ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৯ ইং ০০:০৩:৫৫ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
শোক-সন্তাপ থেকে শুধু তারাই মুক্তি পেতে পারে যারা আল্লাহর বাধ্য ও অনুগত : ‘যারা আমার হেদায়েতের অনুসরণ করবে; তাদের আশঙ্কা নেই এবং কোন চিন্তাও করতে হবে না।’ এ আয়াতে আসমানী হেদায়েতের অনুসারিগণের জন্য দু’ধরনের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথমতঃ তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং দ্বিতীয়তঃ তারা চিন্তাগ্রস্ত হবে না।
‘খাউফ’ আগত দুঃখ কষ্টজনিত আশঙ্কার নাম। আর ‘হাযান’ বলা হয়, কোন উদ্দেশ্য সফল না হওয়ার কারণে সৃষ্ট গ্লানি ও দুশ্চিন্তাকে। লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে, এ দু’টি শব্দে যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে এমনভাবে কেন্দ্রীভুত করে দেয়া হয়েছে যে, স্বাচ্ছন্দ্যের একবিন্দুও এই বাইরে নেই। অতঃপর এ দু’টি শব্দের মধ্যে তত্ত্বগত ব্যবধানও রয়েছে। এখানে ‘ফালা খাউফুন আ’লাইহিম’ এর ন্যায় ‘লা হাযান আ’লাইহিম’ না বলে ক্রিয়াবাচক শব্দ ‘ওলা হুম ইয়াহযানুন’ এর ব্যবহারের মধ্যে এ ইঙ্গিতই রয়েছে যে, কোন উদ্দেশ্য সফল না হওয়া জনিত গ্লাসি ও দুশ্চিন্তা থেকে শুদু তাঁরাই মুক্ত থাকতে পারেন, যারা আল্লাহর ওলীর স্তরে পৌঁছাতে পেরেছেন। যারা আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েতসমূহের পূর্ণ অনুসরণকারী, তাঁরা ব্যতিত অন্য কোন মানুষ এ দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। তা সে সারা বিশ্বের রাজাধিরাজই হোক, বা সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তিই হোক। কেননা, এদের মধ্যে কেউই এমন নয়, যার স্বভাব এ ইচ্ছাবিরুদ্ধ কোন অবস্থার সম্মুখীন হবে না এবং সেজন্য দুশ্চিন্তায় লিপ্ত হবে না। অপরপক্ষে আল্লাহর ওলিগণ নিজের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষাকে আল্লাহর ইচ্ছার মাঝে বিলীন করে দেন। এজন্য কোন ব্যাপারে তাঁরা সফলকাম না হলে মোটেও বিচলিত হন না। কুরআন মজিদের অন্যত্র একথা প্রকাশ করা হয়েছে যে, বিশিষ্ট জান্নাতবাসিগণের অবস্থা হবে এই যে, তাঁরা জান্নাতে পৌঁছার পর আল্লাহর সেসব নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করবেন, যার দ্বারা তিনি তাদের সন্তাপ ও দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন।
আয়াত সমূহের পূর্বাপর সম্পর্ক :
সূরা বাক্বারাহ কুরআন সংক্রান্ত আলোচনা দিয়ে আরম্ভ করা হয়েছে এবং তাতে বলে দেয়া হয়েছে যে, কুরআনের হেদায়েত যদিও গোটা সৃষ্টজগতের জন্য ব্যাপক, কিন্তু এর দ্বারা শুধু মুমিনগণই উপকৃত হবে। এর পরে যারা এর প্রতি ঈমান আনেনি, তাদের জন্য নির্ধারিত কঠিন শাস্তির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে এক শ্রেণি ছিল সরাসরি কাফের ও অবিশ্বাসীদের। অপর একটা শ্রেণি ছিল মুনাফিক ও কপটদের।
জ্ঞাতব্য :
সূরা বাক্বারাহ যেহেতু মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে, সুতরাং এতে মুশরিক ও মুনাফিকদের বিবরণের পর যে কোন আসমানী গ্রন্থে বিশ্বাসী আহলে কিতাবদেরকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে সম্বোধন করা হয়েছে। এ সূরার চল্লিশতম আয়াত থেকে আরম্ভ করে একশত তেইশতম আয়াত পর্যন্ত শুধু এদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। সেখানে তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রথমে তাদের বংশগত কৌলিন্য, বিশ্বের বুকে তাদের যশ-খ্যাতি, মান-মর্যাদা এবং তাদের প্রতি আল্লাহ পাকের অগণিত অনুকম্পাধারার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাদের পদচ্যুতি ও দুষ্কৃতির জন্য সাবধান করে দেয়া হয়েছে এবং সঠিক পথের দিকে আহবান করা হয়েছে। প্রথম সাত আয়াতে এসব বিষয়েই আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে প্রথম তিন আয়াতে ঈমানের দাওয়াত এবং চার আয়াতে সৎকাজের শিক্ষা ও প্রেরণা রয়েছে। তৎপর অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। বিস্তারিত সম্বোধনের সূচনা ও সমাপ্তিপর্বে গুরুত্ব সৃষ্টির উদ্দেশে যে ‘ইয়াবানী ইসরাঈলা’ (হে ইসরাঈলের বংশধর) শব্দসমষ্টি দ্বারা সংক্ষিপ্ত সম্বোধনের সূচনা হয়েছিল, সেগুলোই পুনরুল্লেখ করা হয়েছে।
‘ইয়াবানী ইসরাঈলা’ এখানে ইসরাঈল (ইসরাঈল) হিব্রু ভাষার শব্দ। এর অর্থ ‘আব্দুল্লাহ’ (আল্লাহর দাস) ইয়া’কুব (আ.) এর অপর নাম। ওলামায়ে কেরামের মতানুসারে হুযুরে পাক (সা.) ব্যতিত অন্য কোন নবির একাধিক নাম নেই। কেবলÑ হযরত ইয়াকুব (আ.) এর দু’টি নাম রয়েছেÑ ইয়া’কুব ও ইসরাঈল। কুরআন পাক এক্ষেত্রে তাদেরকে বনী-ইয়াকুব বলে সম্বোধন না করে বনী-ইসরাঈল নাম ব্যবহার করেছে। এর তাৎপর্য এই যে, স্বয়ং নিজেদের নাম ও উপাধি থেকেই যেন তারা বুঝতে পারে যে, তারা ‘আব্দুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর আরাধনাকারী দাসের বংশধর এবং তাদের তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতে হবে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT