ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সাহিত্য সাময়িকী নিশানা

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০১-২০১৯ ইং ০০:৫৭:৪৯ | সংবাদটি ১৩৪ বার পঠিত

ঊনিশ শ’ সাতচল্লিশে যখন দেশ ভাগ হলো, তারও আগে সিলেটে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ ছিলো। উচ্ছাস-আনন্দ-সম্মানের সাথে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথকে, ১৯২৬, ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে সিলেটবাসীর বরণের মধ্য দিয়ে সিলেটবাসীর সাংস্কৃতিক চেতনা অনুভব করা যায়। বিভিন্ন লেখক-সংস্কৃতিকর্মীদের বর্ণনায় দেখা যায়-এই দুই কবির সিলেট সফরের সময় সিলেট যেন ছিলো উৎসবের শহর। এর কিছুদিন পরই, খুবই কাছাকাছি সময় গড়ে উঠেছিলো দুটো সংগঠন, ১৯৩৫-এ ‘শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষদ’ আর ১৯৩৬-এ ‘কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ’। সাহিত্য পরিষদের মুখপত্র ছিলো ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’, আর মুসলিম সাহিত্য সংসদের মুখপত্র ছিলো মাসিক ‘আল্ ইসলাহ’। এদুটো সংগঠন প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর ১৯৩৯-এ গঠিত হয় ‘বাণীচক্র’ নামের একটি সাহিত্য সংগঠন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ‘বাণীচক্র’ ‘কবিপ্রণাম’ নামে একটি উন্নতমানের রবীন্দ্র-স্মারকগ্রন্থ বের করেছিলো। ‘বাণীচক্র’ অনেকগুলো শাখার মাধ্যমে তার কার্যক্রম চালাতো। এগুলো ছিল বীথিকা, রবিচক্র, নাট্যশ্রী (নবনাট্যচক্র) প্রভৃতি। ১৯৪৩-৪৪-এ গঠিত হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’, গণনাট্য সংঘ প্রভৃতি। এছাড়াও ছিল উন্নতমানের কিছু পত্রপত্রিকা ‘শ্রীভূমি’ (১৯১৫), কমলা (১৯২৪), বলাকা (১৯৩৭) প্রভৃতি। প্রফেসর আবুল বশর স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়, নাট্যচর্চায় উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব, সংগঠন, পাঠাগার প্রভৃতি ছিল। খোলা জায়গায় মঞ্চ সাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় নাটক মঞ্চস্থ হত। রাত জেগে পালা গান, কবির লড়াই, যাত্রাগান প্রভৃতির আসর বসত। মোটামুটিভাবে সাতচল্লিশ পর্যন্ত সিলেটে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার একটা সজীব ও প্রাণবন্ত ধারা প্রবহমান ছিল।’ এই সব সংগঠন, সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সিলেটে গড়ে উঠে ‘অগ্রণী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। নাসির এ. চৌধুরী স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘অগ্রণী লেখক ও শিল্পী সংঘ’-এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেনÑখ্যাতনামা রাজনীতিবিদ নূরুর রহমান ও মাহমুদ আলী, বেগম হাজেরা মাহমুদ, আসমা নূরুর রহমান, পীর হবিবুর রহমান, এ.এইচ. সা’আদত খান, মীর্জা হাবিবুর রহমান, শাফাত আহমদ, এডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ, এডভোকেট জালাল উদ্দিন খান, আবু সায়ীদ মাহমুদ, রেজাউল করিম, সুব্রত চক্রবর্তী (নান্টু), আব্দুল গণি, নাজমুল হক, মুজিবুর রহমান, আব্দুল্লাহ হুসাইন সিদ্দিকী, রশীদ আহমদ এবং আবুল বশরসহ অনেকে। তবে এর মধ্যে আমি (নাসির) ও বশরসহ যারা বয়সে তরুণ ছিলাম, তাদেরই উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ছিল বেশি।’ রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, সুকান্ত দিবস, ঘরোয়া আলোচনাসভা, সাহিত্য সভা, নববর্ষ উদযাপন এসবের মাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম চার পাশে ছড়িয়ে পড়ে। সাহিত্য সংস্কৃতি কর্মীদেরকে আন্দোলিত করে। সংঘটি কিছুটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড়াবার পর উদ্যোক্তারা একটা মুখপত্র বের করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। জন্মের বছর খানেকের মধ্যেই অগ্রণী লেখক ও শিল্পী সংঘে’র মুখপত্র হিসেবে মাসিক ‘নিশানা’র আবির্ভাব ঘটে। সেটি ছিলো ১৩৫৮ বাংলার শ্রাবণের (আগস্ট ১৯৫১) এক আবেগমুখর বিকেল।
‘নিশানা’র সাইজ ছিলো ডাবল ডিমাই, প্রতিটি কপির মূল্য ছিলো পঞ্চাশ পয়সা। প্রথম সংখ্যার মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিলো পঞ্চাশ। ‘নিশানা’ ১৩৫৮ শ্রাবণ থেকে ১৩৫৯ শ্রাবণ পর্যন্ত (আগস্ট ১৯৫১ থেকে আগস্ট ১৯৫২) মোট ৮টি সংখ্যা বের হয়েছিলো। ‘নিশানা’র প্রথম সংখ্যায় লেখা হয়েছিলো ‘অগ্রণী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ কোন বিশেষ মতবাদের বাহন নয়’, তবে তাদের পত্রিকাটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মাসিক হিসেবেই পরিচিত ছিল। ‘নিশানা’ সেই সময়ের পুরো পূর্ব-বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি করে, ফলে সারা দেশের প্রগতিশীল মহলের সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলতে পেরেছিলো। ‘নিশানা’য় অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন, অধ্যাপক আবদুল লতিফ চৌধুরী, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, রবীউদ্দিন আহমদ (পশ্চিম বাংলা), প্রজেশ কুমার রায়, আতোয়ার রহমান (রাজশাহী), সুনীল বিকাশ চক্রবর্তী (চট্টগ্রাম), সমরেন্দ্র দত্ত (চট্টগ্রাম), সিরাজুল ইসলাম (চট্টগ্রাম), কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী (চট্টগ্রাম), কুমার কিরণ শংকর মিত্র (চট্টগ্রাম), ইমামুর রশীদ (ময়মনসিংহ), কাজী ফজলুর রহমান (বিশিষ্ট আমলা), শওকত ওসমান, হাসান হাফিজুর রহমান, মুর্তজা বশীর থেকে শুরু করে অনেক নবীন-প্রবীণ কবি সাহিত্যিকদের লেখা ছাপা হয়েছে।
‘নিশানা’র প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যার প্রচ্ছদটা ছিলো শাদামাটা। প্রচ্ছদটি অনেকের পছন্দ হয়নি। তৃতীয় সংখ্যা থেকে মনোরম প্রচ্ছদে ‘নিশানা’ বের হতে থাকে। গোল লাল সূর্যের পটভূমিকায় তিনটি সাদা তারকা ও ধানের ডগা এবং দিগন্তে প্রসারিত পথের নিশানা। সেই প্রচ্ছদটি এঁকেছিলেন আমিনুল ইসলাম, যিনি আজ বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ।
নিশানার পরিচালক ছিলেন নূরুর রহমান (১৯১৮-১৯৯৪) । তিনি ছিলেন মুলত রাজনীতিবিদ, সোহরাওয়ার্দি মন্ত্রীসভায় কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রীও হয়েছিলেন। নুরুর রহমান ছিলেন ‘নিশানা’র প্রাণপুরুষ। শহরের নয়াসড়কে তার ভাড়াটে বাসায় ছিলো ‘নিশানা’র অফিস। আসলে নূরুর রহমানের বাসা ছিল সেই সময়ের সকল রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও সংশ্লিষ্টদের মিলনস্থল। ‘যুবলীগ’, ‘ছাত্র ফেডারেশন’, আওয়ামী মুসলিম লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, আন্ডার গ্রাউন্ড কম্যুনিস্ট পার্টি প্রভৃতি মোটামুটি সকল দলমতের নেতাকর্মীদের এখানে নিয়মিত সমাগম হত।
নিশানা’র সম্পাদক হবিবুর রহমান, তখনো তিনি ‘পীর হবিবুর রহমান’ নামে পরিচিত হননি। তিনিও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও তার ছিলো লেখালেখির সাবলীল হাত। ‘নিশানা’র প্রায় প্রতি সংখ্যায়ই তিনি ‘চলতি পথে’, ‘ঘটনা ¯্রােত’ প্রভৃতি কলামে সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে কখনো স্বনামে, কখনো ‘নেগাবান’ ছদ্মনামে কলামে লিখেছেন। ‘নিশানা’র প্রথম সংখ্যা থেকে ৬ষ্ঠ সংখ্যা পর্যন্ত তিনি ছিলেন সম্পাদক। তবে পরবর্তীতে রাজনীতিতে বেশি জড়িয়ে পড়ায় তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
নিশানা’র ৭ম, ৮ম ও ১ম বর্ষের সমাপ্তি সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন নূরুর রহমান, সহ-সম্পাদক মো. আবুল বশর ও নাসির উদ্দিন আহমদ। মীর্জা হাবিবুর রহমান ছিলেন ‘নিশানা’র কমার্শিয়াল ম্যানেজার পর্যায়ের। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, গ্রাহক সংগ্রহ, চাঁদা ও টাকা কড়ি আদায়ের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। ‘নিশানা’ পত্রিকাটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যা (ভাদ্র আশ্বিন) সংখ্যা, চতূর্থ ও পঞ্চম সংখ্যাও (কার্তিক অগ্রহায়ণ) যুগ্মভাবে বের হয়েছিলো।
‘নিশানা’র সমকালীন সাহিত্যপত্রিকা ছিলো চট্টগ্রাম থেকে বের হওয়া মাহবুবুল আলম চৌধুরী সম্পাদিত ‘সীমান্ত’, চট্টগ্রামের ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘পরিচিতি’, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘অগত্যা’, ওপার বাংলার মাসিক ‘পরিচয়’ ও ‘নতুন সাহিত্য’ প্রভৃতি।
‘নিশানা’য় গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, আন্তর্জাতিক বিষয়, বইপুস্তক, সাহিত্য সংস্কৃতি, শান্তির স্বপক্ষে, সাহিত্য সমালোচনা, ছায়াছবি প্রভৃতি বিভাগে লেখা বের হত। ‘নিশানা’ অনেকটা তৎকালীন পশ্চিম বাংলার ‘নতুন সাহিত্য’ ধাঁচের সাহিত্য পত্রিকা ছিল।
অগ্রণী’র কার্যক্রম পঞ্চাশ থেকে চুয়ান্ন পর্যন্ত পরিচালিত হয়। নিশানার প্রথম বর্ষের সমাপ্তি সংখ্যার কলেবর ছিলো বেশ বড়ো। অনেকটা বিশেষ সংখ্যার মতো তা বের হয়েছিলো। ‘নিশানা’ আর বের হয়নি। নিশানা’র যবনিকাপাত প্রসংগে নিশানা’র সহ সম্পাদক মো. আবুল বশর লিখেছেন, ‘ প্রথম পর্যায়ের ইতি এখানেই ঘটে। এরপরে নিশানা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একেত, আমরা যারা এর সঙ্গে জড়িয়েছিলাম, তারা নানাদিকে ছড়িয়ে ছিটকে পড়লাম। আর্থিক অনটন দেখা দেয়। সমাজ পরিবেশ নিশানার প্রতি তেমন অনুকুল ভাবাপন্ন ছিল না। বিজ্ঞাপন ইত্যাদিও তখন এত ছড়াছড়ি ছিল না। যদিও পরবর্তীকালে ‘নয়া নিশানা’ নামে এর দ্বিতীয় পর্যায় হিসাবে আরো বছর খানেক চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ‘নিশানা’ এখন দূর অতীতের স্মৃতিমাত্রও। সে স্মৃতি কলরব মুখরিত আমাদের যৌবন কৈশোরের কর্ম চঞ্চল দিনগুলির উজ্জল ফসলরূপে স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে।’ (সিলেট প্রেসক্লাব ফেলোশিপ ২০১৮ প্রবন্ধ)

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • Developed by: Sparkle IT