সাহিত্য

আফজাল চৌধুরীর সাহিত্য ও চিন্তা

আবু মালিহা প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০১-২০১৯ ইং ০০:১০:০৯ | সংবাদটি ২৩২ বার পঠিত

বাংলা সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে যে কয়জন খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিক আছেন, তাদের মধ্যে কবি আফজাল চৌধুরী অন্যতম। অপসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে সাহিত্যে শুদ্ধ চর্চা বা নৈতিক মানে উন্নত এবং উৎকর্ষ বিধানে কবি আফজাল চৌধুরীর কাব্য সাধনা ছিল অনন্য। গতানুগতিক সাহিত্য রচনা বা কাব্য সাধনা তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন নৈতিকতা সম্পন্ন আদর্শিক চেতনার ধারক ও বাহক। যা তাঁর সাহিত্যে প্রায়শঃই চোখে পড়ে। সমসাময়িককালের অন্যান্য কবি সাহিত্যিকগণ যেখানে গড্ডালিকা প্রবাহে ¯্রােতমান হতো সেখানে আফজাল চৌধুরী নিজের লক্ষ ও সাধনাকে গতিময়তায় এগিয়ে নিয়ে যেতেন শুদ্ধ সাহিত্য নির্মাণের অভীষ্ঠ লক্ষে। যা তার বিভিন্ন কবিতা এবং কাব্য গ্রন্থে দ্বীপ্তিমান হয়ে আছে।
সাহিত্যের এ ধরনের টাইরেসিয়াস দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই তাঁকে খ্যাতির আসনে নিয়ে গেছে। মৌলিক সাহিত্য রচনা বা কাব্য সাধনা হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাংলা ভাষা বা সাহিত্যে তেমন খ্যাতিমান কেউ নেই। কবি আফজাল চৌধুরী সেদিক থেকে সবার শীর্ষে অবস্থান করছেন।
ষাটের দশকে শক্তিমান কবিদের মধ্যে আফজাল চৌধুরীর অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আদর্শিক চেতনা ধারণ এবং সত্য প্রকাশে আপোষহীন। তার কবিতার ভাব এবং ভাষা আদর্শিক দ্যোতনা এবং নৈতিক ভাবধারায় বাক্সময় হয়ে ফুটে উঠেছে প্রতিটি ছন্দ এবং ছত্রে। কল্যাণব্রতের’ কবি হিসেবেই মূলত: সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।
এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ কাব্যের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘কল্যাণব্রত’ পাঠের সময় এই কাব্যের যে গুণটি বড় হয়ে পাঠকের চোখে ভাসে তা হলঃ এর স্বকীয়তা। আফজাল চৌধুরীর কন্ঠস্বর আলাদা ও স্বকীয়, স্বাদে ও চরিত্রে গতানুগতিক কবিতা থেকে আলাদা। তার কবিতার ডালে ডালে শব্দের যে অবাক বিস্ময় গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে ফুটে আছে, তা যে কোন পাঠককেই আকর্ষণ করবে।’
বাস্তবিকই আফজাল চৌধুরীর বিভিন্ন কাব্য গ্রন্থ পাঠ করলে তন্ময় হয়ে ভাবতে হয় তার গভীরতা, আত্মিক চেতনা এবং আদর্শিক ভাবধারাকে কী অনুপম ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই।
কাব্য ধারায় আদর্শ প্রচারে বীরত্ব গাঁথা শব্দ ঝংকারে ছলছলিয়ে উঠেছে উন্নত সাহিত্যের সবুজ চত্বর নির্মাণে। শব্দ প্রয়োগ এবং বাক্য বিন্যাসে সচেতনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নৈতিক পরশে এবং ভাবের মোহনার শুভ্র সমুজ্জ্বল প্রকাশে।
কবির কাব্য সমুদ্রে যদি কেউ ডুব দেয় তবে সে নিশ্চয়ই ঝিনুক মুক্তা খোঁজে পাবে এ বিশ্বাস করাই যেতে পারে। শৈল্পিক বিন্যাস, প্রেম-বিহ্বলতা, শব্দ অলংকরণে বীরত্ব চেতনার প্রকাশ, পবিত্র এবং কৌলিন মানসিকতার উচ্ছ্বাস, আষাঢ়ে উজ্জীব ময়ূরী পেখমের মত বিস্তৃত প্রেম বিলাসী হৃদয়ের আবেগ অভিলাষ তার কবিতা শরীরের অনন্য সৌন্দর্যের বিকশিত রূপ যেন প্রতিটি কবি মনকেই দোলা দেয়। পবিত্র শান্ত হৃদয়ের অনবদ্য কবিতার ফুল বাগানে সুবাস ও সৌরভ ছড়ায় যেন।
অন্য অনেক কবিদের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। সাহিত্যিক মান এবং গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী একজন কবি। সৌজন্যতায় গাম্ভীর্যবোধে কবি আফজাল চৌধুরী ছিলেন অনন্য। কন্ঠের যাদুকরী উচ্চারণ এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অনন্য ভঙ্গিমার এক মহানায়কের ভূমিকায় নিজেকে তুলে ধরতে সবসময়ই সচেতন ছিলেন। তাঁর ভাব-ভাষা ও চিন্তার ¯্রােতকে এবং কাল থেকে কালান্তরের ভাবনাগুলোকে যুথবদ্ধ পুষ্পপুঞ্জের ন্যায় সবার সামনে উদ্ভাসিত করার এক নবরূপ কৌশলীর মতো শিল্প ছন্দের প্রকাশ ঘটাতে পারতেন যা হতো মনোমুগ্ধকর এবং উল্লাস মুখর। পাশাপাশি সাহিত্যের কৌলিন্য বলতে যা বুঝায় সেটিকে আরো উন্নত করতে সর্বদাই আত্মনিমগ্ন ছিলেন কাব্য মেখলার কবিতার পুষ্প কাননে। তার কাব্য প্রেমের সৌন্দর্যতায় দেশের খ্যাতিমান অনেক কবি সাহিত্যিক প্রশংসা করেছেন শ্রদ্ধাবোধের সাথে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন- কবি আল মাহমুদ, কবি আসাদ চৌধুরী এবং পরাবাস্তবতার কবি এবং বিদগ্ধ সাহিত্য সমালোচক আব্দুল মান্নান সৈয়দ সহ আরো অনেকে।
এই ব্রতচারী কবি অনেক খ্যাতিমান বিশ্বের বড়ো বড়ো কবি সাহিত্যিকদের চিন্তা চেতনার সাথে যাজুয্য খোঁজে পাই। তেমনি একজন সাহিত্য সমালোচক তার মিল খুঁজতে চেষ্টা করেছেন তার কাব্য জমিন থেকে।
‘বোদ লেয়ার তাঁর সমকালীন ভিক্টোর হুগোর উপন্যাস লো মিজেরাবল’ এর সমালোচনা করে লিখেছিলেন ‘ভিক্টোর হুগো’ মানুষের পক্ষে অথচ ঈশ্বরের বিপক্ষ নন। ঈশ্বরে আস্থা আছে, তবু তিনি মানুষের বিরুদ্ধে নন। ‘কল্যাণব্রতের’ বৈশিষ্ট্যে তার মিল তার যথার্থতা যেন। তার কবিতাও যেন মানুষ ও ঈশ্বরের এক মিশ্র কনভেনশনে কথকতা ও কারুকর্মের যুগলবন্দি হয়ে দীপ্রতা ছড়াচ্ছে।’
বাস্তবিকই কবির কাব্যিক ভাষায় দেশ জাতি ও গোত্র-শ্রেণীর সম্মিলনে অপূর্ব বাক্সময় প্রকাশ করেছেন দীনতা-হীনতা উত্তরণে প্রেম-ভালোবাসার এক উদার মানবিকতায়। মানবিক দুর্বলতাকে তিনি সমূলে উৎপাটিত করার সাধন কর্মযজ্ঞের এক অবিশ্রান্ত প্রেরণার সঞ্চার করেছেন আপন কাব্য বলয়ে। যার চলমান গতিতে কবিতার শমসীর চমকিয়ে অচ্ছুত চিন্তার পঙ্কিলতাকে তার কাব্যের স্বচ্ছ সলিলে ধুয়ে মুছে পবিত্র করতে চেয়েছেন কাব্য মানস জগৎকে।
তার ছিল ধূমকেতু চেতনার এক মহান প্রয়াস। যারা তাঁর কাছে থেকে সাহিত্য চেতনার স্ফুরন ঘটিয়েছেন তারা একথা বলতে বাধ্য হবেন, যে তাঁর শুদ্ধ সাহিত্য রচনার সংগ্রামে একাই ছিলেন তবে কারো মুখাপেক্ষী হননি। বিধাতার প্রতি তাঁর আত্মসমর্পণ ছিলো পাহাড় সম দৃঢ় বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি। যাতে কল্পনার রং ফলিয়ে তাকে বিচ্যুত করার মতো কোন মেকী শব্দমালার কঠিন আঘাত তাকে লক্ষ ও উদ্দেশ্য থেকে টলাতে পারেনি। আমৃত্য অবিচল আস্থায় টিকে ছিলেন সাহিত্যিক সেনানী হিসেবে। কঠোর সমালোচক ও তার সান্নিধ্যে এসে অবনত মস্তকে নিজেকে আত্মনিবেদন করেছেন কাব্য প্রেমের ভালোবাসার নির্মল অবগাহনে। শুদ্ধ করেছেন ভাব-ভাষার পঙ্কিলতা থেকে।
কবির একান্ত সান্নিধ্যে থাকা কবি ও সমালোচক মুকুল চৌধুরী তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। যাকে তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন এবং একান্তভাবেই নিরীক্ষণ করেছেন। তার কয়েকটি কবিতা এবং গ্রন্থ নিয়ে সমালোচনামূলক বইগুলো খুবই উল্লেখযোগ্য। কেননা কবি সম্পর্কে অনেক কথাই অনেকে জানেন না। কারণ তিনি ছিলেন এক প্রকার নিভৃতচারী। নিজেকে প্রকাশ করার মানসিকতা কখনোই তার ছিল না। কাব্য সাধনাই ছিল একমাত্র তার ধ্যান। নিজেকে ঘটা করে প্রকাশ করার মানসিকতা মোটেই ছিল না।
তবে সরব ছিলেন, সত্য প্রকাশে। অন্যায়ের প্রতিবাদে। জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বজ্রকন্ঠে। কবিতায় আন্দোলন করেছেন স্ব-জাতির উত্থানে। পাশাপাশি সমাজনীতি ও রাজনীতির কাব্য মঞ্চেও ছিলেন বীরের ভূমিকায়। মানুষের অধিকার আদায়ে, জুলুম নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে, সমাজবাদীদের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে তার কলম ছিলো ক্ষুরধার ও তেজোদ্বীপ্ত। মানুষের মুক্তিতে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মিছিলে তার কবিতার তলোয়ার ছিল সবেগে ধাবিত। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নাই মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত।
কবির বহুগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- কাব্যগ্রন্থ ‘কল্যাণব্রত (১৯৬৯) (২য় সংস্করণ ২০০৮) শ্বেতপত্র (১৯৮৩) সামগীত দুঃসময়ের (১৯৯১) শবমেহেরের ছুটি (২০০৫) নয়া পৃথিবীর জন্য (২০০৬) ও বিশ্বাসের দেওয়াল (২০০৭)।
কাব্যনাটক: হে পৃথিবী নিরাময় হও (১৯৭৯)।
প্রবন্ধ গ্রন্থ: ঐতিহ্য চিন্তা ও রসুল প্রশস্তি (১৯৭৯) ৪র্থ সংস্করণ (২০০৪)।
অনুবাদ গ্রন্থ: বার্নাবাসের বাইবেল (১৯৯৬) ২য় সংস্করণ (২০০৬)।
নাটক: সিলেট বিজয় (২০০৬) এবং আরো অনেক অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে। কবি আফজাল চৌধুরী ফাউন্ডেশন সে দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছে।
পরিশেষে এই মহান কবির প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করা একান্তই অপরিহার্য। কেননা তার চিন্তা মনন, ভাব-ভাষা প্রতিটি বাক্যে যে আদর্শিক চেতনার কথা উচ্চারিত হয়েছে। সুষ্ঠু সমাজ ও নৈতিক বলয় সৃষ্টির আহ্বান করেছেন। তাঁর সেই উদ্দীপ্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে উত্তর প্রজন্মের কাব্য প্রেমিকদের এগিয়ে আসা প্রত্যেকের দায়িত্ব বলে মনে করি।
কোন মানুষই সম্পূর্ণ দ্বীপমাত্র নয়/ প্রতিটি মানুষের সম্পূর্ণের অংশ মাত্র।/ মৃত্যু আমাকে খর্ব করে
কারণ আমি জড়িত মানবতার সঙ্গে,/ সুতরাং নিজেকে জিজ্ঞেস করোনা, কার জন্যে/ মৃত্যু ঘন্টা বাজে, জেনো, সে তোমার জন্যে,/ সে তোমার জন্যে।
সাহিত্যকাশের অনন্য নক্ষত্র কবি আফজাল চৌধুরীর বাক্য সাধনা ও কর্মময় জীবন ভবিষ্যত প্রজন্মকে আন্দোলিত করুক, এই প্রত্যাশা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT