মহিলা সমাজ

নরকের রাণী

সারাহ্ জাহান মোমতাহীনাহ্ জুঁই প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০১-২০১৯ ইং ০০:৪৭:২৬ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

ম্যাজেন্টা রঙের সার্টিনের বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় অ্যালেক্সা। হাতে লাল ভেলভেটের মতো রক্ত লাগানো হৃদপি-টি, যা কিনা আনা ব্লেইকের। শিশুদের মুখে যেমন খাবার লেগে থাকে, তেমনি অ্যালেক্সার মুখে আনার হৃদপিন্ডের লাল রক্ত লেগে রয়েছে। এই আনা সেই মেয়ে, যার শরীরের রক্ত কিনা তাজা লাল কুমারীর রক্ত। নরকের দেবী এই অ্যালেক্সা, যে কিনা আজকের এই বসন্তের শেষার্ধের সন্ধ্যায় নিজ প্রাসাদের বেডরুমের সার্টিনের বিছানায় আধশোয়া হয়ে আরাম করে অল্প বিষণœতা মনে নিয়ে আনার হৃদপি-টি খাচ্ছিলো। কেন তার মনে এই বিষণœতার উদ্রেক হলো তা অ্যালেক্সা নিজেও জানে না। কোনদিন তো এমন হয়নি। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত, না-তা হতে পারে না; এ অসম্ভব। আর চিন্তা করতে পারে না সে। আজ প্রায় তেতাল্লিশ হাজার বছর ধরে চলে আসছে অ্যালেক্সার এই কুমারীত্ব ও যৌবন ধরে রাখার খেলা; অন্যভাবে বলা যায়, উষ্ণ রক্ত ও মাংস ভক্ষণের ব্রত।
অ্যালেক্সা যে দেখতে খুব খারাপ তা নয়। তার গায়ের রং শ্বেত পাথরও বাটারের মিশ্রণের মতো হলুদাভ সাদা, কালো লম্বা ঘন চুল, নীলা পাথরের মতো চোখ, লাল রুবির মতো ঠোঁট, শুধু তার দাঁতগুলোই তার বীভৎসতার পরিচায়ক। তার দাঁতগুলো হিং¯্র সার্ক মাছে মতো চোখা চোখা, যেগুলো আজ তেতাল্লিশ হাজার বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মর্ত্যবাসী কুমারীর শরীরের অজস্য রক্ত-মাংস-হাড় কামড়ে কামড়ে ছিঁড়েছে, খেয়েছে, শোষণ করে নিয়েছে।
বসন্তের এই সন্ধ্যায় আজ অ্যালেক্সা খুব বেশি দুঃশ্চিন্তায় নিমগ্ন। চিন্তিত অবস্থায়ই সে তার বিশ্বস্ত সেক্রেটারী হিভাকে ডেকে আনলো। হিভার মুখেও গভীর দুঃশ্চিন্তার ছাপ। দুঃশ্চিন্তার কারণ সে অ্যালেক্সাকে জানালো। কারণটা হলো, আজ তেতাল্লিশ হাজার বছরের মধ্যে এই প্রথম অ্যালেক্সার মদের বিশাল কাঁচের বোতলের মধ্যে সংরক্ষিত গত তেতাল্লিশ হাজার বছরের জমানো কোটি কোটি কুমারীর রক্ত হঠাৎ করে শুুকিয়ে যেতে শুরু করছে। এই বিষয়টি অ্যালেক্সাকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুললো। সব কিছু এমন হচ্ছে কেন? কিন্তু অ্যালেক্সা এত সহজে ভয় পাওয়ার পাত্রী নয়। আজ তেতাল্লিশ হাজার বছর ধরে সে শয়তানের এই নরককে শয়তানেরই আদর্শ অনুসারে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে আসছে; সেই অ্যালেক্সা আজ ভয় পাবে কেন? শয়তানের এই নরক যে তারই জন্মস্থান। শয়তানের উত্তরসূরি বলতে এখন এই নরকে সে-ই একমাত্র নারী। নারী বললে ভুল হয়, কারণ এই অ্যালেক্সা মর্ত্যবাসী সাধারণ নারীদের মতো নয়। সে যে রক্ত, মৃত্যু ও নৃশংসতার রাণী। অন্ধকার পৃথিবীর, পৃথিবীর বললে ভুল হয়; অন্ধকারে আচ্ছন্ন আগুনের লেলিহান শিখাময় এই নরকের স¤্রাজ্ঞী। সে চিরকুমারী। অ্যালেক্সার জন্মের ইতিহাস খুব ভয়াবহ। আজ থেকে তেতাল্লিশ হাজার বছর আগে মর্ত্যরে এক নবজাতক মেয়ে শিশুর রক্তমাখা হৃদপিন্ডের সাথে নরকের মাটি মিশিয়ে মূর্তি বানিয়ে স্বয়ং শয়তান নিজ বাঁশির মাধ্যমে শিষ দিয়ে তাতে প্রাণসঞ্চার করিয়ে অ্যালেক্সাকে জীবন দিয়েছিলো। তাইতো অ্যালেক্সার শরীরে শয়তানের প্রাণ। শয়তান অ্যালেক্সাকে প্রাণ দিয়ে তাকে প্রথমে নিজ কন্যা বলে সম্বোধন করেছিল। এ হিসেবে নরকের শয়তানের কন্যা এই অ্যালেক্সা। চির কুমারী, চির যুবতী থাকার তীব্র বাসনায় সে তাই বেছে নিয়েছে মর্ত্যবাসী সুন্দরী কুমারী মেয়েদের রক্ত, মাংস, হৃদপি- খাওয়ার ব্রত। এই অ্যালেক্সা আজ তেতাল্লিশ হাজার বছর ধরে মর্ত্যবাসী সুন্দরী কুমারী মেয়েদের রক্ত-মাংস-হৃদপিন্ড ভক্ষণ করে আসছে। এতে তার কুমারীত্ব দৃঢ় হয়, তারুণ্য-যৌবন বৃদ্ধি পায় এবং তা চিরকালীন। সেই পিশাচিনী অ্যালেক্সা আজ ভয় পেযে কুঁকড়ে যাচ্ছে কেন? না, নরক রাণী অ্যালেক্সা ভয় পাবে না। কারণ আজ তেতাল্লিশ হাজার বছর ধরে সে তার পিতা ও গুরু শয়তানের পথ অনুসরণ করে নরকের দুর্দান্ত সব পিশাচ, প্রেত, দানবদের তার দাস বানিয়ে আসছে। তার রাজত্বেই আজ তেতাল্লিশ হাজার বছর ধরে নরকে চলছে নতুন মাত্রার পাপাচার, অন্ধকার-অশুভ শক্তির খেলা। অ্যালেক্সা নিজের এই সক্ষমতার কথা চিন্তা করেই মন থেকে সব দুঃশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আনা ব্লেইকের হৃদপিন্ডের শেষ অংশটুকু খেয়ে ফেললো। তারপর হিভার দিকে তাকিয়ে তার বীভৎস দাঁতগুলো বের করে অল্প হাসলো। লক্ষ্য করলো, হিভা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সে কিছু বলতে চাচ্ছে। অ্যালেক্সা তাকে বললো, “নতুন কে কে মর্ত্য থেকে আমার জন্য পাপের উপদেশ নিয়ে এসেছে?” হিভা তখন ভ্রƒ সামান্য কুঞ্চিত করে বললো, “মর্ত্য থেকে আপনার জন্য পাপ নিয়ে আর্থার নামক এক ব্যক্তি এসেছে। তবে দুঃশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, লোকটির চেহারার সাথে আনার চেহারার কিছুটা মিল রয়েছে।” এ কথা শুনে অ্যালেক্সা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। সেই সাথে তার মনে আসতে লাগলো নানা অশনি সংকেত। তবুও সে জোর করে মন থেকে এসব বাদ দেওয়ার চেষ্টা করলো।
অ্যালেক্সার জন্য মর্ত্য থেকে পাপ নিয়ে আসার ব্যাপারটা নতুন নয়। তার জন্মের পর থেকেই তার পিতা শয়তানের নির্দেশে মর্ত্য থেকে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ব্যক্তি তার জন্য পাপ নিয়ে আসতো। তারপর সে যখন একটু বড় হলো, তখন এই অনন্ত নরকের সব অধিকার, রাজত্ব সে লাভ করলো। তখন থেকে তার নির্দেশেই মর্ত্য থেকে প্রতিদিনই বেশকিছু ব্যক্তি তার জন্য নিত্য নতুন পাপ ও পাপের উপদেশ নিয়ে আসে। এর মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কিচু লোক আসে, যাদের মধ্যে কিছুটা সততার ভাব, পুণ্যের ছিটে থাকে। তাদের পাপ উপদেশ অ্যালেক্সা কখনই গ্রহণ করে না। তবে এসব লোকেরা যে তার জন্য খুব বেশি বিপজ্জনক তা নয়। এই অ্যালেক্সা সততা, পুণ্য, ধার্মিকতা, নিয়মানুবর্তিতার তীব্র শত্রু। আবেগ, ভালোবাসা, সহানুভূতিকে দুঃস্বপ্নের চেয়েও বেশি ভয় পায় সে। নরকের এই অনন্ত মহাকালে তার কোনো মৃত্যু, ধ্বংস বা পতন নেই। এই অ্যালেক্সাকে ধ্বংস করার একটাই উপায়, আর তা হলো তার মাঝে মনুষ্যসুলভ আবেগ ও বেদনাবোধের সঞ্চার করা। আবেগ ও বেদনাবোধই নরকের রাণী অ্যালেক্সাকে ধ্বংসের একমাত্র উপায়। যাই হোক, সে হিভাকে বললো, “এখানে পাঠাও এই আর্থারকে”। হিভা তখন তার আদেশ অনুযায়ী লোকটিকে তার কাছে পাঠালো। লোকটিকে দেখেই কেন জানি তার সমস্ত শরীরে ভয়ের শীতল ¯্রােত বয়ে গেল। কিন্তু কেন? আর্থারের চেহারার সাথে আনা ব্লেইকের চেহারার সামান্য মিল নির্ণয় করলো অ্যালেক্সা। তাতে তার ভয়ের মাত্রা আরও বেড়ে গেলো। কিন্তু সে জোর করে মন থেকে সব ভয় দূর করে আর্থারকে বললো, “তোমার বক্তব্য শুরু করো আর্থার”। আর্থার তখন তাকে চমকে দিয়ে বললো, “ হে মহামান্য অ্যালেক্সা, আমি আমার বক্তব্য শুরুর আগে আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি যদি দয়া করে আমাকে এই অনুমতি দেন, তাহলে আমি বড়ই উপকৃত হবো”। অ্যালেক্সা তখন লোকটিকে প্রশ্ন করার অনুমতি দিলো।
আর্থার: হে মহামান্য অ্যালেক্সা, এই নরক এবং এই পাপ দিয়ে গড়া প্রাসাদ যদি কোন এক কালে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আপনার কেমন অনুভূতি হবে?
অ্যালেক্সা : এতে আমি খুবই ব্যথিত হব, কষ্ট পাব।
আর্থার : তাহলে এবার আপনি উত্তর দিন, আপনি যে আমার মেয়ে আনাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে খেয়েছেন, তাতে কী আমি ব্যথিত হইনি?
অ্যালেক্সা তখন আর্থারের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ তার কন্যা বিয়োগের দুঃখে সামান্য ব্যথিত হয়ে পড়লো এবং তার ধূর্ত নীল চোখ দিয়ে এক ফুঁটো অশ্রু গড়িয়ে পড়লো; আর তখনই বুঝতে পারলো মহা ভুল করে সে নিজের ধ্বংসকে নিজেই ডেকে এনেছে। নরকের রাণী অ্যালেক্সার মনে আজ মর্ত্যরে আনা ব্লেইকের পিতার কথায় আবেগ ও বেদনা বোধের সঞ্চার হয়েছে, এমনকি তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটো অশ্রুও বেরিয়েছে। তার চোখের পানি গাল গড়িয়ে পড়ার আগেই শয়তানের বিশাল নরক ও অ্যালেক্সার প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে গেলো। একই অবস্থা অ্যালেক্সার নিজের ব্যাপারেও ঘটলো। আজ তেতাল্লিশ হাজার বছর পর নরকের রাণী অ্যালেক্সার পতন ঘটলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT