ধর্ম ও জীবন

ইমাম আযম আবু হানিফা ও ইলমে হাদীস

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০১-২০১৯ ইং ০০:০৬:৫৮ | সংবাদটি ২৮৮ বার পঠিত

ইমাম এ আযম আবু হানীফ (রাহ.) হচ্ছেন ইসলামী আইন শাস্ত্রের স্থপতি। তিনি শুধু একজন খ্যাতিমান ফকীহ্-ই-ছিলেন না; বরং তিনি একজন শ্রেষ্ট মুহাদ্দীস ও মুফাস্সীর ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ, পান্ডিত্বের অধিকারী, প্রখর মেধা, অপূর্ব উদ্ভাবনী শক্তি, তাকওয়া-ফরহেজগারীতা, ইবাদত-বন্দেগী, ন্যায়নিষ্ঠা আর সাহসিকতায় তার তুলনা তিনি নিজেই। তিনি ছিলেন গোটা উম্মাহর আলোর প্রদীপ, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানে তিনি ছিলেন বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ। ইমাম যাহাবী (রহ.) এর মতে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর এক লাখেরও বেশী হাদীস মুখস্ত ছিল। তিনি কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফিকহের প্রতিটি মাস্য়ালা নির্ণয় করতেন। তার বর্ণিত মাসয়ালার সংখ্যা প্রায় বারো লক্ষ।
কিন্তু আফসোস! ইদানিং কিছু জ্ঞানপাপী কুচক্রি মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার হাফিজে হাদীস ইমাম আবু হানীফা (রহ.)। তাদের অনেকেরই ভুল ধারণা ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নাকী হাদীসই জানতেন না, নাউজুবিল্লাহ! ইমামের হাদীসজ্ঞানের স্বীকৃতি ও তার উপর আরোপিত কয়েকটি অভিযোগ ও জবাব জানতেই আলোচ্য গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবীদ ও গবেষক মাওলানা মোঃ আব্দুল আউয়াল হেলাল এর লিখিত “ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.) ও ইলমে হাদীস” শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে লেখক অত্যন্ত বিচক্ষণতার সহিত ইমাম আবু-হানিফা (রহ.) এর জন্ম থেকে শুরু করে তার জীবনের উল্লেখযোগ্য সকল দিকের আলোচনা করেছেন।
গ্রন্থের প্রথমেই লেখক ইমাম আবু হানীফা (রাহ.) এর জন্মও শাহাদাত সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। জন্মসাল সম্পর্কে একাধিক মত রয়েছে তবে প্রসিদ্ধ মতে তিনি ৮০ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। তার ওফাত সম্পর্কে সকলেই একমত তিনি ১৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাকে কারাগারে বিষ প্রয়োগ করা হয় এবং এই বিষক্রিয়াতেই তিনি ১৫০ হিজরীর ১৪ শাবান দিবাগত রাতে শাহাদত বরণ করেন এবং বাগদাদে তাকে দাফন করা হয়। লেখক, ইমাম আযমের কুনিয়াত সম্পর্কিত ভ্রান্তি নিরসন করেছেন এভাবে, ইমাম আযমের নাম নুমান। তার কুনিয়াত বা উপনাম সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা ইমাম আবু হানীফা এর অর্থ হচ্ছে হানীফার পিতা। অর্থাৎ ইমাম আযমের মেয়ের নাম হচ্ছে হানীফা। এটি একটি ভুল তত্ত্ব। কারণ ইমামের কোন মেয়ে ছিলেন না একমাত্র সন্তান ছিলো যার নাম হাম্মাদ। মূল কথা হচ্ছে ইমাম আযম নিজের জন্যই এ কুনিয়াত উপনামটি নিজেই ঠিক করেছিলেন। ইমাম আযম বেড়ে উঠেছিলেন এমন এক জ্ঞানের রাজ্যে যে রাজ্যকে হাদীসের নগরী বলা হয়ে থাকে। সেই নগরীর নাম হচ্ছে কুফা নগরী। প্রখ্যাত মুহাদ্দীস সুফিয়ান সাওরীর মতে, ‘যার ইলম শেখার আগ্রহ আছে সে যেন কুফা নগরীতে যায়’। কুফা নগরীতেই ইমাম আযমের ইলম অর্জনের সূচনা হয় এবং পর্যায়ক্রমে তিনি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে হারামাইন শরীফাইনে অবস্থান করেন। হারামাইন শরীফাইন ইলমে হাদীসের মূল কেন্দ্র ছিল। হারামাইন শরিফাইন যেহেতু সাহাবা এবং তাবেয়ীদের ইলম চর্চার মূল কেন্দ্র ছিল সেহেতু ইমামে আজম মক্কা-মদীনার বিশিষ্ট মুহাদ্দীসিনের নিকট হতে ইলমে হাদীসের জ্ঞান সংগ্রহ করেন। তিনি মোট দশ বছর মক্কা-মদীনা শরীফে অবস্থান করেন। তারপর ইমাম আবু হানিফা বসরায় গমন করেন এবং প্রায় এক বছর তিনি সেখানে অবস্থান করেন। লেখক এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, যেহেতু কুফা, বসরা এবং হারামাইন সে সময়ের ইলমে হাদীসের মূল কেন্দ্র ছিল সেহেতু ইমাম আজম এ তিন জায়গার শ্রেষ্ট মুহাদ্দীসিনের নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন। বিধায় একথা সহজেই অনুমেয় যে, ইমাম আবু হানিফার নিকট ইলমে হাদীসের অফুরতœ ভান্ডার সংরক্ষিত ছিল। বিশেষ করে এ কথার উপর সবাই একমত যে ইমাম আজম একজন তাবিঙ্গ ছিলেন, সেজন্য অনেক সাহাবির সাথে তার সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে। সাহাবীদের সাথে সাক্ষাতের সুবাধে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) অসংখ্য হাদীস সাহাবী হতে সরাসরি বর্ণনা করেছেন।
গ্রন্থটিতে লেখক ইমাম আজমের উল্লেখযোগ্য কিছু উস্তাদের তালিকা প্রণয়ন করেছেন। উল্লেখ্য যে তার উস্তাদদের মধ্যে ৮ জন সাহাবী এবং প্রায় চার হাজার তাবিঙ্গ ছিলেন। তার উস্তাদগণের ইলমি মর্যাদা ও অবস্থান থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইলমে হাদীসের এক জ্বলন্ত প্রদীপ ছিলেন। ইমাম আজমের উস্তাদের সংখ্যা যেমন বিপুল তেমনি তার ছাত্র সংখ্যাও বিশাল। তার ছাত্রদের সংখ্যা সঠিকভাবে বর্ণনা করা কঠিন। ইমাম আব্দুল কাদির কুরাশী (রহ.) (ওফাত ৭৫৫ হিজরী) বলেন, ইমাম আবু হানিফা এর কাছ হতে ইলমে হাদীস বর্ণনা এবং ফিক্হে হানাফী শিক্ষা গ্রহণ করেছেন প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী। গ্রন্থটিতে লেখক শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই শুধু বর্ণনা করেননি বরং তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে হতে ১৮ জন ছাত্রের সংক্ষিপ্ত জীবনীও উল্লেখ করেছেন। লেখক গ্রন্থটিতে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর হাদীস সংখ্যা এবং তার মুসনাদ সমূহ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এবং প্রমাণ দেখিয়েছেন যে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) শুধু হাদীস জানতেন তা নয় বরং এক লক্ষ হাদীস সনদ সহ মুখস্থ জানতেন। তাই ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে হাফিজে হাদীসও বলা হয়ে থাকে। ইমাম আবু হানিফা (রহ) যদিও তার জীবদ্দশায় কোনো হাদিসগ্রন্থ সংকলন করে যেতে পারেন নি, কিন্তু তার উল্লেখযোগ্য অনেক ছাত্র তার কাছ হতে প্রাপ্ত হাদীসগুলো মুসনাদ ও আছার নামে সংকলন করেছেন। মুসনাদে আবু হানিফা সংখ্যা গ্রন্থ ১৭টিরও বেশি।
লেখক আলোচ্য গ্রন্থে মুসনাদে আবু হানিফা লেখকদের লিখিত গ্রন্থের আলোচনা এবং মুসনাদে আবু হানিফার ব্যাখ্যা গ্রন্থ ও অনুবাদ গ্রন্থ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। গ্রন্থটিতে সাহবীদের সাথে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর সনদসূত্র আলোচনা এবং সনদের ধারাবাহিক নকশা গ্রন্থটির মান বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর সাথে পরবর্তী ইমামগণের সনদসূত্র বিশেষ করে ইমাম শাফীঈ, ইমাম আহমদ বিন হাস্বল, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম (রহ.) সহ প্রত্যেকের-ই-সনদ সূত্র ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এ বিষয়টিও লেখক নকশা সহ বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য ইমাম বুখারী (রহ.) সহ প্রায় সকল ইমামই কোন না কোনভাবে সনদসূত্রে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর সাথে সম্পর্কিত রয়েছেন।
গ্রন্থটিতে লেখক ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে বিশ্ববরেণ্য মুহাদ্দীসিনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মন্তব্য ও তুলে ধরেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর উপর আরোপিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মিথ্যা অভিযোগ এর জবাব লেখক তার জ্ঞানগর্ভ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে খন্ডন করেছেন। যা ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে জানতে পাঠককে অবশ্যই আগ্রহী করবে। গ্রন্থটিতে রয়েছে ইমামের ৪০ জন ফিকহী পরিষদের নামের তালিকা। সবশেষে লেখক সচিত্রের মাধ্যমে ইমাম আজমের ব্যবহৃত জামা ও রওযার ছবি, সন্নিবেশিত করেছেন। ইমাম আজমের সাথে লেখকের সনদসূত্র গ্রন্থের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। লেখক ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে লিখিত আরবী, উর্দ্দু, বাংলা, ইংরেজী ১৩০টি- গ্রন্থপঞ্জির তালিকা সংযুক্ত করেছেন।
এককথায় বলা যায় বাংলা ভাষায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে জানার জন্য এ গ্রন্থটি এক অনন্য গ্রন্থ। বিশেষ করে গ্রন্থটি আবু হানিফা (রহ.) কে না জেনে বিষোদগারী এবং ভুল ধারণা পোষণকারীদের ধারণায় অবশ্যই আঘাত হানবে। তাই ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কে জানতে এবং সন্দেহ সংশয়ের উচ্ছেদের জন্য বইটি অবশ্যই পাঠকমহলে সমাদৃত হবে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ ও বাঁধাই বেশ নান্দনিক। বইটির দিকে থাকালেই পাঠককে আকর্ষিত করবে অনায়াসে। আশা করি এ গ্রন্থটি পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হবে। উল্লেখ্য, মোঃ আবদুল আউয়াল হেলাল ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে জকিগঞ্জ উপজেলার রারই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি লন্ডন প্রবাসী। তিনি একজন খ্যাতিমান, লেখক, গবেষক ও আলেম হিসেবে পরিচিত সর্বমহলে। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা দশটি। তিনি নিয়মিত লিখেই যাচ্ছেন, ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলী নিয়ে। তিনি একজন শক্তিমান কবি হিসেবেও পরিচিত। তার পিতা হচ্ছেন বর্তমান সময়ের একজন খ্যাতিমান শায়খুল হাদীস, লেখক ও গবেষক আল্লামা মো: হবিবুর রহমান (মুহাদ্দীস সাহেব) নামে খ্যাত।
বইয়ের নাম : ইমাম আযম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ও ইলমে হাদীস।
লেখক : মো. আব্দুল আউয়াল হেলাল। প্রকাশক : আল-হাবীব ফাউন্ডেশন বারাই, জকিগঞ্জ, সিলেট।
প্রচ্ছদ : মো. ওবাইদুল হক। পরিবেশক : নুমানিয়া লাইব্রেরী ও সাইমুন লাইব্রেরী, সিলেট। পৃষ্ঠা : ১৫২। মূল্য : ৩০০ (তিনশত) টাকা। প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ, নভেম্বর ২০১১ দ্বিতীয় প্রকাশ মে ২০১৭।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT