিলো মক্কার বখাটেরা। শহরে বখাটেদের লুটরাজ প্রায় প্রতিদিনের ব্যাপার। তবু কেউ কেউ এলো তরুণ মুহাম্মদের কাছে। সংবাদে তিনি খুব ভাবিত হলেন। অন্ধকার, চারদিকে শুধু অন্ধকার। কি করা যায়? বিষয়টি নিয়ে তিনি শহরের আরো কিছু তরুণের সাথে পরামর্শ করেন। সবার পরামর্শে তাঁকে নেতা করে শপথ হলো প্রতিরোধের। গঠিত হলো তারুণদের সংগঠন হিলফুলফুজুল। আব্দুল্লাহর এতিম ছেলের এই কান্ডের সংবাদে চমকে উঠলো অন্ধকারে ডুবে থাকা সমাজ আর সমাজের কর্ণধারেরা। প্রাথমিকভাবে সবাই মেনে নিলো তাঁর কথা। কিন্তু তখনও কেউ বুঝতে পারেনি এই মুহাম্মদের মাধ্যমে কীভাবে অন্ধকারে আলো জ্বলে উঠার পূর্ব প্রস্তুতি চলছে।
তরুণ মুহাম্মদ তখনও নবী কিংবা রাসুল নয়। তিনি শুধু পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন তাঁর অন্ধকার সমাজ ও সমাজের মানুষদের কর্মকান্ড। নিজের ভেতরে একটা বেদনা অনুভব করছেন, কিন্তু অবস্থা এতই নাজুক যে তাঁর পক্ষে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্ট হচ্ছে। তবে তিনি অক্লান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার। তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে, শহর থেকে। সাধনার জন্য একাকি বসে চিন্তার জন্য খুঁজতে লাগলেন একখন্ড নীরবতা। মক্কা শহর থেকে তিন মাইল দূরে একটি পাহাড়, আমাদের কাছে যার পরিচয়-‘জবলে নূর’। কিন্তু অন্ধকারযুগে কী তা জবলে নূর ছিলো? মোটেও না। নির্জন অন্ধকারই ছিলো, একেবারে ভয়ঙ্কর নির্জনতা। সেই ভয়ঙ্কর নির্জন পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় মাত্র আট হাত দৈর্ঘ্য এবং দু’হাত প্রস্থ একটা ছোট গোহা ছিলো, যা আজ গারে হেরা নামে পরিচিত। অন্ধকারাচ্ছন্ন মানব সমাজের মুক্তির জন্য মুহাম্মদ এই গোহায় বসে চিন্তায় ধ্যানমগ্ন হলেন-পথ খুঁজতে থাকলেন। ভাবতে ভাবতে মাঝেমধ্যে তাঁর এমনও হয় যে, খাওয়াÑগোসলÑসংসার কিছুর সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। খাদিজা, মক্কার খ্যাতমান ধনী নারী, মুহাম্মদের স্ত্রী, মুহাম্মদ থেকে বয়সে বেশ বড়। বিয়ের সময় মুহাম্মদের বয়স ২৫, আর খাদিজার বয়স ৪০। স্বামী মুহাম্মদের জন্য খাদিজার প্রেমই অন্যরকম ছিলো। নারী হয়েও প্রতিদিন সেই উঁচু পাহাড়, জবলে নূরের চূড়ায় তিনি মুহাম্মদের জন্য খাদ্য ও পানি নিয়ে যেতেন। যারা জবলে নূর দেখেছেন, তারা কিছুটা অনুভব করতে পারবেন এর চূড়া কত উঁচুতে। প্রতিদিন চলতে থাকলো অন্ধকার থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিয়ে বেরিয়ে আসার এই ত্যাগ আর সাধনা। জমতে থাকলো মানুষের মুক্তির জন্য মুহাম্মদের হৃদয়ে বেদনার পাহাড়। এমনি করে বয়স চল্লিশে পূর্ণ হলো। মুহাম্মদের ত্যাগ আর সাধনায় মানবজাতির জন্য আল্লাহর অনুগ্রহের দরজা খুলে গেলো। একদিন আল্লাহর বিশেষ দূত জিব্রাইল (আ.) এসে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানিয়ে দিলেন মুহাম্মদকে তাঁর সাধনার ফসল, মানবমুক্তির সঠিক পথ ও পদ্ধতি। প্রথমে মুহাম্মদ বিষয়টি বুঝতে পারছিলেন না। পরে আস্তে আস্তে সব পরিস্কার হয়ে যায়। মুহম্মদ এখন আর শুধু আব্দুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ নয়, তিনি আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী এবং রাসুল হযরত মুহাম্মদ (স.)। আমাদের চিন্তার বিষয়, মহান আল্লাহ পাক ইচ্ছে করলে তাঁর হাবীব হযরত মুহাম্মদ (স.) কে এত কষ্ট, এত সাধনা না করিয়ে ঘরে বসিয়েই সবপথ খুলে দিতে পারতেন। পারতেন গোটা পৃথিবীর সব নিয়ামতকে তাঁর হুকুমের তাবেদার করে দিতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ, তিনি মানবজাতিকে শিক্ষা দিতে চেয়েছেনÑচিন্তা, ত্যাগ ও সাধনা ছাড়া কোনদিন মুক্তির পথ-আলোর পথ অর্জিত হয় না।
জবলে নূরের গারে হেরা থেকে নেমে হযরত মুহাম্মদ (স.) এসে দাঁড়ালেন কা’বা ঘরের পাশাপাশি আবু কোবাইস নামক পাহাড় (জবলে আবু কোবাইসে)-এর চূড়ায়। ডাকলেন অন্ধকারে ডুবে থাকা মক্কার মানুষগুলোকে। দাওয়াত দিলেন ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’র, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন ‘ইলাহ’ নাই। কী অসাধারণ শব্দ চয়ন! নাই কোন ইলাহ; আল্লাহ ছাড়া। ইলাহ অর্থ কি? কালেমা তাইয়্যেবার অর্থ বাচ্চাদের শিখানোর জন্য সহজ করে বলা হয়েছে-আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই। এই অর্থের দিকে দৃষ্টি দিয়ে যদি আমরা আরবী বলি তবে তা হবে-লা মা’বুদা ইল্লাললাহ’। ‘মাবুদ’ হলো ইলার একটি অংশ, মাবুদ শব্দ দিয়ে ইলাহ শব্দের পূর্ণাঙ্গ অর্থ উঠে না। ইলাহ শব্দ এতই ব্যাপক যে, এক শব্দে তার পূর্ণাঙ্গ অর্থ করা সম্ভব নয়। যারা কালেমায় ‘ইলাহ’ শব্দকে ‘মাবুদ’ অর্থে গ্রহণ করেন তারা মূলত বাচ্চাদেরকে সহজভাবে শিখানোর জন্য এমনটি করেন। কিন্তু কালেমা তাইয়্যেবার পূর্ণাঙ্গ অর্থ অবশ্যই ‘আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই’ বাক্য দিয়ে হবে না। ‘ইলাহ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ মূলত আল্লাহর সকল গুণবাচক (সিফাতি) নামের সাথে সম্পর্কিত। ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’র যেখানে ‘ইলা’ শব্দ এসেছে সেখানে গুণবাচক একটি নাম বসালে যে অর্থ উঠে তা হলো কালেমার এই শব্দকেন্দ্রীক বিশেষ একটি অর্থ। যেমনÑ‘লা মা’বুদা ইল্লাললাহ, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, ‘লা খালিকা ইল্লাললাহ’ আল্লাহ ছাড়া কোন স্রষ্টা নেই, ‘লা মালিকা ইল্লাললাহ’আল্লাহ ছাড়া কোন মালিক নেই, ‘লা হাকিমা ইল্লাললাহ’Ñআল্লাহ ছাড়া কোন হুকুমদাতা নেই, ‘লা রাজ্জাকা ইল্লাললাহ’-আল্লাহ ছাড়া কোন রিজেকদাতা নেই ইত্যাদি। মোটকথা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহ’ বলার সাথে সাথে ঘোষণা হয়ে যাচ্ছে আজ থেকে মানুষ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন। সে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে দায়বদ্ধ নয়, কারো কাছে মাথানত করতে পারে না।
যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’র সঠিক অর্থ সঠিকভাবে বুঝেননা, তারাতো এই কালেমার মূল চেতনা বুঝার কথা নয়। তাদের কাছে ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’ একটি জিকির কিংবা একটি ধর্মীয় মন্ত্র ছাড়া আর কি গুরুত্ব পেতে পারে? কিন্তু যারা বুঝেছে মক্কার একেবারে এতিম এবং অসহায় ছেলে মুহাম্মদের স্বাধীনতার ঘোষণাÑ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’, তারা হয়তো গ্রহণ করেছে, নতুবা একেবারে ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা দিয়েছে ‘তাব্বাত লাকা ইয়া মুহাম্মদ’ অর্থাৎ ধ্বংস হও হে মুহাম্মদ।
অন্ধসমাজের নেতারা কোনদিন চিন্তাও করতে পারেননি, মুহাম্মদের মতো এতো অসহায়Ñগরীব এক এতিম যুবকের এই ঘোষণার সাথে সাথে যে তারা এবং তাদের পরবর্তী গোটা অন্ধসামাজ এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে। তারা ভেবেছিলো ধমক আর হুংকার দিলে মুহাম্মদ হাওয়ার মধ্যে নাই হয়ে যাবেন। তারা অনুভবও করতে পারেনি ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’Ñএই ছোট বাক্য বা কালেমার মধ্যে যে লুকিয়ে আছে কত শক্তি। এই বাক্য যে পৃথিবীর অতীত, বর্তমান এবং আগামীর সকল অণু-পরমাণুর শক্তি থেকেও বেশি শক্তিশালী, তা বুঝার জন্য যে মেধা জ্ঞানের প্রয়োজন তা সেই জাহেলদের যেমন ছিলো না, তেমনি নেই আজকের জাহেলদেরও। কোনকালেই অন্ধ ও বধির মানুষের পক্ষে এই মেধা ও জ্ঞান অর্জন সম্ভব হয় না। একথাটি যেমন প্রযোজ্য প্রথম যুগের আবুলহাবÑআবুজেহেলÑইবনে সলুলদের জন্য, তেমনি প্রযোজ্য কিয়ামত পর্যন্ত তাদের উত্তরসূরীদের জন্যও।
মক্কার অন্ধ ও বধির নেতারা প্রথম মনে করেছিলো ধমক, হুংকার কিংবা সাউন্ড গ্রেনেট জাতীয় কিছু বাজালে কালেমার বার্তাবাহক মুহাম্মদ মিলিয়ে যাবেন, কিন্তু যখন দেখলো তাদের চিন্তা চেতনার বাইরে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’র শক্তি এবং এই কালেমার প্রতি আরো কিছু মানুষ বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন, তখন তারা মুহাম্মদের শক্তিবৃদ্ধির ভয়ে আতংকিত হয়ে যায়। তারা সিদ্ধান্ত নিলো, নিজেরাতো মানবেই না অন্যকেও মানতে দেবে না। শুরু হলো নেতাদের যৌথ উদ্যোগে মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে জেল-জালুম-নির্যাতন। সাথে থাকলো বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ অপপ্রচার। তবুও যখন নেতারা হযরত মুহাম্মদ (স.) কে কালেমার দাওয়াত থেকে ফিরাতে পারছিলো না তখন তারা তাদের পার্লামেন্ট ‘দারুন নদোয়া’য় বসে হযরত মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর সাথীদেরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলো। কিন্তু তারা কেউ জানলো না কিংবা জানতেও চেষ্টা করলো না, আল্লাহ যে সর্বশ্রেষ্ট পরিকল্পক। তারা যদি সেদিন হযরত মুহাম্মদ (স.) কে হত্যার পরিকল্পনা না নিতো তবে হয়তো হযরত রাসুল (স.) মক্কায়ই থাকতেন। আর তিনি মক্কায় থাকলে মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতো না। আর তা না হলে ইসলাম মদিনায় গিয়ে নতুন শক্তি সঞ্চয় করে গোটা বিশ্বে বিস্তৃত হওয়ার পথও সুগম হতোনা। এসবই আল্লাহর পরিকল্পনা। ইসলামের ইতিহাসে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেখা যায়, কোনদিনই কোন জালেম নির্যাতন করে কালেমার দাওয়াতী কাজ বন্ধ করতে পারেনি। বরং যখনই জালেমদের জুলুম শুরু হয় তখনই ইসলামের দাওয়াতি কাজ নতুনগতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হয়। এতিম, নিস্ব মুহাম্মদের মুখে যে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিলো, তাÑকী তাঁর নিজের তৈরি কোন বাক্য ছিলো? মোটেও না। তা ছিলো স্বয়ং স্রষ্টার শিখানো কথা। তাই যারা বুঝেছে তাদেরকে আর এই কালেমার উচ্চারণ থেকে কিছুই ফিরাতে পারেনি।
হাবশি গোলাম বিলাল কিংবা খাব্বাবকে তাঁদের মালিক নির্মম নির্যাতন করে বলতে লাগলো কালেমার উচ্চারণ বন্ধ করতে। কিন্তু পেরেছিলো কী তাঁদের ‘আহাদÑআহাদ’ শব্দ উচ্চারণ বন্ধ করতে? কিংবা পরবর্তীতে কোনদিন কী কোন ঈমানদারকে কেউ মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে পেরেছে কালেমার মিশন থেকে ফিরাতে? বরং যুগে যুগে যারাই ইসলাম নামক প্রদীপকে নিভাতে চেষ্টা করেছে শেষ পর্যন্ত তারাই নিভে গেছে, ইতিহাসে তার অসংখ্য সাক্ষী আছে। মক্কার কাফেররা মনে করেছিলো সংঘবদ্ধ হয়ে রাসুল (স.) কে হত্যা করে ইসলামের জয়যাত্রা থামিয়ে দেবে। কিন্তু এর মধ্যেই যে তাদের ধ্বংসের শব্দধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছিলো তা তারা কেউ শোনতে পায়নি। আল্লাহর নির্দেশে বন্ধু আবুবকর (রা.) কে সাথে নিয়ে হযরত মুহাম্মদ (স.) একরাতে রওয়ানা দিয়ে গিয়ে উপস্থিত হলেন খেজুর গাছের নগরী মদিনায়। কী সৌভাগ্য মদিনাবাসীর! তারা হযরত রাসুল (স.) কে তাদের শহরে স্বাগত জানিয়ে তাঁর হাতে ছেড়ে দিলো পার্থিব ও পারত্রিক সকল নেতৃত্ব। মদিনায় হযরত রাসুল (স.) এর নেতৃত্বে গঠিত হলো কালেমার নীতিতে নতুন রাষ্ট্র। প্রতিষ্ঠিত হলো ইবাদত এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মসজিদ, যা মসজিদে নববী নামে আজও রয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (স.) এই মসজিদের পাশেই প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সুফ্ফা’ নামে ইসলামের প্রথম মাদরাসা অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
‘দারুস-সুফ্ফা’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দৈহিক, মানসিক, মানবিক, নৈতিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, রাষ্ট্রনীতি, পৌরনীতি, রণকৌশল, অর্থনীতি ইত্যাদি হাতে কলমে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আমরা যদি ‘দারুস সুফ্ফা’র শিক্ষার দিকে একটু দৃষ্টিপাত করি তবে দেখতে পাবো মানুষের প্রয়োজনে যা কিছু আসে তা শিখাকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হতো। তবে বাধ্যতামূলক ছিলোÑ
১) ঈমানের বিষয়াদি শিক্ষা
২) ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
৩) চরিত্র গঠন
৪) স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা
৫) নিত্য প্রয়োজনীয় হিসাব শিক্ষা
৬) জাগতিক ও পরকালিন দৈনন্দিন কাজগুলো পরিচালনার নিয়ম, নীতি, আদব, পদ্ধতি ইত্যাদি শিক্ষা।
মদিনায় মসজিদকেন্দ্রীক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথমিক শিক্ষা পর্যন্ত ছাত্রদের খরচ বহন করতো রাষ্ট্র। তারপর যাদের সামর্থ ছিলো তারা পান্ডিত্য অর্জনে এগিয়ে যেতেন। হযরত রাসুল (স.) এর সময়েই মদিনার আশ-পাশে এমন আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিলো। সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হতেন ‘দারুস-সুফ্ফা’য় ডিগ্রীপ্রাপ্তরা। অতঃপর আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বব্যাপী। আমাদেরকে ইতিহাস বলে দিচ্ছে, আজকের ইউরোপে জ্ঞানের স্পর্শ লেগেছে স্পেন হয়ে, আর স্পেনে জ্ঞানের আলো পৌঁছে আরব পন্ডিতদের মাধ্যমে। মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে আমেরিকা একেবারে একটি নাবালক রাষ্ট্র। আমি রেড-ইন্ডিয়ানদের কথা স্মরণে রেখে বলছি, বর্তমান আমেরিকানদের জনক ইউরোপ। অনেকে ইউরোপিয়ান সভ্যতার আদি বলছেন গ্রীক সভ্যতা। আমি অস্বীকার করবো না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইউরোপিয়ানরা গ্রীক জ্ঞানের সাথে পরিচিত হলো কীভাবে? আরবদের আগে গ্রীক দর্শনের অনুবাদ কী আর কেউ করেছিলো? মোটকথা হলো; মধ্যযুগের জাহেলিয়াত থেকে মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছে ইসলাম, হোক তা শিক্ষায় কিংবা সভ্যতায়।
যারা ক্ষমতালোভী, অসৎ এবং শোষক তারা কোনদিনই ইসলামকে মেনে নিতে পারেনি; হোক সে অমুসলিম কিংবা নামমাত্র মুসলমান। সুবিধাবাদী মুনাফিক মুসলমান হযরত রাসুল (স.)-এর সময়েও মদিনায় ছিলো (আব্দুল্লা বিন উবাই বিন সলুল প্রমুখরা) এবং আজও বিশ্বব্যাপী অসংখ্য আছে। ফলে দেখা যায় হযরত রাসুল (স.)Ñএর সময়ে যেমন রাষ্ট্রীয় কর্ণধার এবং সমাজপতিরা ইসলাম, মুসলমান এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতো এবং সুযোগ পেলেই আক্রমণ করতো, আজও তাদের অনুসারীরা তা করেন। যারা মুসলামান নয়, তারা যদি তা করেন তবে প্রশ্ন আসার কথা নয়, কিন্তু প্রশ্ন হলো; মুসলমান হওয়ার পরও কেউ কেউ কেন ইসলামের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি প্রধানত দু’টি কারণ খুঁজে পাই-
১) ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ‘লা ইলাহা ইল্লাললাহু’ যদি মানুষ গ্রহণ করে তবে রাজাÑপ্রজায় আর কোন ব্যবধান থাকবে না। কেউ কারো উপর প্রভুত্ব করতে পারবে না। কেউ কাউকে দমিয়ে বা থামিয়ে রাখতে পারবে না। কেউ কাউকে শোষণÑনীপিড়নÑনির্যাতন করে রক্ষা পাবে না।
২) চারিত্রিক বিষয়ের গুরুত্ব থাকায় অসৎ, লম্পট, সুদী মহাজন আর ঘুষখুররা আর সমাজের নেতৃত্ব নিতে পারবে না। নিজেকে সর্বদা একটা নিয়মÑনীতির মধ্যে রাখতে হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, ক্ষমতা ও অর্থলোভী, অসৎ এবং শোষক শ্রেণীর কোন ধর্ম থাকে না। তারা কোনদিন ধর্মকে পছন্দও করে না। মানুষ ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাকে অনুসরণ করুক, তারা তাও সহ্য করতে পারেন না। ইসলাম হলেতো আর কথাই নেই। কারণ, ইসলাম তো শুধু পরকালিন মুক্তির জন্য কোন ধর্ম নয়। ইসলাম হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। একট

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT