ধর্ম ও জীবন

 মানবজীবনে তাবলিগের গুরুত্ব

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১২-২০১৮ ইং ০১:১৮:০২ | সংবাদটি ৩০ বার পঠিত

ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘বল, ইহাই আমার পথ, আমি আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করি সজ্ঞানেÑ আমি এবং আমার অনুসারীরা’। (সূরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০৮)
উক্ত আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলিগ হচ্ছে নবী-রাসুলগণের প্রধান কাজ। তাবলিগ ব্যতিত অন্য কোনোভাবেই মানুষকে কোনটি ভালো কোনটি মন্দ তা বুঝানো সম্ভব হবে না। এ জন্য আল্লাহপাক মানুষকে ভালোমন্দ দিকগুলো বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। সেই নবী-রাসুলগণ মানুষকে মানবজীবনের সকল ভালোমন্দ দিকগুলো বুঝিয়ে দিয়েছেন তাবলিগের মাধ্যমে। তাবলিগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষকে কোনটি ভালো এবং কোনটি মন্দ তা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া। কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মানুষ যাতে এই আপত্তি করতে না পারেÑ ‘আমরা সত্য জানলাম না, তাই তোমার আদর্শ মানতে পারিনি’ সেজন্যই মহান আল্লাহপাক সকল যুগে সকল সম্প্রদায়ের সকল মানুষের নিকট নবী ও রাসুলগণকে প্রেরণ করেছেন তাবলিগের জন্য।
ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী রাসুলগণকে প্রেরণ করেছি যাতে রাসুলগণকে প্রেরণের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো আপত্তি না থাকে’। (সূরা : নিসা, আয়াত : ১৬৫)
অন্য আয়াতে ইরশাহ হচ্ছেÑ ‘আমি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপেÑ এমন কোনো সম্প্রদায় নেই, যার নিকট সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি’। (সূরা : ফাতির, আয়াত : ২৪)
হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যুগে যুগে সকল নবীই দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন। আর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর তাবলিগ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তাবলিগ যেমনি প্রাচীন তেমনি আধুনিক বা প্রতিটি যুগে যুগোপযোগী। এটা প্রাচীন। কারণ মানব সভ্যতার উন্মেষ থেকেই তথা হযরত আদম (আ.) এর সময় থেকেই তাবলিগের কাজ শুরু। যা পরবর্তীতে হযরত শীষ, নুহ, হুদ, সালেহ, ইব্রাহিম, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া, লুত, শুআইব, ইদরিস, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউনুস, ইউসুফ, দাউদ, সুলাইমান, মুসা, হারুন, ইলিয়াস, আইয়ুব, যুলকিফল, উজায়ের, আলা ইয়াসাআ, ঈসা (আ.) এমনকি সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সহ সকলেই এ মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নুহকে আর যা আমি ওহী করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলা ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে মতভেগ সৃষ্টি করো না’ (সূরা : শুরা, আয়াত : ১৩)
এই তাবলিগ সকল যুগের জন্য, সকল মানব সমাজের জন্য। তাবলিগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মৌসুম নেই যে, তখন তাবলিগের কাজ চলবে, আর অন্য সময় তাবলিগের কাজ বন্ধ থাকবে। তাবলিগের কাজ দিনরাত্র সব সময়ই করতে হবে। যেমন ইরশাদ হচ্ছেÑ (হযরত নুহ (আ.) বলেছেন) ‘হে প্রভু! আমি দিবারাত্র আমার জাতিকে দাওয়াত দিয়েছি’ (সূরা : নূহ, আয়াত : ৫)
তাবলিগের কাজ একজন মুসলমানের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। উঠাবসাÑ চলাফেরা তথা সর্বাবস্থায় ন্যায়ের কথা, ভালো ভালো কথা, সৎ কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে হবে। সৎ কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করাই তো হচ্ছে প্রকৃত তাবলিগ। যতোক্ষণ একজন মুসলমানের জীবনী শক্তি ও সামর্থ্য থাকবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত তাবলিগের এ কাজ থেকে রেহাই নেই। একজন মুসলমান তাবলিগ বা দাওয়াতী কাজ ছাড়া নিজেও তাঁর ঈমান বা বিশ্বাসের তাড়নায় স্বস্থিতে থাকতে পারে না। তাঁর তাবলিগে একদল লোক হেদায়তপ্রাপ্ত হলে আরেক দল লোককে আল্লাহর দ্বীনের দিকে ডাকার জন্য সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা ইসলামী তাবলিগের চেতনার দাবি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুবাল্লিগ হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষের হেদায়তের জন্য পেরেশান হয়ে যেতেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর মানসিক অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়াল, এভাবে তাঁর জীবনী শক্তি শেষ করে ফেলার উপক্রম হলো। তাবলিগ তথা দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে নবীজির এ অবস্থার দিকে ইশারা করে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘তারা ঈমান আনবে না বলে আপনি হয়তো মর্ম ব্যথায় আত্মঘাতী হবেন’। (সূরা : শুআ’রা, আয়াত : ৩)
তাবলিগ করতে গিয়ে তায়েফের ময়দানে নবীজি রক্তে রঞ্জিত হয়েছেন, ওহুদের যুদ্ধে নবীজির পবিত্র দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছে একমাত্র তাবলিগের জন্যই।
তাবলিগ নির্দিষ্ট কোনো দল বা জনগোষ্ঠির জন্য নয়। অর্থাৎ এশিয়ান হোক, আফ্রিকান হোক, ইউরোপিয়ান হোক সকলের জন্যই এই তাবলিগ প্রসারিত। সমগ্র মানবজাতিই এর আওতাভুক্ত। এ তাবলিগ শুধুমাত্র ছাত্র সমাজ, শ্রমিক সমাজ বা বিশেষ কোনো জাতি বা ভাষা-ভাষীর মাঝে কার্যকর নয়। যেমন বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন, যুব সংঘ বা কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের দাওয়াতী কর্মসূচিতে লক্ষণীয়। ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, শিক্ষক, কর্মকর্তা সকলেই এই তাবলিগের অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই আল্লাহপাক নবী (সা.) কে এই ঘোষণা করতে বলেছেনÑ ‘বল, হে মানবমন্ডলী! আমি তোমাদের সকলের জন্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসুল’। (সূরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৮)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘আমি তো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’ (সূরা : সাবা, আয়াত : ২৮)
অতএব তাবলিগ সকল যুগে বিশ্বের সকল মানব সমাজকে তার ক্ষেত্রভুক্ত করে। সমগ্র মানবজাতিকে প্রকৃত মুসলমান বানাবার এক মহাপরিকল্পনা হচ্ছে তাবলিগ। উল্লেখ্য যে, কেউ কেউ মনে করেন, শুধু অমুসলিমদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানানো বা তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করার নাম তাবলিগ। এরূপে মনে করাটা আল-কুরআন ও সুন্নাহের সুস্পষ্ট পরিপন্থী। তাবলিগ যেমন অমুসলিম সমাজের মধ্যে করতে হবে তেমনি মুসলিম সমাজের মধ্যেও তাবলিগ করতে হবে। তাবলিগ অমুসলিম সমাজের পাশাপাশি মুসলিম সমাজেও কার্যকর; বরং অত্যাবশ্যক।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আন’। (সূরা : নিসা, আয়াত : ১৩৬)
উক্ত আয়াতে ঈমানদারগণকে ঈমান আনতে বলা হয়েছে। এর অর্থ কী? মুমিনরা তো এমনিতেই ঈমানদার। তাদের আবার নতুন করে ঈমান আনার কী প্রয়োজন? এর অর্থ হলো ইসলাম সম্পর্কে আরো জানো এবং এই জানার মাধ্যমে ঈমানকে আরো সুদৃঢ় করা এবং আমল করা। ইসলাম সম্পর্কে অনেকে জানেন বটে; কিন্তু অনেকে অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও সঠিকভাবে ইসলামের বিধিবিধান জানেন না। ইসলামের বিধিবিধান সুস্পষ্ট ও সঠিকভাবে জানানোর জন্য মুসলিম সমাজেও তাবলিগের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে আরো ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘মুমিনদের সকলেই অভিযানে বের হওয়া ঠিক নয়। তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে সতর্ক করতে পারে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। যেন তারা সতর্ক হতে পারে’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১২২)
উক্ত আয়াতে মুসলিম সমাজে সতর্ককরণ বা ইসলাম প্রচার ও চর্চার কথা বলা হয়েছে। আর এগুলো হচ্ছে ইসলামী তাবলিগি কার্যক্রমেরই অংশ বিশেষ। অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক বন্ধু, তারা পরস্পরে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ৭১)
এসব আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে যে, তাবলিগ শুধু অমুসলিমদের মধ্যে নয়; বরং মুসলিম সমাজেও তাবলিগ করতে হবে। এছাড়া মুসলমানদের ধর্মীয় কাজে সচেতন করতে, মুসলমানদের ঐক্য-শক্তি ও সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে তাবলিগের বিকল্প নেই। তাই মুসলিম সমাজ হোক আর অমুসলিম সমাজ হোক সবাই ইসলামি তাবলিগের পরিধিভুক্ত। পুুরুষদের মধ্যে যেমন তাবলিগের কাজ করতে হবে তেমিন নারীদের মধ্যেও তাবলিগের কাজ করতে হবে। পুরুষদের মধ্যে শুধু তাবলিগের কাজ করলেই চলবে না; বরং নারী সমাজেও তাবলিগের কাজ সম্প্রসারিত করতে হবে। তাবলিগের কাজে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। এজন্য আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে তোমরা সৎ কার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎ কার্য নিষেধ কর’। (সূরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১১০)
উক্ত আয়াতে আল্লাহপাক পুরুষদেরকে যেমন তাবলিগ করার নির্দেশে দিয়েছেন তেমনি নারীদেরকেও তাবলিগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে পুরুষ-নারী উভয়কে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবস্থান করে তাবলিগ করতে হবে। নারীদেরকে অবশ্যই সর্বদা পর্দা রক্ষা করে তাবলিগ করতে হবে। নারীদের মধ্যে তাবলিগ করার জন্য আল্লাহপাক উম্মুল মুমিনিনদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেনÑ ‘আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানের কথা, যা তোমাদের গৃহে পঠিত হয়, তা তোমরা প্রচার করবে’। (সূরা : আহযাব, আয়াত : ৩৪)
এমনিভাবে শিশু কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক-মালিক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ তথা সর্বস্তরের জনতার মধ্যে তাবলিগের কাজ করতে হবে।
তাবলিগের কার্যক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক। এই তাবলিগকে শুধু মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা মোটেই সঠিক নয়। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধু মসজিদে গিয়ে সৎ কাজের আদেশ দেয়াকে তাবলিগ মনে করে থাকেন। আবার কেউ কেউ তাবলিগের জন্য ঘর-বাড়ি, সন্তান-সন্ততি ত্যাগ করে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মসজিদে মসজিদে ঘুরে বেড়ান। সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের কোনো খবর রাখেন না! তাবলিগের এরূপ নিয়ম এরা কোথায় পেল? পরিবারে সন্তান-সন্ততিরা অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত থাকবে আর পরিবারের কর্তা তাবলিগের জন্য মসজিদে মসজিদে ঘুরে বেড়াবেন এটা কেমন কথা? নিজের পরিবারে কি তাবলিগ করতে হবে না? নবী-রাসুলগণকে মূলতঃ আল্লাহপাক তাবলিগের জন্যই এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাদের পবিত্র জীবনের প্রতি যদি আমরা লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাব, তারা তাবলিগ করেছেন সেই সাথে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। সর্বকালের সকলের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর তাবলিগ আমাদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাবলিগ করেছেন, সেই সাথে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর তাবলিগ, তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা বিশ্ববাসীর জন্য মডেল হয়ে থাকবে। সেই নবীজির শিক্ষা হলোÑ তাবলিগ শুরু করতে হবে নিজের পরিবার থেকে। এরপর তাবলিগ করতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রে, দেশ হতে দেশান্তরে।
ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে নবী! আপনি আপনার নিকট আত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন’ (সূরা : শুআরা, আয়াত : ২১৪)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা’। (সূরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
তাবলিগের জন্য যে শুধু মসজিদে মসজিদে যেতে হবে তা নয়; বরং পরস্পর সাক্ষাতে পরস্পর কথোপকথনে, বৈঠক, ভ্রমণ করতে গিয়ে, আলোচনার মাধ্যমে ওয়াজ নসিহত, বক্তৃতা, লেখালেখি, রেডিও, টিভি ইত্যাদির মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে তাবলিগ করতে হবে। ইসলামের দাওয়াত সর্বত্রই ছড়িয়ে দিতে হবে। যে কোনো অবস্থাতেই সুবিধা অনুসারে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির নিকট সত্য দ্বীনের দাওয়াত পেশ করতে হবে। এজন্য দেখা যায়, হযরত ইউসুফ (আ.) জেলখানাতে থেকেও তাবলিগের কথা ভুলে যাননি; বরং সেখানেও তিনি আল্লাহর দ্বীনের তাবলিগ করেছেন। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার বিভিন্ন মেলায় তা উদযাপনের সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মানুষের সামনে ইসলামের তাবলিগ পেশ করতে মোটেই কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তাবলিগ সাময়িক কোনো আবেগ ও উচ্ছাসের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি একটি পরিকল্পিত প্রজ্ঞাময় কার্যক্রমের নাম। মানুষের বিভিন্ন ভাব, ভাষা, বক্তব্য প্রকাশ ও প্রচারের জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন কৌশল উদ্ভাবন করা হচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে সামনের দিকে এগুচ্ছে। মানুষকে আল্লাহর দ্বীন মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করতে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সকল স্তরে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে যে কোনো মাধ্যম, পদ্ধতি ও কৌশলের ব্যবহার ইসলামি তাবলিগের পরিধিভুক্ত। যদি তা ইসলামি মূলনীতি বা মূল্যবোধের পরিপন্থী না হয়। সুতরাং তাবলিগ ওয়াজ-নসিহত, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, লেখালেখি, সমাজ কর্মসহ সকল বৈজ্ঞানিক প্রচার মাধ্যম পদ্ধতি ও পক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ সকল প্রকার পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করেই দ্বীনের তাবলিগ করতে হবে। কোনোক্রমেই দ্বীনের তাবলিগ থেকে বিরত থাকা যাবে না। মানবজীবনে ইসলামের প্রয়োজনীয়তা যদি থেকে থাকে তবে তার তাবলিগের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। আর মানব জীবনের সকল সমস্যার সার্থক সমাধান যদি ইসলামে থেকে থাকে তবে সে ইসলামের তাবলিগ পেশ করার মাধ্যমেই মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তাই তাবলিগের গুরুত্ব অপরিসীম।
মানবজীবনে তাবলিগের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবজীবনে সত্য-অসত্য, ভালো-মন্দ, বুঝা-বুঝানোর সর্বোত্তম হাতিয়ার হচ্ছে তাবলিগ। এজন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বারবার মানবজাতির মধ্যে তাবলিগ করার তাগিদ দিয়েছেন।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং উহাদের সাথে আলোচনা কর সদ্ভাবে।’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)
‘সে (নুহ) বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমাতে কোনো ভ্রান্তি নেই, আমি তো জগৎ সমূহের প্রতিপালকের রাসুল, আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের কাছে প্রচার করছি ও তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিতেছি এবং তোমরা যা জান না আমি তা আল্লাহর নিকট হতে জানি’। (সূরা : আরাফ, আয়াত : ৬১-৬২)
‘তারা আল্লাহর বাণী প্রচার করত এবং তাঁকে ভয় করত, আর আল্লাহকে ব্যতিত অন্য কাউকে ভয় করত না হিসাব গ্রহণে আল্লাহই যথেষ্ট’। (সূরা : আহযাব, আয়াত : ৩৯)
‘হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী রূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারী রূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে’ (সূরা : আহযাব, আয়াত ৪৫-৪৬)
‘হে রাসুল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা নাজিল হয়েছে তা প্রচার কর; যদি প্রচার না কর তবে তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না। (কারো নিকট অপ্রীতিকর হলেও উহা প্রচারে তিনি আদিষ্ট হয়েছেন) আল্লাহ তোমাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সৎ পথে পরিচালিত করেন না’ (সূরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)
‘প্রচার করাই রাসুলের দায়িত্ব। তোমরা যা প্রকাশ কর ও গোপন রাখ আল্লাহ তা জানেন’ (সূরা : মায়িদা, আয়াত : ৯৯)
‘আমি তাদেরকে পৃথিবীকে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎ কার্যে নিষেধ করবে; সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে’। (সূরা : হজ্ব, আয়াত : ৪১)
‘তুমি তাদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান কর, তুমি তো সরল পথেই প্রতিষ্ঠিত’ (সূরা : হজ্ব, আয়াত : ৬৭)
‘তুমি তো তাদেরকে সরল পথে আহ্বান করতেছ’ (সূরা : মুমিনুল, আয়াত : ৭৩)
‘হে আমার সম্প্রদায়! কী আশ্চর্য। আমি তোমাদেরকে আহ্বান করতেছি মুক্তির দিকে, আর তোমরা আমাকে ডাকতেছ জাহান্নামের দিকে’ (সূরা : মুমিন, আয়াত : ৪১)
‘সুতরাং তুমি এর প্রতিই আহ্বান কর এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাক (সূরা শুরা : আয়াত-১৫)
‘অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছে তা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদেরকে উপেক্ষা কর’ (সূরা : হিজর, আয়াত : ৯৩)
‘কেবল আল্লাহর পক্ষ হতে পৌঁছান এবং তাঁর বাণী প্রচারই আমাকে রক্ষা করবে’ (সূরা : জিন্ন, আয়াত : ২৩)
‘আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তার রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে লও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্টভাবে প্রচার করা’ (সূরা : তাগাবুন, আয়াত : ১২)
‘স্পষ্টভাবে প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব’ (সূরা : ইয়াসিন, আয়াত : ১৭)
‘হে আমাদের সম্প্রদায় আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন’ (সূরা : আহকাফ, আয়াত : ৩১)
‘আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং য

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT