উপ সম্পাদকীয়

মাদকের দংশনে বিপন্ন তারুণ্য

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৯ ইং ০০:০৪:২২ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

বর্তমান সমাজে মাদকদ্রব্য সেবন একটি প্রচলিত কুপ্রবৃত্তি। দিনে দিনে এ প্রবৃত্তি ক্রমশ সর্বত্র বিস্তার লাভ করছে। মানুষ যতই শিক্ষাদীক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হচ্ছে, ততই আধুনিকতার অনুসরণ করছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, রকমারি অনুষ্ঠানে মাদকদ্রব্য সেবন আজকাল আধুনিকতা এবং শৌখিনতায় রূপ নিচ্ছে। অথচ শিক্ষিত মানুষ একথা জানেন যে, নেশা করা একটি ক্ষতিকর অভ্যাস। এটা ভাল মানুষকে পাগলের স্তরে নিয়ে যায়, সুস্থ-সবল ব্যক্তিকে অসুস্থ-দুর্বল করে, আর চরিত্রবান মানুষকে করে চরিত্রহীন। এছাড়া আর্থিক ক্ষতি, সামাজিক অমর্যাদা এবং পারিবারিক গোলযোগ তো লেগেই থাকে।
মাদকদ্রব্যের ব্যবহার যতই বাড়ছে পরিবার, সমাজ এবং জাতির ক্ষতির পরিমাণ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। খাদ্য বা পানীয় হিসাবে পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই, যা মানুষের আর্থিক, মানসিক, সামাজিক এবং শারীরিক দিক দিয়ে এত বেশি ক্ষতি করতে পারে। নেশাদ্রব্য সেবনে কিছু সময়ের জন্য শরীরে উত্তেজনা বেড়ে থাকে এবং মনও প্রফুল্ল হয়। কিন্তু তা যেমন ক্ষণস্থায়ী, তেমনি নিরর্থক। তবুও মানুষ নেশার জন্য পাগল হয়ে উঠে। এ নেশাই মানুষের কর্মশক্তি হ্রাস করে। সে সঙ্গে চিন্তাশক্তি হ্রাস করে, চেতনা ও বিবেচনাশক্তির অভাব দেখা দেয়। সর্বোপরি মানুষকে করে চরিত্রহীন। মাতাল-চরিত্রহীনদের সমাজের ছোট-বড় সবাই ঘৃণা করে। অবস্থাস¤পন্ন, উচ্চশিক্ষিত এবং অভিজাত পরিবারের লোক হলেও চরিত্রহীনকে কেউ ভাল মানুষের স্তরে স্থান দেয় না।
টানা মদ খাওয়ার ফলে শরীরে নানা ধরণের রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়। স্নায়ু দুর্বল হয়, পেটে নানারকম রোগ বাসা বাঁধে, মূত্রাশয়ে রোগ জšে§, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি জটিল রোগের উৎপত্তি হয়। এতে অনেকে অকালে-বেঘোরে প্রাণ হারান। বিষাক্ত মদ খেয়ে বিভিন্ন স্থানে এক সঙ্গে অনেকের অকাল এবং করুণ মৃত্যুর খবর হর-হামেশাই পাওয়া যাচ্ছে।
হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্ট,বৌদ্ধ-সব ধর্মের প্রবর্তক এবং প্রচারকেরা কঠোর ভাষায় নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন নিষেধ করেছেন। কারণ তা সেবন করলে মাতা- পিতা, ছেলে- মেয়ে, স্বামী- স্ত্রী এবং পরিবার- পরিজন স¤পর্কে অনেক সময় সম্যক জ্ঞান থাকে না। সমাজে নানা রকম অনাচার দেখা দেয়। উত্তেজনার বশবর্তী হলে মানুষ শুভ কাজের পরিবর্তে কুকাজ করতে দ্বিধা করে না। এছাড়া ধর্ম- কর্মে মতি আসে না। এসব কারণেই নেশা করা সব ধর্মেই নিষেধ। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মোহাম্মদ (সা.) মাদকদ্রব্য সেবনকে পরিষ্কার ভাষায় ‘হারাম’ বা চির পরিত্যাজ্য হিসাবে ঘোষণা করেছেন। ভারতের প্রয়াত নেতা মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, এক ঘন্টার জন্য দেশের শাসনভার তিনি পেলে দেশের সব মদের দোকান বন্ধ করে দিবেন। যুগ যুগ ধরে জ্ঞানী, গুণী পন্ডিতেরা মাদক দ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে নানা ভাবে উপদেশ প্রদান করলেও এর ব্যবহার কমছে না বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদক! যাকে বলা হয় সকল সন্ত্রাস ও অপরাধের জনক। একজন মানুষ যখন অন্ধকারের ভুবনে পা বাড়ায় তখন সে প্রথম সিঁড়ির যে ধাপটিতে পা রাখে তা মাদকদ্রব্য। এ মাদকদ্রব্য তাকে টেনে নেয়, উৎসাহিত করে পরবর্তী ধাপগুলো পেরিয়ে যেতে। ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে আমাদের এ উপমহাদেশে মাদক ব্যবসা ও প্রাপ্তি সহজলভ্যতা বেশি এবং বর্তমান অবস্থানের প্রেক্ষিতে তরুণ সমাজ এদিকে ঝুঁকছেও বেশি-ঠিক যেমনটি প্রত্যাশা মাদক ব্যবসায়ীদের। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত সরকারি ও বেসরকারি সমীক্ষায় পাওয়া তথ্যে প্রকাশ হেরোইন পাচারের জন্য এ উপমহাদেশকেই বেশি নিরাপদ মনে করছে পাচারকারীরা।
সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রতিদিন যেসব খুন, সন্ত্রাসী, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনাসহ সকল অপরাধমূলক খবরাখবর ছাপা হচ্ছে তার সকল ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তরুণ যুব সমাজ এর একটি অংশ। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক যে বিষয়টি উদ্বেগের এবং আমাদেরকে সতর্ক হতে নির্দেশ দিচ্ছে তা হল এদের অধিকাংশই আজ মাদকাসক্ত।
নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই যুব সমাজের মধ্যে মাদকাসক্তির পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। শহরাঞ্চলের ধনী পরিবারের সন্তানদের মধ্যে আসক্তির যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে তা এক ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিতবাহী। মাদক কেবল তরুণ প্রজন্মের প্রাণশক্তি ও মেধাকে ধ্বংস করছে না, এর কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অপসংস্কৃতি ও অপরাধের বিস্তার ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে,মাদকাসক্তদের শুধু দায়ী করলেই হবে না এর সাথে একদিকে দারিদ্র ও বেকারজনিত বিপুল হতাশা, অন্যদিকে সকল পর্যায়ে নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত সীমাহীন লোভ গোটা সমাজকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। মাদক পাচার ও ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তি প্রদানসহ মাদক পাচার রোধ ও মাদকের সহজ প্রাপ্যতা বন্ধ করতে হবে। নিজ সন্তানের প্রতি যতœশীল হতে হবে। সরকার ও জনগণের সমন্বয় প্রচেষ্টায় এ ভয়াবহ ব্যাধি দূর করতে হবে। মাদকাসক্তদের দ্বারা খুন-রাহাজানি বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি তরুণ সমাজকে মাদকাসক্ত ও বখাটে হবার আগেই সচেতন করার জন্য সকল মাধ্যমকে জরুরী ভিত্তিতে কার্যকর করা জরুরি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে আমাদের এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে মদের প্রচলন শুরু হয়। ইংরেজ ও আমেরিকানরা রণক্ষেত্রে, ক্যা¤েপ, হাটে- ঘাটে সর্বত্র মদ বিক্রি এবং বিতরণ করে মানুষকে মদের প্রতি আসক্ত করে তুলে। এরই পরিণতিতে আজ সর্বত্র মদের অবাধ প্রচলন দেখা যাচ্ছে। অজ্ঞ-অশিক্ষিত এবং দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা মদ পান করে সর্বনাশের দিকে এগিয়ে চলছে। এতে একথা জোরের সঙ্গে বলা চলে, আমাদের নিজের, সমাজের এবং দেশের প্রভৃত ক্ষতি হচ্ছে।
‘মদের বোতল মানেই ধ্বংসের বোতল’- কথাটি চিরসত্য। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যতই প্রচারাভিযান চালানো হবে মানুষ এর কুফল স¤পর্কে জানতে পারবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মাদক দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব স্থানে শুধু প্রশাসন বা পুলিশ নয় সমাজের বিবেকবান প্রতিটি মানুষই মাদক বিরোধী অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। মানুষকে মাদকতার কুফল স¤পর্কে যতই জ্ঞান দেওয়া যাবে, মানুষ তা পরিত্যাগের চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই নেশার বিরুদ্ধে মাদক বিরোধী অভিযানকে আরো জোরালো করতে হবে।
এক্ষেত্রে সমাজপতিদেরও এগিয়ে আসতে হবে। মাদকদ্রব্য সেবনে মানুষ কীভাবে ধ্বংস হয় তার একটা বাস্তবিক উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি। বিভাগীয় শহর সিলেটে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী একমাত্র আদুরে দুলাল কলেজে ভর্তি হয়েই কুসঙ্গে পড়ে ধীরে ধীরে মদে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মদ ছাড়া তার চলা যেন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে পড়াশোনা থেমে যায় এবং ব্যবসায়ী ভদ্রলোক আর্থিক ও সামাজিক দিক দিয়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন। বুড়ো মা-বাবা ছেলেকে বিয়ে দিলেও তার মতিগতির পরিবর্তন হয়নি। এতে স্ত্রী তাকে ফেলে বাবার বাড়ি চলে যায়। পাড়ার মানুষ ধনীর একমাত্র সন্তানের এমন পরিণতিতে একেবারে বিস্মিত হয়ে যান। তারা শপথ নিয়েছিলেন, এলাকা থেকে মাদক সেবীদের উৎপাৎ বন্ধ করবেনই। সচেতন লোকজনদের কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণে সে পাড়াটি মদ-মুক্ত প্রায়। আমাদের দেশের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় অনেক চা বাগান আছে। এসব বাগানের চা শ্রমিকরা সহজ- সরল, অশিক্ষিত এবং সামাজিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, চা শ্রমিকদের প্রতিটি পরিবারে মদের ব্যবহার রয়েছে। এমনকি শ্রমিক মেয়েরাও মদ খায়। মজুরির দিক দিয়ে দেখলে তাদের মজুরি একেবারে কম নয়। কিন্তু এ মজুরি দ্বারা তাদের অন্নসংস্থান হয় না, কাপড়- চোপড় কিনতে পারে না, ছেলে- মেয়েদের পড়ার খরচ দিতে পারে না। এর একমাত্র কারণ নেশাদ্রব্য সেবন। তাদের কষ্টার্জিত উপার্জনের বড় অংশ চলে যায় মদের দাম মিটাতে। এতে তারা দিন দিন সবদিক দিয়ে আরও পিছিয়ে পড়ছে। শুধু পকেটের পয়সা খরচ করে নয়, নির্বাচনের সময় ভোট আদায় করতে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো চা বাগানগুলোতে ঢালাও মদ সরবারহ করে এমন খবর আমরা প্রায়ই পেয়ে থাকি।
নেশার কুফল স¤পর্কে যাদের শিক্ষিত করা উচিত বিনে পয়সায় মদ বিলিয়ে দিয়ে ভোট বৈতরণী পার হচ্ছেন কোন কোন দলের রাজনৈতিক নেতারা। শ্রমিক সমাজ অধঃপতনের দিকে চলেছে। এ শ্রেণীর মানুষের উন্নতি সাধন করতে হলে মদ্যপান স¤পূর্ণভাবে বন্ধ করা উচিত। আবগারি বিভাগ সঠিক পদক্ষেপ নিলে চা বাগানে মদের প্রচলন কমবে। শ্রমিক সমাজ উন্নত হয়ে দেশ গঠনের কাজে এগিয়ে আসতে পারবে।
মাদকদ্রব্য সেবনে মানুষের মানবতাবোধ লোপ পায়, শরীরে নানা রোগ দেখা দেয়, চরিত্র নষ্ট হয়, পরিবারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, অর্থের অপচয় হয়, সামাজিক পদমর্যাদা এসব কিছুই থাকে না। ভাল মানুষ ও ভাল পরিবার সমাজে স্থান পায় না। কাজেই মাদকদ্রব্য ব্যবহার সবদিক দিয়েই মানুষের দারুণ ক্ষতিকর, এতে কোনও সন্দেহ নেই। গাঁটের পয়সা খরচ করে মানুষ যদি রুগ্ন হয়, অমানুষ হয়, মানুষের কাছে পরিত্যাজ্য হয়- তাহলে সুস্থ সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। সমাজ সুস্থ না হলে জাতীয় জীবন সুস্থ আশা করা যায় না। ফলে অনাচার, অবিচার, ব্যভিচার, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিদ্যমান থেকেই যাবে, যা কোনও দেশের পক্ষে শুভ হতে পারে না। কাজেই সমাজের উন্নতির জন্য মাদকদ্রব্য নিবারণ একান্ত অপরিহার্য।
মাদকদ্রব্য যখন সবদিক দিয়ে সমাজের পক্ষে অনিষ্টকর কাজেই এর সংপর্শে না গেলে বা চিরদিনের জন্য ত্যাগ করলে যখন সমাজের উন্নতি হতে পারে তাহলে দেশ, জাতি ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের এ কথা মাথায় রেখে এ বিষাক্ত এবং সর্বনাশা দ্রব্য থেকে দূরে থাকার জন্য এগিয়ে আসতে হবে যুব সমাজকে। এতে দেশ ও সমাজ রক্ষা পাবে, সুস্থ ও সবল হয়ে বাঁচতে পারবে জাতি। এ শুভ কাজে সমাজপতি, মসজিদের ইমাম, স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা উচিৎ বলে আমরা মনে করি।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সিলেটে প্রবাসী বিনিয়োগ
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • উত্তম বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব
  • শিক্ষকদের কাছে প্রত্যাশা
  • শিশুদের সুরক্ষায় চাই সামাজিক প্রতিরোধ
  • ডা. আর.কে দাস
  • দুই দশকেও আন্তর্জাতিক হলো না ওসমানী বিমানবন্দর
  • সিরিয়া সংকট ও রাশিয়ার হস্তক্ষেপ
  • আমাদের ছেলেমেয়েদের মেধার ঐশ্বর্য
  • নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
  • নৈতিক মূল্যবোধ
  • শান্তি সুখের সন্ধানে
  • কী চাই, কী চাই না
  • প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী অঙ্গীকার
  • সাংবাদিক কামরুজ্জামান চৌধুরী
  • প্রাইভেট টিউশন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি
  • ফসল রক্ষা বাধ ও নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
  • সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম
  • রেল ভ্রমণ কবে স্বস্তিদায়ক হবে
  • অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান
  • Developed by: Sparkle IT