ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রাচীন গড় কিভাবে গৌড় হল

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১২-২০১৮ ইং ০০:৫৭:৪৬ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

সিলেট একটি প্রাচীন ভূখন্ড যা দু দ্বীপখন্ডে অতীতের বরবক্র ও বর্তমান বরাক নদের উভয় তীরে শ্রীহট্ট রাজ্য নামে পরিচিত ছিল। এটি দক্ষিণ দিক তথা বর্তমান রাজনগর-ভাটেরা এলাকা থেকে উত্তরে বর্তমান সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত। সনাতন ধর্মের ‘নাথ’ পূজারি শাসকগণ এলাকার রাজধানীতে তাদের আরাধ্য দেবতা হট্টনাথের বিগ্রহ স্থাপন করে দেবতার নামের প্রথমাংশে হট্ট এর সাথে সংস্কৃত ভাষায় সঙ্গায়িত পবিত্র শব্দ শ্রী যোগ করে নতুন এ রাজ্যের নামকরণ করেন শ্রীহট্ট।
দেবতা হট্টনাথের বিগ্রহই পরে দক্ষিণ শ্রীহট্ট থেকে বর্তমান উত্তর শ্রীহট্ট স্থানান্তরিত করা হয়। পরবর্তিতে শ্রীহট্ট রাজ্য মুসলমান শাসকগণ কর্তৃক বিজিত হলে মুসলিম শাসকদের ভাষা ফার্সি ও ধর্মীয় ভাষা আরবির প্রভাবে শ্রীহট্ট নাম ছিলাহেত বা সংক্ষেপে সিলেট হয়ে যায়, যা ইংরেজদের শাসনামলসহ অদ্যাবদি ইংরেজিতে- সিলহেট নামে চালু আছে।
বর্ণিত বরাক নদী শ্রীহট্টাঞ্চলে এসে মধ্যখানে পলিমাটি দ্বারা ভরাট হয়ে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে পূর্ব দিকের নাম হয় কুশিয়ারা এবং পশ্চিমাংশের নাম হয় সুরমা নদী। যা পরবর্তিতে ভৈরব বাজারের কাছে আবার একীভূত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করে এবং চাঁদপুরের কাছে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়ে অবশেষে বঙ্গপোসাগরে পতিত হয়।
বর্তমান শ্রীহট্টাংশকে অতীতে উত্তর শ্রীহট্ট বলা হত যা সুরমা নদীর উত্তর তীর বরাবর পূর্ব দিকের বর্তমান হরিপুর থেকে পশ্চিম দিকে টিলাটুলি হয়ে বর্তমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর চারপাশেই অথই জলরাশিসহ উত্তর ও পূর্বদিকে সুপ্রাচীন ও পাহাড়িয়া ত্রিপুরা, কাছাড় ও জৈন্তা রাজ্য, খাসিয়া, জৈন্তা ও লাউড়ের পাহাড়িয়া অঞ্চল এবং প্রাচীন কামরূপ ও লাউড় রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত মহাভারতে বর্ণিত প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য ছিল। দক্ষিণাংশ- বর্তমান বরমচাল বা ব্রহ্মচাল, ভাটেরা বা ভট্টরায়, কুলাউড়া ও রাজনগর নিয়ে গঠিত ছিল যা প্রাক্তণ বরচক্র বা বরাক এবং মনু নদীর মধ্যবর্তি মনুকূল এলাকা নামক পবিত্র স্থান নামে পরিচিত ছিল। একইভাবে মহাভারতের বর্ণনানুযায়ি দেবী সীতার খন্ডিত দেহের পৃষ্ঠাংশের তথা গ্রীবাপীঠের নমুনানুযায়ি শ্রীহট্ট শহরের নিকটবর্তি পূর্বদিকে কালাগুল এলাকা এবং দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ীতে অবস্থিত প্রাচীন পাথর খন্ডদ্বয়ের সন্ধান পাওয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ এই স্থানদুটিকে পবিত্রস্থান হিসেবে গণ্য করায় সেখানে মনুষ্য-বসতি স্থাপনে সহায়ক হলেও আদিতে মঙ্গোলিয়ান খাসিয়া গোত্রিয় লোকজনই তখনকার সময়ে খাদ্য আহরনের সন্ধানে বন্য প্রাণী শিকার ও বন্য ফল আহরনের উদ্দেশ্যে এসে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।
সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব পাওয়া যায় প্রাচীন উত্তর শ্রীহট্ট দ্বিপাখন্ডের পূর্বদিকের সুপ্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অংশ বর্তমান বিয়ানিবাজারের পঞ্চখন্ড এলাকার নিদনপুরে। এখানে প্রাপ্ত সপ্তম দশকের তাম্রলিপি যার দ্বারা কামরূপ রাজা ভাস্কর ভর্মা তারই প্রপিতামহ ভূতি ভর্মার দানকৃত ভূমি পুনঃদান করেন। ভূতি ভর্মার কাল ছিল খৃষ্টিয় ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু হওয়া ভারতিয় গুপ্ত যুগের অন্তিকাল পর্যন্ত। ইতিপূর্বে খৃষ্টিয় সন প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে মহাভারতিয় যুগে কামরূপ, লাউড়, আসাম, কাছাড় ইত্যাদি এলাকা প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যেরই অংশ ছিল। উল্লেখ্য ঐ প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যের রাজা ভগদত্ত মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুর্যধনের পক্ষ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। লাউড় পাহাড়ে রাজা ভগদত্তের বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ আজো বিদ্যমান। পরবর্তিতে প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য লাউড়, কামরূপসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত হলে লাউড় রাজ্য সমুদ্র থেকে গড়ে উঠা নিম্নের সমতলাংশ বর্তমান সুনামগঞ্জের তাহিরপুর-জগন্নাথপুরসহ হবিগঞ্জের সমতলাংশ বানিয়াচঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। উল্লেখ্য, তিব্বতি ভাষায়/ খাসি ভাষায় বনিয়া অর্থ গড়ে উঠা এবং চুং অর্থ সমুদ্র অর্থাৎ সমুদ্র থেকে গড়ে উঠা। যেভাবে তিব্বতি ভাষা বঞ্জজ অর্থ জলাশয় থেকে বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি। খাসিয়াদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তাহিরপুরের সীমান্তবর্তি হলহলিয়াতে লাউড় রাজা বিজয় সিংহ কর্তৃক নির্মিত লাউড়ের গড় যার পূর্বে তৎপিতা রাজা জগন্নাথ নারায়ণ সিংহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমতল লাউড় রাজ্যের রাজধানি জগন্নাথপুর ও তদস্থ রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ এবং তার ভাই রাজা গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ যিনি মোগল সম্রাট আকবরের আমলে মোসলমান হয়ে হবিব খাঁন নামধারণ করেন এবং তাঁরই নির্মিত রাজধানি বানিয়াচুঙ্গ ও তদস্ত নির্মিত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজো বিদ্যমান।
আঠারো শতকে সিলেটের প্রখ্যাত সংস্কৃত কবি গনেশ রাম শিরোমনি কর্তৃক সংস্কৃত ভাষায় রচিত হট্টনাথের পাঁচালি নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে জানা যায়। প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের রাজা কামসিন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর রানী উর্মিলাদেবী প্রাগজ্যোতিষ রাজা কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে নিকটবর্তি জৈন্তা এলাকায় এসে এক নারী রাজ্য স্থাপন করেন। পরবর্তিতে তিব্বতের হাটক নগরির যুবরাজ কৃষক ভারতের এ অঞ্চলে বেড়াতে এসে বর্ণিত রানী রাজ্যের রাজকন্যা উর্ব্বরাকে বিবাহ করেন।
তাঁদেরই তৃতীয় অধঃস্তন পুরুষ গোড়কের নামানুসারে প্রাচীন শ্রীহট্ট রাজ্যের নাম গৌড়, লড়কের নামানুসারে পশ্চিমের এলাকা নিয়ে গঠিত রাজ্যের নাম হয় লাউড় এবং তৃতীয় ছেলে জয়ন্তুকের নামানুসারে জৈন্তা রাজ্যের নাম হয় জৈন্তা এবং মেয়ে শিলার নামানুসারে গোড়রাজ্যের কেন্দ্রে যে হাট স্থাপন করা হয় তার নাম হয় শিলাহট বা সিলেট। অন্য মেয়ে চট্টলার নামানুসারে সমতট রাজ্যের রাজধানী শহরের নাম হয় চট্টলা বা চট্টগ্রাম। তবে তা কবির কল্পনাপ্রসূত ও জনশ্রুতি বলে মনে হয় কারণ বর্ণিত ঘটনার অনেক পূর্বেই মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে প্রাণজ্যোতিষ রাজা ভগদত্ত দূর্যোধনের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে নিহত হলে প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্ণিতদেরই অধঃস্থন পুরুষ নবর্গিবান দেবনাথ হয়ে সর্বশেষ রাজা গোবিন্দ কেশব দেবনাথ তাঁর আরাধ্য দেবতা হট্টনাথের বিগ্রহ সাক্ষলিত মন্দিরকে কেন্দ্র করে উত্তর শ্রীহট্ট দ্বীপাংশে নিজ রাজ্য গড়ে তোলেন এবং দক্ষিণের দ্বীপাংশে দক্ষিণ শ্রীহট্ট রাজ্য বহাল থাকে। পরবর্তিতে অর্থাৎ দশম শতাব্দিতে তিব্বতের রাজপুত কৃষকের ন্যায় আরকান রাজ্যের বিশাল নগরির রাজা শ্রীচন্দ্র ও তথা থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রথমে সমতটের বিক্রমপুরকে এবং পরবর্তিতে দক্ষিণ শ্রীহট্টের রাজনগরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ শ্রীহট্ট রাজ্য গড়ে তোলেন। বিয়ানীবাজারের বর্ণিত নিদনপুরে প্রাপ্ত প্রাচীন তাম্রলিপি অনুযায়ি প্রাক্তন কামরূপ রাজ্য বর্তমান সিলেটের সীমান্তবর্তি বিয়ানীবাজার, কোম্পানিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ইত্যাদি এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল যা পরবর্তিতে মোগলামলে সিলেটের অন্তর্ভুক্ত হয়। সুদূর অতীতে জনসংখ্যার অপ্রতুলতার কারণে খৃষ্টিয় ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত উত্তর শ্রীহট্টের মূল দ্বীপখন্ড গভীর জঙ্গলাবৃত জন-মানব শূন্য বন্য পশু-পাখি ও ফলমূলে পরিপূর্ণ ছিল। পরবর্তিতে খাদ্যের জন্যে প্রয়োজনীয় শিকারের উদ্দেশ্যে তিব্বত থেকে মঙ্গোলিয়ান খাসি, ত্রিপুরিসহ বিভিন্ন উপজাতি অধ্যুষিত হয়।
বিখ্যাত চীনা পন্ডিত ও পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬২৯-৬৪৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের পূর্বাঞ্চল সফর করেন। তখন ভারতে বর্ণবৈষম্যহীন মানবতাবাদি বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারসহ স্বর্ণযুগ ছিল। হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় যে, তিনি কনোজাধিপতি প্রখ্যাত বৌদ্ধ নৃপতি শিলাদিত্যের ধর্মিয় উৎসবে যোগ দিয়ে কামরূপাধিপতি ভাস্কর ভর্মা কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে কামরূপ রাজ্যেও আসেন। তিনি সমতট তথা চট্টগ্রাম থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে সাগর পার্শ্বে পাহাড়-উপত্যকা পার হয়ে শিলাচটল অতিক্রম করে কামরূপ যান। এ শিলাচটলকে কেউ কেউ ভুলক্রমে সিলেট বলেছেন। অথচ তখন ক্ষুদ্র দ্বীপখন্ড উত্তর সিলেটাংশে গভীর জলবেষ্টিত ও জঙ্গলাকীর্ন জন-মানবশুন্য একটি ক্ষুদ্র এলাকা ছিল। কিন্তু শিলচর ছিল কাছাড় ও ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যবর্তি এলাকা যার নামের শেষ বর্ণ-র-কে চীনা ভাষায় -ল- উচ্চারিত হওয়ায় চীনা হিউয়েন সাঙ শিলচরকে হয়ত শিলিচটল বলেছেন এবং শিলিচটলের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ যেখানে ক্ষুদ্র উত্তর সিলেট দ্বীপাংশ ছিল তাকে কালিদা সাগর বলে উল্লেখ করেছেন। তখনো হয়ত বিরাট বরাক বা বরবক্র নদ-বাহিত পলিমাটির দ্বারা নিম্নাঞ্চল ভাগ না হয়ে তা বিরাট জলাশয়সহ সমুদ্রের ন্যায় তবে বঙ্গোপসাগরের অংশ হিসাবেই দেখাচ্ছিল। বিরাট বরাক নদের উভয় তীরে প্রাচীন সিলেট দ্বীপের উত্তর-দক্ষিণ উভয়াংশকে সমুদ্রে গভীর জঙ্গলাকীর্ন ভাসমান ঝাপসা দ্বীপের ন্যায় দেখাচ্ছিল। প্রমাণস্বরূপ মূল শ্রীহট্টের উভয়াংশের ন্যায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর মধ্যবর্তি অঞ্চলে কোন প্রাচীন নিদর্শন নাই বললেই চলে। তদুপরি অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে বৃটিশ ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানির সিলেটস্থ দ্বিতীয় রাজস্ব সংগ্রাহক বা কালেকটর জন উইলিছ কর্তৃক সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরে উইলিছ/ সুরমা ডাইক/ বাঁধ নির্মাণের পূর্বে বর্ষাকালে বর্ষণের পানি জমার কারণে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী একাকার হয়ে সমুদ্রের ন্যায় পরিণত হয়ে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরেরই অংশ হয়ে যেত।
দক্ষিণ শ্রীহট্টের শ্রীমঙ্গলের কালাপুর গ্রামে প্রাপ্ত সপ্তম শতাব্দির প্রাচীন তাম্রলিপি থেকে জানা যায় এলাকার তদানিন্তন শাসক মরগুনা দক্ষিণ শ্রীট্টাংশ তথা বর্তমান মৌলভিবাজারে বসবাসের জন্য আনিত বিহারের মৈথিলি আর্য্য ব্রাহ্মণদেরকে বেশ কতেক ভূমি দান করে এলাকার খাদ্য উৎপাদনে উন্নত কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন করেন। এ দানপত্রের তাম্রলিপি তদানিন্তন সমতল ত্রিপুরা বর্তমান কুমিল্লায় প্রাপ্ত সামন্ত নৃপতি ও প্রখ্যাত নাথ সাধক লোকনাথের দানের অনুরূপ। উল্লেখ্য, লোকনাথ ও মরুগুনাথ উভয়ই ত্রিপুরার প্রাচীন নাথ বংশিয় শাসক রাজা শ্রী নাথেরই বংশধর। ত্রিপুরায় আগত বৌদ্ধগণ কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে ত্রিপুরার হিন্দু নাথ বংশিয় রাজাগণই তাঁদের আরাধ্য দেবতা হট্টনাথের বিগ্রহ স্থাপনসহ প্রাচীন দক্ষিণ শ্রীহট্ট দ্বীপাংশ বর্তমান মৌলভীবাজারের ভাটেরা রাজনগর ইত্যাদি এলাকায়ই সর্বপ্রথম শ্রীহট্ট নামিয় রাজ্য স্থাপন করেন যা প্রখ্যাত পন্ডিত ঐতিহাসিক ও গবেষক সৈয়দ মর্তুজা আলীও সমর্থন করেন। তখনো বর্তমান বা উত্তর শ্রীহট্টাংশ জন-মানবহীন জঙ্গলাকীর্ন দ্বীপখন্ড ছিল বলে জানা যায়। বর্ণিত কালাপুর গ্রামে প্রাপ্ত অষ্টম শতকের তা¤্র-পত্র থেকে আরো জানা যায় যে তখন বর্ণিত দক্ষিণ শ্রীহট্টাঞ্চল বাংলার বিক্রমপুরের বৌদ্ধ চন্দ্রবংশিয় রাজাদের অধীনে ঐ রাজ্যেরই একটি অংশ বা মন্ডলে পরিনত হয়। চন্দ্র বংশিয় রাজাগণ আরকান রাজ্যের বিশাল নগর কেন্দ্রিক রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে ৭৮৮ সনে সমতট রাজ্যেরই অংশ বিক্রমপুরে রাজধানী স্থাপন করে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। এসময়েই পশ্চিমভাগ তাম্রলিপি ফরমানে শ্রীহট্ট মন্ডল অর্থাৎ দক্ষিণ শ্রীহট্ট তথা বরাক নদের দক্ষিণে উর্ভর ভূমি খন্ডে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে উন্নত কৃষি কার্যের জন্য বর্ণিত মিথিলা থেকে ছয় হাজার আর্য্য ব্রাহ্মণ এনে তাদেরকে ভূমি দান করা হয়।
পরবর্তিকালে বাংলার প্রখ্যাত পাল রাজা মহিপাল কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে দশম শতাব্দিতে বর্ণিত চন্দ্রবংশিয় রাজা শ্রীচন্দ্র শ্রীহট্টের দক্ষিণাংশে পবিত্র মনু ও বরবক্র নদীর মধ্যখানে শ্রীহট্ট মন্ডলেই ইতিহাসের প্রথম স্বাধীন শ্রীহট্ট রাজ্য স্থাপন করেন এবং পরবর্তিতে উত্তরাংশ বা বর্তমান শ্রীহট্ট অংশ হয়েই কামরুপ রাজ্যে অভিযান করে এ অংশকেও যুক্ত করেন। তখন থেকেই শ্রীহট্ট দ্বীপরাজ্যের উভয়খন্ড উত্তর ও দক্ষিণাংশ একিভূত করে বর্তমান রাজনগরে রাজার নামানুসারে চন্দ্রপুরী নামে রাজধানি স্থাপিত হয়। যার প্রমান রাজনগরে প্রাপ্ত দশম শতকের তাম্রলিপি যা ঢাকা যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। রাজা শ্রীচন্দ্র নিজ নামানুসারে স্থাপিত রাজধানি চন্দ্রপুরি এলাকাকে একটি বিষয় বা বর্তমান জেলার মর্যাদা দিয়ে তথায় তক্ষশিলা, নালন্দা বা মহাস্থানগড়ের ন্যায় একটি উচ্চ-শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র বা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং তদোদ্দেশ্যে যথেষ্ট ভূমিও দান করেছিলেন। এ বংশেরই রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের শাসনামল ১০২০-১০৪৫ ইং সন পর্যন্ত তা বহাল থাকলেও পরবর্তিতে তা ম্রিয়মান হয়ে যায়।
দক্ষিণ শ্রীহট্টের চন্দ্র বংশিয় রাজাদের আটটি মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে যা আসামের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আর এল কে বরুয়া বাহাদুরের লিখিত অর্লি হিস্ট্রি অব কামরূপ, বাবু কমলাকান্ত গুপ্তের-কপারপ্লে¬ট অব সিলেটসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে। পরবর্তিতে ত্রিপুরার সুযোগ্য মহারাজা সুধর্মখা বা ধর্মবির ১১৯৪ সনে চন্দ্রপুরি রাজ্য দখল করে তা পবিত্র মনুকূল প্রদেশ নামকরণ করে ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে সংযুক্ত করেন এবং এতদ্দোশ্যে ধর্মিয় যজ্ঞের জন্য উত্তর ভারতের কাশ্মিরের ইটো নামক স্থান থেকে আনিত আর্য্য ব্রাহ্মণ নিধিপতি শর্মাকে বর্নিত যজ্ঞ পরিচালনার দায়িত্ব দেন। পরবর্তিতে ধর্ম গুরু নিধিপতি শর্ম্মাকে স্থায়ি বসবাসের জন্য আশ্রিত রাজার মর্যাদা দিয়ে বর্ণিত চন্দ্রপুরি/ মেনুকূল এলাকা দান করলে নিধিপতি শর্মা কাশ্মিরে নিজ এলাকার নামানুসারে এলাকার নতুন নামকরণ করেন ইটা যার রাজধানি হয় বর্ণিত রাজনগরেই যা এলাকার পশ্চিম ভাগে প্রাপ্ত তাম্রলিপিতে উল্লেখ আছে।
পরবর্তিতে ত্রিপুরার মহারাজা নিধিপতির অধঃস্থন পুরুষ ভানু নারায়ন কর্তৃক বিদ্রোহী দমনসহ তাঁর বিভিন্ন কার্য্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ইটার নিকটবর্তি আরেকটি রাজ্যও দান করেন যার নামকরণ হয় ভানুগাছ এবং ইটা ও ভানুগাছ উভয় রাজ্যেরই রাজধানি রাজনগরে স্থাপিত হয়। এরপর রাজা সুবোদ নারায়ণের পুত্রদের একজন সূর্য্য নারায়ণ নিজেদের রাজ্যস্থ বর্তমান কমলগঞ্জে একটি গড়/ সেনানিবাস স্থাপন করে নামকরণ করেন সূর্য্যগড় যা পরে মোগলদের তাড়া খেয়ে বোকাইনগর বা একলেমিয়া মোয়াজ্জেমাবাদ থেকে আসা পাঠান শাসক খাজা উছমানের সাথে যুদ্ধে রাজা সুবোদ নারায়ণ নিহত হলে সূর্য্যগড় খাজা উছমান কর্তৃক দখল ও পুনঃনামকরণ হয় উছমান গড় এবং ছেলে সূর্য্য নারায়ণসহ রাজপুত্রগণ ও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে খাজা উছমানের আশ্রয়ে পাশের ইটা রাজ্য পরিচালনার সুযোগ পান। পরবর্তিতে দক্ষিণ শ্রীহট্টের তথা বর্তমান মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এলাকার ভাটেরার হোমের টিলায় প্রাপ্ত ১০৪৯ সনের তাম্রলিপি অনুসারে বর্ণিত বৌদ্ধ চন্দ্র-বংশিয় রাজবংশ থেকে তথা ত্রিপুরার নাথ বংশিয় রাজবংশ হয়ে ভাটেরা কেন্দ্রিক দেব বংশিয় রাজাদের কাছে দক্ষিণ শ্রীহট্টের রাজ্যভার চলে আসে। এ বংশেরই প্রতিষ্ঠাতা নবর্গিবান দেব এবং তৎপরবর্তি গোকল দেব, নারায়ণ দেব, কেশব দেব, ঈশান দেব। শ্রীহট্টের আদি স্থানিয় ভাষা নাগরি ভাষায় প্রাপ্ত তাম্রলিপি থেকে জানা যায় তারা পর পর রাজত্ব করেন এবং হট্টনাথ যাকে মধুকৈটভরীও বলা হয় ইত্যাদি মন্দিরের জন্য বর্ণিত রাজাগণ ভূমিদান করেন। ভাটেরার হোমের টিলায় প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ তারই প্রমাণ। এ সময়েই সুরমা ও কুশিয়ারা নদী মিলিত ভাবে বরবক্র নদী নামে বঙ্গোপসাগরের অংশ ছিল এবং বর্তমান ইন্দেশ্বরের কাছে সমুদ্র বন্দরও ছিল। এ দেব বংশেরই শেষ রাজা ছিলেন রাজা গোবিন্দ কেশব দেব সংক্ষেপে রাজা গোবিন্দ। বিভিন্ন বিছিন্ন তত্ত্ব থেকে জানা যায় পনেরশত শতাব্দির শেষের দিকে পাহাড়ি/ ত্রিপুরা রাজার আক্রমণ থেকে সদল

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অতীত ও বর্তমান
  • নাটোরের জমিদার রানী ভবানী
  • ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সাহিত্য সাময়িকী নিশানা
  • জলসার একাল-সেকাল
  • স্তম্ভবিহীন মসজিদ
  • বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা
  • হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ
  • গ্রামের কথা
  • প্রাচীন গড় কিভাবে গৌড় হল
  • চায়ের দেশ পর্যটকদের ডাকে
  • মুক্তিযুদ্ধকালীন সিলেট অঞ্চলের পত্রপত্রিকা
  • স্মৃতি ও চেতনায় বঙ্গবন্ধু
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • Developed by: Sparkle IT