মহিলা সমাজ

যাত্রা

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০১৯ ইং ০০:৪৫:৪৩ | সংবাদটি ৩৪ বার পঠিত

লিজা মেয়েটি ছোট বেলা থেকেই ছিলো বেশ শান্তশিষ্ট। কথাবার্তা বলতো কম, তবে খুব হাসতে পারতো। হাসির মতো কিছু হলে সবাই না হাসলেও সে একা একা আপন মনে হাসতো। ভাইবোন তাকে এ হাসির জন্য আদর করে তাকে অনেক নামে ডাকতো। সে ছিলো মেজাজী এবং জেদী স্বভাবের। কেউ কিছু বললে তার মনমতো না হলে সে ভীষণ ক্ষেপে যেতো।
লিজার মা বলতেন মেয়েদের এতো জেদ ভালো না। মেয়ে হয়ে জন্মেছো। মেয়েদের অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। লিজা তখন থেকেই মনে মনে চিন্তা করতো। আর মাকে বলতো মেয়ে হয়ে জন্মেছি তো কি হয়েছে?
লিজার ছোট একটি বোন ছিলো, সে আবার লিজার বিপরীত। সে কথাবার্তা বলতো কম, চুপচাপ গম্ভীর। দু’বোনে এই ঝগড়া এই ভাব। মা-বাবা, ভাই-বোনের সংসারে লিজার আস্তে আস্তে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেলো। আর ঠিক তখনই বাড়িতে চললো ঘটকের আনাগোনা। লিজার বোন বলতো আপু, তুই তো পরের ঘরে চলে যাবি, আমাদের কিন্তু খুব খারাপ লাগবে। সুখ দুঃখের মাঝে হঠাৎ করেই একদিন লিজার বিয়ে ঠিক হলো।
কারোরই কথা বলার কিছু ছিলো না কারণ, লিজার বাবার মুখের উপর কথা বলার সাহস কারোরই ছিলো না। ভালো কি মন্দ, চিন্তার সুযোগ পাওয়া না গেলেও বিয়ের পর লিজাকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হলো। দিন কয়েক যেতে না যেতে লিজার বরের আচার ব্যবহার রীতিনীতি সবই লিজার কাছে খারাপ ঠেকে। লিজার জীবনে সুখ বা শান্তি কোনটাই আসবে না বলে নিজে থেকেই লিজা তাকে মুক্তি দিয়ে দেয়। সেই থেকে আজো তার দিন কাটছে বাপের বাড়ি।
বয়সের সাথে সাথে সবকিছু এখন সে বুঝতে পারে, কিন্তু কি করবে সে? লিজা ভাবে মেয়েরা কতো অসহায় কতো দুর্বল। আসলেও অনেক কিছু করা সম্ভব হয় না। মনে পড়ে মায়ের কথা, কিন্তু তার অপরাধ কি? এই সমাজ ব্যবস্থার এমন ধারা কেনো? এর কি কোন পরিবর্তন নেই? লিজার জীবনে আজ সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ মিলিয়ে এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে না পারছে এগুতে না পারছে পিছাতে। অসহ্য যন্ত্রণার নীল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে সে। কি করতে পারে সে, তার অপরাধ সে একজন নারী।
যে জীবন শুরু হতে না হতে ভেঙে গেলো, সে জীবনে কেনোই বা বেঁচে থাকা। যে জীবনে আছে সুখ, আছে ¯েœহ-ভালোবাসার গান, সে জীবন তো তার নয়। এতো বড় পৃথিবীতে আজ সবার মাঝে থেকেও সে বড় একা। না পেতে পেতে এখন তার মনটা বিষিয়ে ওঠেছে, পারে না সে নিজেকে সব সময় সংযত রাখতে। সে পারছে না আলাদা কিছু একটা নিয়ে বেঁচে থাকতে। তারপরেও জীবন নামের শব্দটার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সে। তার জীবনে নেই কোন ¯েœহ ভালোবাসা, নেই কোন পূর্ণতা, নেই কোন পরিতৃপ্তি। চাইলেই তো সব পাওয়া যায় না। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস।
এ জন্য দায়ী কে? তার কর্ম, না তার জন্ম, না তার আদৃষ্ট, কোনটা দায়ী? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অসম্ভব জেনেও সে প্রশ্নের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। রূপ রস গন্ধে ভরা পৃথিবীটা কেনো এতো শূন্যতায় ভরা। ক্লান্ত অসহায় জীবন নিয়ে এভাবে আর কতো পথ তাকে চলতে হবে। সে নিজেই জানে না।
তবুও জীবন এগিয়ে যাবে, তার নিজস্ব গতিতে। যে গতিকে রুখবার সাধ্য কারো নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT