ধর্ম ও জীবন

মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন জ্ঞানী সম্প্রদায়

মাওলানা মুহিব্বুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০১-২০১৯ ইং ০১:০৪:২৪ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

আল্লাহ পাকের তামাম সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো মানুষ। মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন আলেম বা জ্ঞানী সম্প্রদায়। পবিত্র কোরআনে খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলেম বা জ্ঞানীদের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। আলেমদের মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বেশ কয়েকবার প্রশংসিত বাক্য বলেছেন। আল্লাহ পাক নিজে আলেমের মর্যাদা উচ্চতর করেছেন। তাদের বানিয়েছেন তাওহিদের অন্যতম সাক্ষি।
কুরআন পাকে বলেছেন, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই’ (সূরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮)। এ আয়াতে আলেমদেরকে আল্লাহ নিজের নামের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, আলেমরা আল্লাহর কাছে কত বেশি প্রিয়। কেননা যে যাকে ভালোবাসেন তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেন। ইমাম কুরতুবী (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে লেখেন, ‘আলোচ্য আয়াত ইলিম ও ওলামায়ে কেরামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দলিল। কেননা ওলামায়ে কেরাম ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক সম্মানিত হলে তিনি নিজের নামের সঙ্গে তাদের নামই উল্লেখ করতেন।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা আলেম, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন’ (সূরা : মুজাদালা, আয়াত : ১১)। অন্য সবার চেয়ে আলেমদের মর্যাদা বেশি এ জন্য যে, আলেমরা জানেন, তারা ওহির জ্ঞানে গুণান্বিত বলেই তারা প্রকৃত জ্ঞানী। তাই আল্লাহ নিজেই মানব বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখছেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান? অর্থাৎ যারা আলেম আর যারা মূর্খ, তারা কখনো সমান হতে পারে না। কারণ, আলেম মাত্রই আল্লাহ তায়ালাকে চেনেন। সিরাতাল মুসতাকিমের ওপর চলেন। আর যারা জাহেল, তারা না আল্লাহকে চিনে, না সরল পথে আছে।’
আল্লাহ তায়ালা সাধারণ মানুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আলেমদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমরা জানো না’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ৪৩)। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, ‘এ আয়াতে আলেম বলতে কোরআন ও ইসলাম সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।’ আল্লাহ তায়ালা যেমন আলেমদের সুমহান মর্যাদা দিয়েছেন, তেমনি আলেমরাও আল্লাহ তায়ালার এই মর্যাদার যথাযথ প্রয়োগ করে থাকেন। তাই তো আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই শুধু তাঁকে ভয় করে’ (সূরা : ফাতির, আয়াত : ২৮)।
পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যেও আলেম শ্রেণিই আল্লাহকে যথার্থ ভয় করত এবং পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী হিসেবে নিজেকে পেশ করত। এমনকি তারা যদি পূর্ব ইলম অনুযায়ী কোরআন এবং রাসুল (সা.) এর রিসালাত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে, তাহলেও তারা ঈমানের ছায়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় এর পূর্বে যাদেরকে ইলম দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে যখন এটা পাঠ করা হয়, তখন তারা সিজদায় অবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ে’ (সূরা : বনি ইসরাঈল)। শুধু আলেমদের পক্ষেই সম্ভব আল্লাহ তায়ালাকে যথাযথভাবে ভয় করা। কারণ, আলেমরা তাদের ইলম এবং ইজতিহাদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রকৃত মারেফত সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে করে আল্লাহকে ভয় করে চলার মর্যাদা ও ভয় না করার শাস্তি সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা অর্জন করেন
হাদিস শরিফে আলেম সম্পর্কে রাসূলে পাক (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীগণের ওয়ারিশ। আর নিশ্চয়ই নবীগণ কোন দিনার-দিরহাম রেখে যাননি। বরং ইলম রেখে গেছেন ইলিম। যারা ইলমে দ্বীনের পথে আসতে পারেননি তাদের দায়িত্ব হলো আলেমদের মুহাব্বত করা, সুহবতে থেকে প্রয়োজনীয় ইলম শিখে নেওয়া, তাদের সম্মান করা, মর্যাদা দান করা। সাহায্য সহযোগিতা করা। যারা আলেমদের সম্মান দেবেন আল্লাহ তাদেরকেও সম্মান করবেন। তবে নিয়্যাত ঠিক থাকতে হবে। কোনো স্বার্থ ছাড়াই সম্মান দিতে হবে। তখন দেখা যাবে এক সময় স্বার্থও হাসিল হবে, সম্মানও বাড়বে। আলেমদেরকে দলীয় বিবেচনার উর্ধে স্থান দিতে হবে। রাজনীতির উর্ধে রাখতে হবে। কারণ আলেমরা সর্বজনীন। কিছু দেখলেই অমুক আলেম এমন হয়ে গেছে, অমুক দলের দালাল হয়ে গেছে, এমন বলা যাবে না। বললে আলেমের ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হবে উম্মতের। আলেমদের প্রতি যদি বিরূপ মনোভাব রাখেন, স্বার্থের বশবর্তী হয়ে দেখানোর জন্য সম্মান দেখান স্বার্থও হাসিল হবে না, কাংখিত সম্মানও পাবেন না। এরও দীর্ঘ বাস্তবতা এর প্রমাণ।
আলেমদেরও উচিত নিজেদের স্বকীয়তা সর্বজনীনতা এবং গ্রহণযোগ্যতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা। আলেমরা তো কোরান হাদীস তথা দ্বীনি ইলমের ফেরিওয়ালা। এর চাইতে উত্তম মর্যাদা তাদের জন্য কী আছে। সুতরাং তারা কেন দুনিয়াবী বিভিন্ন মত-পথের হয়ে নিজেদের উপস্থাপন করতে যাবে। বরং তাদেরকে তাদের সঠিক অবস্থানে অটল অবিচল থাকতে হবে। দলে দলে উম্মতকে বিভক্ত করবে না। সব দল-মত এবং পথের হেদায়াতের জন্য তারা হবে রাহবরের ভুমিকায়। স্বার্থের দ্বন্দ্বে তারা জড়াতে পারবে না। তখন স্বার্থ তাদের সালাম করবে। সম্মান তাদের পিছু নেবে। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস এর প্রমাণ।
বর্তমানে তাবলীগ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। তা নিয়ে কিছু বলতে চাই। বর্তমানে দাওয়াত ও তাবলিগের নামে সারা বিশ্বে যে ঈমানি আন্দোলন চলছে, তার তাত্ত্বিক ভীত বা উসুল হলো ছয়টি। অনেকে উসুলকে সম্ভ মনে করে তাবলীগের উপর ভুল ধারণা পোষণ করেন। তারা বলেন, যাকাত হজ্জ ছাড়া কিভাবে পরিপূর্ণ ইসলাম হয়? তাদের সুবিধার জন্য বলতে চাই, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যেমন বিভিন্ন দফা থাকে, তাবলিগ জামাতেরও এরকম দফা ছয়টি, একে মূল স্তম্ভ মনে করা ভুল। ছয়টি উসুল হলো ১. ঈমান. ২. নামাজ. ৩ ইলম ও জিকির, ৪. একরামুল মুসলিমিন. ৫. সহি নিয়ত, ৬. দাওয়াত ও তাবলিগ।
আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিরা নানা গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তাঁরা নবী (সা.)-এর সুহবতে থেকে এ গুণগুলো অর্জন করেছিলেন। এসব গুণের কারণেই তাঁদের দ্বীনের ওপর চলা সহজ হয়ে গিয়েছিল। আজকের দিনেও কেউ যদি এ ছিফত বা গুণগুলো অর্জন করার চেষ্টা করে, তাহলে দ্বীনের ওপর চলা তার জন্যও সহজ হয়।
এর মধ্যে প্রথম ছিফত বা গুণ হলো ঈমান। ঈমান হলো এমন এক জিনিস, যা না থাকলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। ঈমানের মূল ভীত হলো কালেমা। যার সাধারণ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর রাসুল। কালেমার মূল তাৎপর্য হলো, আমরা দুই চোখে যা কিছু দেখি বা না দেখি, আল্লাহ ছাড়া সবই মাখলুক। মাখলুক কিছুই করতে পারে না আল্লাহ ছাড়া, আল্লাহ সব কিছু করতে পারেন মাখলুক ছাড়া। আর হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর তরিকায় দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি ও সফলতা।
বলা হয়, মুসলিমদের ঈমান আছে, আর এ জন্যই সে মুসলিম। কিন্তু বর্তমান যামানায় মুসলিমদের ঈমান এত দুর্বল অবস্থানে আছে যে তার সে ঈমান তাকে মসজিদে নিয়ে আসতে পারছে না। সে দুর্বল ঈমান তাকে নবী (সা.)-এর সুন্নতের ওপর চালাতে পারছে না। তাই তাবলিগের জামাতের একটি মূল কাজ হলো ঈমানের দাওয়াত দেওয়া। মুসলিমদের কাছে ঈমানের দাওয়াত আর অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াত।
উসুলের দ্বিতীয় বিষয়টি নামাজ। নামাজ হলো আল্লাহর থেকে চেয়ে নেওয়ার একটি মাধ্যম। হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম নামাজেরই হিসাব নেওয়া হবে। রাসুলে পাক (সা.) যেভাবে নামাজ পড়েছেন এবং যেভাবে তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন, ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করার এক যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করা। সুরা ইবরাহিমে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং রাসুল (সা.)-কে বলছেন, আমার ঈমানদার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন নামাজের পাবন্দি (অনুসরণ) করে। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) জীবনে শেষ অসিয়ত করেছেন যে নামাজ, নামাজ এবং নিজ গোলাম ও অধীনদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো (আবু দাউদ শরিফ)। একজন মুসলিম কিভাবে নিজের জীবনে নামাজকে অর্জন করবে, সে ফরজ নামাজগুলো জামাতের সঙ্গে নিয়মিত আদায় করবে, ওয়াজিব ও সুন্নতের অনুসরণ করবে, নফল নামাজ বেশি বেশি আদায় করবে এবং উমরি কাজা (অনেক পুরনো দিন থেকে ছেড়ে দেওয়া) নামাজ আদায় করবে।
তৃতীয় ছিফত বা গুণ হলো ইলম ও জিকির। উভয় একই নম্বরের স্তরে রয়েছে। ইলম হলো আল্লাহর হুকুমগুলো জানা এবং নবী (সা.)-এর তরিকা অনুযায়ী সেগুলো মেনে চলা। পবিত্র কোরআনে নবী (সা.) কে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, বলে দিন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)। হাদিস শরিফে আছে, একজন আলেমের মৃত্যু অপেক্ষা একটি গোত্রের মৃত্যু অতি নগণ্য ব্যাপার (বায়হাকি শরিফ)। এসব নানা দিক বিবেচনায় ইসলামে ইলম শিক্ষার বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ইলম দুই প্রকার। এক প্রকার ফাজায়েলে ইলম। কোন আমল করলে কী কী লাভ হবে, তা হলো ফাজায়েলে ইলম। এগুলো বিভিন্ন তালিমের মজলিশ ও ফাজায়েলে কিতাব থেকে জেনে নেওয়া যায়। কিন্তু মাসায়েলে ইলম জানতে হবে হক্কানি আলিমদের কাছে গিয়ে। মাসালা-মাসায়েল কখনোই মুফতি-আলিমদের ছাড়া চর্চা না করা। আর জিকির হলো, সর্বাবস্থায় মনের মধ্যে আল্লাহ পাকের ধ্যান ও খেয়াল পয়দা করা। জিকিরের বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, বুদ্ধিমানরা শয়নে ও উপবেশনে ও দ-ায়মান অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯১)।
চতুর্থ ছিফাতটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একরামুল মুসলিমিন, মুসলমান ভাইয়ের উপকার করা। এটা হলো, মোয়ামেলাত-মোয়াশেরাত অর্থাৎ লেনদেন, আচার-ব্যবহারও। সমাজে মানুষের মর্যাদা জেনে সে অনুযায়ী তার সঙ্গে ব্যবহার করা। বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ ও আলিমদের সম্মান এর অন্তর্ভুক্ত। যাকাতও এর মধ্যে পড়ে। অনেকে বলেন তাবলিগের ছয় উসুলের মধ্যে যাকাত নাই। যাকাত ছাড়া তারা কিভাবে ইসলামের কথা বলেন, তাদের জন্য বলতে চাই একরামুল মুসলিমিন হলো মুসলমানকে সাহায্য বা একরাম করা, যাকাত দিলে একরামই হয়।
পঞ্চম উসুল হলো, সহি নিয়ত অর্থাৎ নিয়তকে সহিশুদ্ধ করে নেওয়া। আমরা যেসব কাজ করি বা না করি, সবই আল্লাহর খুশির জন্য হতে হবে। ইমাম বুখারি তাঁর হাদিস সংকলনে সহি নিয়তের বিষয়টি এক নম্বর হাদিসে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) রাসুলে পাক (সা.)-কে উদ্ধৃত করে বলেন, যে ব্যক্তি নেক কাজের নিয়ত করল, (অতঃপর কোনো কারণে) করতে পারল না, তার জন্যও আল্লাহ তাআলা একটি পূর্ণ নেকি লিখে দেন। (বুখারি শরিফ)
ষষ্ঠ উসুল হলো হিসেবে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজটি বর্ণিত হয়েছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT