ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ

খালিদ ফেরদৌস প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০১-২০১৯ ইং ০১:১১:০৭ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

গ্রামে দারুণভাবে ঢুকেছে শীত। প্রায়ই কুয়াশার চাদর মুড়ি দিচ্ছে গ্রাম্য জনপদ। শহরে কড়া নাড়ছে শীতের আগমনী বার্তা। শীতকাল আসলেই খেজুরের রস-গুড়, পিঠা-পায়েশে মনে পড়ে যায় পল্লী মায়ের কোল। পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাময়িকী, টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে শোভা পায় গাছির (খেজুরের রস উৎপাদনকর্মী) খেজুর গাছ তোলা বা কাটার চিরায়ত ছবি। ফুলেল সরিষা ক্ষেত, শাক-সবজি ক্ষেতের মাঝে, মেঠোপথের ধারে, সারি সারি রসের পাত্রসহ খেজুর গাছের ছবি, গাছির বাকে (বাঁশের তৈরি রস বহনের মাধ্যম) করে রস বয়ে নিয়ে যাবার ছবি তুলতে সবাই ক্ষণিকের জন্য ফটোগ্রাফার হয়ে যায়।
রূপসী বাংলার এই ক্যানভাস দেখলে আপাদমস্তক নগর জীবনের বাসিন্দারও মনটা জুড়িয়ে যায়। শৈশব যাদের গ্রামে কেটেছে তাদের মধ্যে খুব কমই আছে যারা অন্যের খেজুর গাছ থেকে রাতে বন্ধুরা মিলে রস চুরি করে পান করেনি। রস চুরি করাকে কেন্দ্র করে খেজুর গাছের মালিকরাও তেমন আপত্তি তুলত না। এটাই ছিল বাঙালির হাজার বছরের পুরাতন গ্রামীণ সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম উদাহরণ। এখন জনপদের এই সব দারুণ দারুণ ব্যাপার হারিয়ে যেতে বসেছে। এই সমস্ত কর্মকা-ের জায়গায় গ্রাম-শহরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদক হানা দিয়েছে। যা শেষ করে দিচ্ছে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণদেরকে। জাতীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সার্বিক উন্নয়ন। এত কিছুর পরও ভোজনবিলাসীদের কাছে অতি প্রিয় খেজুরের রস ও গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েশ।
এক সময় গ্রাম-গঞ্জে জামাই, আত্মীয়-স্বজন আপ্যায়নের প্রধান অনুসঙ্গ ছিল খেজুর গুড়ের তৈরি বাহারি সব খাবার-দাবার। ডাক্তারি ভাষ্য মতে, খেজুরের রস পেটের পরজীবী ধ্বংস করে এবং বিভিন্ন রোগের এন্টি-বায়োটিক হিসেবে কাজ করে। নগরের বার্গার-স্যান্ডউইচসহ ফাস্টফুডের সংস্কৃতিতেও শীতকাল জুড়ে শহরের পথে-ঘাটে খেজুর গুড়ের ভাঁপা পিঠা-পুলিসহ নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। তবে পরিতাপের বিষয়, শীতকাল ব্যতিরেকে নবান্নসহ কিছু ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও মেলায় খেজুর গুড়ের পিঠা-পায়েশের দেখা মেলে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে পিঠা-পায়েশ তৈরিতে খেজুরের গুড়ের স্থানে চিনির ব্যবহার করা হয়। যা স্বাদে-গন্ধে খেজুরের গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েশের মতো সুস্বাদু নয়।
সারাদেশে খেজুর গাছ উজাড় করে চাষের জমি বের করে অন্য লাভজনক ফসল চাষাবাদ করা হচ্ছে। এমন কী ক্ষতিকর তামাক চাষও করা হচ্ছে বেশি লাভের আশায়। বেআইনিভাবে অনেক ইটভাটার মালিক প্রাকৃতিক কয়লা ব্যবহার না করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে খেজুর গাছ। বর্তমান কৃষি অর্থনীতি বিবেচনায় নিলে এটা হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছে অনেকে। অপরদিকে একটি অসাধুচক্র আখের চিনির সঙ্গে বিভিন্ন কেমিক্যালের মিশ্রণ দিয়ে হুবহু খেজুরের গুড় তৈরি করছে। যা মানব শরীরের জন্য খুব ক্ষতিকর। নীতি বিবর্জিত মানুষের এহেন অপরিণামদর্শী কর্মকা-ের কারণে খেজুর গাছের ঐতিহ্য ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছে।
তাই গ্রামীণ ঐতিহ্য বাঁচাতে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রোধ করতে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছগুলোকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম সরকার ও কৃষিবিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।
খেজুর গাছ রক্ষায় পরিবেশবাদী, কৃষিবিদসহ সচেতন মহলকে সোচ্চার হতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষক ও জনগণকে হতে হবে দায়িত্বশীল। কারণ একজন কৃষক ইচ্ছা করলেই ফসলের কোনো ক্ষতি না করে খুব সহজে জমির আইল বা সীমানায় খেজুর গাছ রাখতে পারে। বলা প্রয়োজন, দেশি খেজুর বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে জাত উন্নয়ন সম্ভব হলে মানুষ খেজুর গাছ রক্ষা ও নতুন করে চারা রোপণ করে ব্যবসায়িকভাবে চাষে আগ্রহী হবে। তাতে করে কৃষিখাতে খেজুর বিপ্লবসহ দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে এবং বাঙালির হাজার বছরের খেজুরের রস-গুড়, পিঠা-পুলি, পায়েশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ফিরে পাবে হারানো মহিমা। জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজার খেজুর বাগান দেখে মনটা ভরে যায়। তেমনই দেশি খেজুরের জাত উন্নয়নের পর দুবাই, সৌদি, কুয়েতের রাস্তাঘাটের মতো এদেশের প্রতিটি মহাসড়ক ও রাস্তায় খেজুর গাছ মাথা তুলে দাঁড়াক, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। আশা করি, বর্তমানে যে সরকার আছে এবং আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা কৃষিবান্ধব মানসিকতার পরিচয় দিয়ে খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও জাত উন্নয়নে উচ্চতর গবেষণায় সুদৃষ্টি দিবেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • Developed by: Sparkle IT