ইতিহাস ও ঐতিহ্য

স্তম্ভবিহীন মসজিদ

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০১-২০১৯ ইং ০০:৪৯:৫৩ | সংবাদটি ৪৪ বার পঠিত

বাংলাদেশকে মসজিদের দেশ বলা হলে ভুল হবেনা। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ রয়েছে। দেশের এমন কোন একটি গ্রাম, মহল্লা বা এলাকা পাওয়া যাবেনা যেখানে মসজিদ নেই। কোন কোন এলাকা বা পাড়ায় একাধিক মসজিদ রয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা কখনো নিজ উদ্যোগে আবার কখনো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ইদানিং ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক আকর্ষনীয় মসজিদও গড়ে উঠেছে।
দেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য মসজিদ গড়ে উঠলেও স্তম্ভবিহীন (মসজিদের মধ্যখানে পিলার ছাড়া) মসজিদ কয়টি আছে সঠিকভাবে বলা যাবেনা। প্রতিটি মসজিদেই স্তম্ভ বা পিলার আছে। সাধারণত মসজিদ যত বড় হয় পিলার ততবেশি হয়ে থাকে। মসজিদের ভেতরে পিলার না থাকলে ছাদ নীচের দিকে ভেঙ্গে বা ঝুলে পড়তে পারে। তাই মসজিদ বা বড় কোন ঘর বা হলরুম করতে হলে অবশ্যই মাঝখানে পিলার থাকা চাই।
কিন্তু কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় একটি মসজিদ রয়েছে যাতে চার দেওয়াল মধ্যখানে আর কোন পিলার বা স্তম্ভ নেই। আবার মসজিদটি একেবারে ছোটও নয়। মসজিদের ভেতরে ২৩টি সারি বা কাতার রয়েছে। প্রতিটি কাতারে ১২০ জন মুসল্লী অনায়াসে দাঁড়াতে পারেন। এই হিসেবে ২৭৬০ জন মুসল্লী একসাথে মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারেন। চার দেয়াল ছাড়া এই বিশাল মসজিদের ভেতরে আর কোন পিলার বা স্তম্ভ নেই। মুসল্লীরা যে যেখানেই অবস্থান করুননা কেন ইমাম সাহেবকে বাধাহিনভাবে দেখতে পারেন এবং ইমামের বয়ান ও ওয়াজ শুনতে পারেন। অনেক বড়বড় মসজিদের মধ্যে পিলারের জন্য মুসল্লীদের কেউ কেউ ইমামকে সরাসরি দেখতে পারেননা। চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত এই মসজিদে সে সমস্যা নেই। ইমাম সাহেবও দুই হাজারেরও বেশী মুসল্লীকে অনায়াসে সরাসরি দেখতে পারেন। বিশাল এই মসজিদের ছাদে রয়েছে ৮৪টি সিলিং ফ্যান। টিউব লাইট রয়েছে ৩৮টি। ছোট দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি রয়েছে ৩৮টি। এতগুলো ফ্যান ও বাতি বুকে নিয়ে মসজিদের ছাদ কিভাবে বছরের পর বছর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা এক অবাক করা ব্যাপার। মোজাইক করা মসজিদের মেঝে বসলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। শীতাতপ ব্যবস্থা না থাকলেও মসজিদের সামনে ১৬টি এবং দুই পাশে ১৮টি জানালা রয়েছে। জানালা গুলো সব সময় খোলা থাকে। জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস সবসময় মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে। আর উপরে সিলিং ফ্যানতো অবিরাম ঘুরছেই। মসজিদে প্রবেশ করার জন্য তিনটি ফটক বা গেইট রয়েছে। এই মসজিদে নামাজ আদায় করলে মনে এক অনাবিল প্রশান্তি পাওয়া যায়। জুমার নামাজের সময় মসজিদ কানায় কানায় ভরে যায়। অনেক সময় মসজিদের ভেতরে জায়গা না হলে বারান্দায়ও ৫শ মুসল্লী একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে বারান্দায় পুরো এলাকা থেকে ইমাম সাহেবকে স্বচ্ছন্দে দেখার সুযোগ নেই। অবশ্য ইমামকে চোখে দেখা না গেলেও মাইক্রোফোনে তাঁর কন্ঠ পরিষ্কার শোনা যায়।
বলা হয়ে থাকে স্তম্ভবিহীন এতবড় মসজিদ বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। দেশে এর চেয়ে আরো অনেক বড় মসজিদ থাকতে পারে। বহুতল ভবনের মসজিদও দেশে রয়েছে। কিন্তু স্তম্ভবিহীন এতবড় মসজিদ দেশের আর কোথাও আছে কিনা সঠিক জানা যায়নি।
কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপার মিল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই মসজিদের দেখভাল করেন। কেপিএম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ হিসেবে এই মসজিদ পরিচিত। মাওলানা মোঃ এটিএম আব্দুল্লাহ বর্তমানে মসজিদে ইমামতি করেন।
দাউদ গ্রুব অব ইন্ডাষ্ট্রিজের চেয়ারম্যান আহমেদ দাউদ এইচ কে সাহেবের মাতা মোহতরামা হাজীয়ানী হানিফ বাঈ ১৯৬৭ সালের ৮ ডিসেম্বর (৫ রমজান ১৯৮৭ হিজরী) কেপিএম আবাসিক এলাকায় এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই সময় কর্ণফুলী পেপার মিল দাউদ গ্রুপের অধীনস্থ ছিল। সেই দাউদ গ্রুবের চেয়ারম্যান ছিলেন আহমেদ দাউদ। আহমেদ দাউদের মা হাজীয়ানা হানিফা বাঈ নিজ হাতে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন। এই বিশাল মসজিদের ছাদ কেমন তা নিচ থেকে দেখার কোন উপায় নেই। এতবড় ছাড় ভিমের উপর ঝুলে আছে সেটাও দেখা যায়না। প্রতিষ্ঠার পর অনেকবার ছোট বড় আকারের ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে। কিন্তু মসজিদের কোন ক্ষতি হয়নি।
কালের বিবর্তনে এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় মসজিদের সৌন্দর্য্যে আস্তে আস্তে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। অনেক স্থানে আস্তর খড়ে পড়ছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুঁইয়ে টপটপ করে ভেতরে বিভিন্ন স্থানে পানি পড়ে। বারান্দায় সৌন্দর্য্যময় লাল রঙের কারুকাজ করা সিরামিক গুলো ভেঙ্গে পড়ছে। কেপিএম ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রায় সময় সংস্কার করে। কিন্তু সংস্কার কাজ বেশি সময় টেকানো যাচ্ছেনা। ভেঙ্গে যাওয়া সিরামের পাথর পুনস্থাপনের জন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। আস্তে আস্তে মসজিদের সৌন্দর্য্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তারপরও এই মসজিদটি এখন পর্যন্ত স্তম্ভবিহীন সেরা মসজিদ হিসেবে টিকে আছে। এই মসজিদে নামায আদায় করার জন্য দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসেন। এখানে নামাজ পড়ে যেমন শান্তি তেমনি মসজিদটি এক নজর দেখাও চোখের শান্তি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অতীত ও বর্তমান
  • নাটোরের জমিদার রানী ভবানী
  • ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সাহিত্য সাময়িকী নিশানা
  • জলসার একাল-সেকাল
  • স্তম্ভবিহীন মসজিদ
  • বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা
  • হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ
  • গ্রামের কথা
  • প্রাচীন গড় কিভাবে গৌড় হল
  • চায়ের দেশ পর্যটকদের ডাকে
  • মুক্তিযুদ্ধকালীন সিলেট অঞ্চলের পত্রপত্রিকা
  • স্মৃতি ও চেতনায় বঙ্গবন্ধু
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • Developed by: Sparkle IT