সাহিত্য

পলাতক

আজিজ ইবনে গণি প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০১-২০১৯ ইং ০০:১২:০১ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

অনেক কষ্ট করে কুলসুমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তিন সেট কাপড়, ব্যবহারী সোনা আর নগদ পঞ্চাশ টাকা ছাড়া আর কিছুই আনে নি। মা নামাজে রত, একমাত্র ভাবী রান্না ঘরে ব্যস্ত। এই ফাঁকে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আজ সে এবং তার প্রেমিক কবির পালিয়ে যাবার পাকা কথা হয়েছে। নতুন দিগন্তে তারা সাজাবে বাসর। তাই সংগোপনে এ কাজ করা। রোরকাটা পরে নি, পলি বেগে পুরে রাখে। বোরকা পরাতে একটা সমস্যা আছে, যে কেউ জিজ্ঞেস করবে কোথায় যাচ্ছো? তাই ধরা পড়ার সম্ভাবনা। ফ্রগ-সেলোয়ার পরনে ছিল, তা নিয়েই সে বেরিয়ে পড়ে।
বাড়ি থেকে প্রায় আধমাইল দূরে পাকা রাস্তা। এতোটুকু পথ তার হাঁটতে হবে। কিন্তু নৌ-পথে যেতে খুব একটা হাঁটা পড়ে না।
ইঞ্জিন নৌকা ঘাটে এলেই ব্যস, উঠে সোজা ষ্টেশন রোড। আর ষ্টেশন রোড এলেই সেখান থেকে যে কোন জায়গায় যে কোন যানবাহনে যাওয়া সহজ। কিন্তু এখানে সমস্যা আরেকটি, ঘন্টা দুই অপেক্ষা করলেও ইঞ্জিন নৌকার পাত্তা মিলে না। তাই রিস্কি এ সময়ে অপেক্ষা না করে হাঁটতে শুরু করে দিলো মেঠোপথ দিয়ে। ভিতরে তার ভয়, অনেক ভয়। এক পা ফেললেই ফিরে চায় পিছনের দিকে। বাড়ির কেউ যদি পিছু নেয় তবে ব্যর্থ মনোরথ।
মেইনরোডের কাছাকাছি আসলেই একটা রিক্সা যেতে দেখে। রিক্সা ড্রাইভারও তার দিকে হঠাৎ তাকায়। তার দিকে চাইতেই হাত ইশারায় দাঁড়াতে বলে তাকে। আরো একটু দ্রুত পা ফেলে সে। পথটা এখন তার কাছে খুব লম্বা লাগে এখন। বাড়ি থেকে মেইন রোড, এই সামান্য রাস্তা এ মুহূর্তে ফুরাচ্ছে না। এক সময় রিক্সার কাছে আসে কুলসুমা । রিক্সায় উঠে পড়লে খাজনাপুর রাস্তা দিয়ে চৌধুরী বাজারের দিকে তারা এগুয়। কিন্তু খাজনাপুর রাস্তটি অত্যন্ত ভয়ংকর। দিনে-দুপুরে এখানে নানা অঘটন ঘটে থাকে। বেশ কিছু জায়গা নিরব-নিস্তব্ধ। রাস্তার আশপাশে কোন বাড়ি ঘর নেই। আছে একটি বিরাট গোরস্থান। পাঁচ সাত গ্রামের এটিই একমাত্র লাশ দাফনের স্থান। আর এখানেই ঘটে সব অঘটন। দিনে কেউ ও-দিকে একা যায় না। গোরস্থানের পাশের জঙ্গলেই ওত পেতে থাকে সন্ত্রাসী বা দুষ্ট প্রকৃতির লোক। এরা সঙ্গবদ্ধ এবং শক্তিশালী বিধায় কেউ কিছু করতে পারে না। ঠিক ওই জায়গায় রিক্সা যেতেই সামনে এসে খাড়া ক'জন যুবক। সবারই মুখোশ লাগানো। কেউ উদলা, কেউ হাফপ্যান্ট পরে। আবার কারো পরনে জিন্সের সার্ট-পেন্ট। কারো মুখেই দাড়ি না থাকলেও মোছ গুলো গজার কাঁটার মত। মুখোশের এই অংশটুকু কাটা। সম্ভবত প্রদর্শনের জন্য। দেখলেই গায়ের লোম খাড়া হবেই। একজন যুবক এগিয়ে এসে ড্রাইভারকে একটা চড় দেয়। এবং বলে
ঃ কুত্তার বাচ্চা, ডাক শুনিস না কেন? দিমু আরো লাগিয়ে?
ঃ আরে ভাই, করো কি? মারেন কেন? আমার কি দোষ, আপনারে কই ডাকলেন?
ঃ এখনও কথা বাড়ায়?- আরেকটি যুবক তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে। মারার জন্য আরেকজন উদ্যত হলে হাফপ্যান্ট পরা যুবক বাঁধা দেয়। বলে
ঃ মারিস না। আমাদের কথা শুনলেই তো খালাস, নইলে খবর আছে।
ড্রাইভার হাবভাব বুঝে ফেলে। এরা আসল পার্টি তাই আর কথা বাড়ায় না। এদের মোকাবিলা করতে হলে কৌশলে করতে হবে। তার তো কুংফু-ক্যারাটি জানাই আছে। তাহলে ভয় কিসে? তার সামনেই একজন অসহায় মেয়ের ইজ্জত হরণ হবে তা তো মেনে নেয়া যায় না। সবারই ঘরে তো মা-বোন আছে। তাই তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়তে হলে একটা প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। তাই তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায় সন্তর্পনে। আর তারা একা মেয়েটাকে পেয়ে সবাই রাক্ষসের মত, ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের মত হয়ে উঠে সবাই। দু’জন তার হাত ধরে রিক্সা থেকে নামাতে চাচ্ছে কিন্তু সে না নামার জন্য জোরাজুরি করছে। রিক্সা ড্রাইভারকে উদ্দেশ করে কেঁদে কেঁদে বলছে-
ঃ ও ড্রাইভার ভাই, আমাকে বাঁচাও।
ঃ আমি পারবো না বোন। এরা কত শক্তিশালী, শেষে আমার যে প্রাণ যাবে।- ভঙ্গি করে কথাটি বলে ড্রাইভার। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে পুরা হুশিয়ার। সময় মত সে ঝাপিয়ে পড়বেই। ড্রাইভারের কথা শুনে সবাই হেসে উঠে। বলে-
ঃ ড্রাইভার তোকে বাঁচাতে পারবে না। বরং ওরই প্রাণ যাবে। মাগির ঘরের মাগি। একলা একলা কই যাবি? আমাদের একজনকেও কি চয়েজ হয় না তোর? আজ তোর যোনীর সুড়সুড়ি মেটাবো রে।
ঃ আপনারা কি শুরু করলেন? আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে। আপনারা আমার পথ ছাড়ুন। মা-বোন তো আপনাদেরও আছে।
ঃ মা-বোন! দূর শালী, সব মা-বোন হলে বউ হবে কেটা রে? তোকে আমরা কেউ-ই বউ বানাবো না। আজ তোকে নিয়ে আমরা যাবো ওই জঙ্গলে........।
তাদের কথা-বার্তা শ্রবনে আর টানা-হেচড়ায় কুলসুমার ভয়ের পরিমাণ বেড়ে যায়। এবং তার বেঁচে যাওয়ার আশাটা একদম ছেড়েই দেয়। অনুনয়-বিনয় কিছুই কাজে আসছে না। হাত-পা-ও ধরলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তারা যে নাছোড়বান্দা। উদ্দেশ্য হাছিল করবেই। অবশেষে তারা টেনে তাকে রিক্কা থেকে নামিয়ে ফেলে। সে উচ্চ স্বরে কাঁদতে থাকে এবং বলে-
ঃ আল্লার দোহাই, আমার ইজ্জত নষ্ট করো না।
ঃ এতো তরতাজা খাসা মাল কি এভাবে ছেড়ে দেয়া যায়? তুই-ই বল সুন্দরী? -হাফপ্যান্ট পরা লোকটি তার মুখের কাছে মুখটি নিয়ে বলল। বাকি সবাই এক সুরে বলে উঠলো-
ঃ না, না, এতো খাসা মাল ছাড়া যায় না। শৃগাল যেমন খাসা মুরগী জঙ্গলে নিয়ে আচ্ছা করে খায়, আমরাও আজ.....হ্যা ....হ্যা! কুলসুমার কান্না থামছে না। এ দিকে তাদের অমানুষিক নির্যাতনও থামার কথা নয়। একজন বুকের ওড়না টেনে নিয়ে বুকটা খালি করে নেয়। কামিজের গলায় টান দিয়ে খানিকটা ছিড়ে ফেলে অন্যজন। রিক্সা ড্রাইভার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে সব। তার ভেতর আস্তে আসেড় ফুলে উঠছে ক্রোধে। আশপাশ তাকাচ্ছেও কিন্তু কোন লোক বা যানবাহন কিছুই আসছে না। আসলে না হয় শক্তি বৃদ্ধি পেতো। তবে ন্যায়ের পক্ষে আল্লাহ সহায় থাকেন। জুলুমবাজরা সব সময়ই পরাস্ত। তাই কামিজটা ছিড়ে ফেলতেই তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। আল্লাহর নাম স্মরণ করে কুংফু-ক্যারাটির কৌশল নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তাদের উপর। তার মারির তোড়ে কেউ ই টিকে থাকতে পারে নি অবশেষে। ছেড়া, ফাটা, জখমে ভরা শরীর নিয়ে পালিয়ে যায় সব। কুলসুমা তার ফিল্মি স্টাইলের মাইর দেখে অবাক হয়। ড্রাইভার তার গায়ের ওড়না কুঁড়িয়ে এনে তার গায়ে জড়িয়ে দিতে দিতে বলে
ঃ বোন, রিক্সায় ওঠো। আর কোন সমস্যা নেই। এমন সাইজ করে দিলাম যে, জীবনে আর নারীর দিকে তাকাবে না।
ঃ তুমি না থাকলে তো ভাই আজ আমার সব যেতো। তোমার কাছে আমি চিরঋণী। তোমাকে আমি কিছুই দিয়ে খোশ করতে পারবো না।
ঃ না, না। কিছুই করতে হবে না। তোমার জান-ইজ্জত যে বাঁচাতে পেরেছি এতেই আমার আনন্দ। তোমার মত বোন তো আমারও আছে।
ঃ আচ্ছা ভাই, তোমার বাড়ি কোথায়?
ঃ বাড়ি-ঘর দিয়ে আর কি করবেন? আমি এক সামান্য রিক্সা ড্রাইবার। -সে আর তার পরিচয় দিতে যায় না। রিক্সার চাকা ঘুরতে ঘুরতে এক সময় পৌছে যায় চৌধুরী বাজার। মডার্ণ টেলিফোন সেন্টার এর সামনে রিক্সা আসতেই ড্রাইভারকে রিক্সা থামাতে বলে। পায়ে এখনও জুতা ঢুকায় নি। গাইট-বোচকা এবং জুতা নামিয়ে নেয় নীচে। সব কিছু দোকানের বাইরে রেখে সে ঢুকে পড়ে ভিতরে। কর্মচারিকে ডাক দিয়ে বলে-
ঃ এই নাম্বারে একটা কল দিন তো- কর্মচারি আফজাল হাত বাড়িয়ে কাগজটি নেয়। সিটিসেল দিয়ে পয়লা নাম্বার টিপে। লাইন যায় না। পরে র‌্যাংকস টেল দিয়ে নাম্বার ধরিয়ে তার হাতে দেয় রিসিভার-
ঃ কবির, তুমি কোথায় এখন? আমি তো তোমার দেয়া ঠিকানায় এসে পৌঁছে গেছি। ফোর স্ট্রোক নিয়ে এক্ষুণি আসো।
ঃ কেন, কি হয়েছে?
ঃ কি হয়েছে! তুমি এমন হাবাগোবার মত প্রশ্ন করো কেন? তুমি কি জানো না যে আজ আমরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবো দূর অজানায়? মডার্ণ টেলিফোন সেন্টারের সামনে ফোর স্ট্রোক নিয়ে আসার কথা না?
কথা ছিল ঠিক। কিন্তু আমি পারবো না।
ঃ কেন?
ঃ কেন টেন নেই। অনেক ভেবে-চিন্তে দেখেছি এ একটা খারাপ কাজ।
ঃ খারাপ কাজ! তাহলে কথা দিলে কেন? এর আগে কেন ভাবলে না?
ঃ কথা দিয়েছি তা তোমাকে টেষ্ট করার জন্য। আজ তুমি তোমার সবাইকে ফেলে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চাইছো। কাল তুমি আমার চেয়ে ভালো ছেলে পেলে তাকে নিয়ে যে পালিয়ে যাবে না।
তার নিশ্চয়তা কোথায়? নারীরা বহুরূপিনী, একজনে তুষ্ট নয় যাচে বহু জন...। - এ কথাটি বলেই সে লাইন কেটে দেয়। বারবার চেষ্টা করে সে, কিন্তু ওর মােবাইলটা বন্ধ। কুলসুমা এখন নিস্পায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ! কবিরের এ প্রতারণায় তার বিবেক এখন একদম আতুড়। ভেবে কূল পায় না। পথিমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাও তার চোখে ভাসে। এতো প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে এসেও প্রিয়জন এতো নিষ্ঠুরতা দেখালো? চোখের কোণে দু’ফোটা অশ্রু। আফজাল পাশে দাঁড়িয়েই ছিল। সব শুনেছে সে। রুমে ঢুকেছে যখন তখনও দেখেছে তাকে হন্তদন্ত, এলো মেলো। পায়েও নেই জুতো। তাকে শান্ত¦না দিয়ে বলে-
ঃ সবই ভাগ্যের লিখন। মনে কিছু নিবেন না, আপনার পায়ে জুতো নেই।
ঃ ও-তাই না কি? আদৌ খেয়াল নেই। ফোনের বিল কত?
ঃ ৪০ টাকা।
ঃ আমার কাছে তো এতো টাকা নেই ভাই। ২০ টাকা ড্রাইভারকে দিয়ে ৩০ টাকা এখন আছে। অন্যদিন ১০ টাকা দেবো।
ঃ আপনি অপরিচিতা। বাকি হয় না?
ঃ ভাই, আমি বিপদগ্রস্ত। আমার ভুলের কারণে এই দশা। আপনি তো শুনলেন সব। আমি যে এখন বাড়িতে ফিরে যাবো এ ভাড়া টুকুও আমার কাছে নেই। আল্লাহ্ আমার সহায়। আর প্লিজ ভাই, টাকা গুলো রাখেন। আমি কোন খারাপ মেয়ে নই। আরেকদিন এসে বাকি ১০ টাকা দেবো। ঃ ঠিক আছে যান। কিন্তু আপনি যাবেন কি ভাবে?
ঃ আমার জন্য চিন্তা করবেন না। ইঞ্জিন নৌকায় বাড়ির ঘাটে গিয়ে নামবো। বাড়ি থেকেই টাকা এনে দেবো।
ঃ কিন্তু বাড়ির সবাই যে সন্দেহ করবে! এতোক্ষণে হয়তো খোঁজাখুজি শুর হয়ে গেছে।
ঃ তা তো অবশ্য। মিথ্যে বলবো। এই বলে কুলসুমা বেরিয়ে পড়ে ফোনের দোকান থেকে। বাইরে রাখা জুতো পায়ে দেয় প্রথমে। হাতে তোলে নেয় পলিব্যাগ। ভীরু ভীরু পায়ে হাঁটতে থাকে লঞ্চ ষ্টেশনের দিকে। চোখে যেন সে পথ দেখছে না। বাড়িতেই বা এখন সে উঠবে কোন্ মুখে?

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT