ইতিহাস ও ঐতিহ্য

নাটোরের জমিদার রানী ভবানী

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০১-২০১৯ ইং ০০:৫০:১৭ | সংবাদটি ১৯১ বার পঠিত

ইতিহাস হল মানুষের অতীত ঘটনা ও কার্যাবলীর অধ্যয়ন। বৃহৎ একটি বিষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি কখনও মানবিক বিজ্ঞান এবং কখনও বা সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। ইতিহাসবেত্তাগণ ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন। আমরা ইতিহাস থেকে অনেক বছরের পুরনো সভ্যতা, রাজা-বাদশাদের নানা কর্মকান্ড বা তাদের যাপিত জীবন সম্পর্কে জানতে পারি।
ইংরেজ শাসনামলে বর্তমান বাংলাদেশের নাটোরের একজন জমিদার ছিলেন রানী ভবানী। দান, ধ্যান, শিক্ষা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিৎসা ও ধর্মীয় কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ রানী ভবানী সরকারি কোন খেতাব না পেলেও তাঁর প্রজারা তাঁকে ‘মহারানী’ নামে আখ্যায়িত করে।
বগুড়া জেলার আদমদিঘি থানাধীন ছাতিয়ান নামক গ্রামে আনুমানিক ১১২২ বঙ্গাব্দে রানী ভবানী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আত্মারাম চৌধুরী এবং মাতা জয়দূর্গা। খুব অল্প বয়সেই ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে নাটোরের জমিদার রাজা রামকান্তের সাথে রানী ভবানীর বিয়ে হয়। তাদের ২ ছেলে এবং ১ মেয়ের মধ্যে শুধু তারা সুন্দরী জীবিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রামকৃষ্ণকে দত্তক নেন। রামকৃষ্ণের দুই সন্তানÑবিশ্বনাথ ও শিবনাথ।
১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে রানী ভবানীর স্বামী রামকান্ত ইহলোক ত্যাগ করেন। রাজা রামকান্তের মৃত্যুর পর নবাব আলী বর্দি খাঁ নাটোর জমিদারী পরিচালনার ভার রানী ভবানীর উপর অর্পন করেন। তখনকার দিনে জমিদার হিসেবে মহিলা অত্যন্ত বিরল ছিল। কিন্তু রানী ভবানী বিশাল জমিদারির কার্য অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেন। একজন ইংরেজ লেখক হলওয়েল ধারণা দেন যে, জমিদারী এস্টেটের বার্ষিক খাজনা ছিল প্রায় ৭ লক্ষ রুপী এবং বার্ষিক অর্জিত রাজস্ব ছিল প্রায় ১৫ লক্ষ রুপী।
তাঁর রাজত্বকালে জমিদারী বর্তমান রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। এজন্য তাকে অর্ধবংগেশ্বরী বলা হতো। রাণী ভবানী সুদীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর দক্ষতার সাথে বিশাল জমিদারী পরিচালনা করেন। তিনি বাংলায় শত শত মন্দির, অতিথিশালা এবং রাস্তা নির্মাণ করেন। তিনি প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য অনেকগুলি পুকুরও খনন করেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারেও আগ্রহী ছিলেন এবং অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদারভাবে দান করেন। ১৭৫৩ সালে কাশী অর্থাৎ বেনারসে ভবানীশ্বর শিব ও দুর্গার বাড়ি, দুর্গাকুন্ড, কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় স্থাপন করেন তিনি। হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন যা রাণী ভবানী রোড বা বেনারস রোড নামে খ্যাত ছিল। বর্তমানে এটি বোম্বে রোডের অংশ। বগুড়া জেলার শেরপুরে অবস্থিত পীঠস্থান ভবানীপুরের মন্দিরসমূহের উন্নয়নে রানী ভবানী অনেক অবদান রাখেন। রানী ভবানীর নাটোর রাজবাড়ি বাংলাদেশে একটি দর্শনীয় স্থান।
উনবিংশ শতকে বাংলার বড় বড় জমিদারদের ব্রিটিশ সরকার রাজা, মহারাজা, রাজা-বাহাদুর রায় বাহাদুর প্রভৃতি খেতাবে ভূষিত করলেও আঠারো শতকে এই খেতাব প্রদানের নিয়মটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তাই রাণী ভবানী দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর জমিদারী পরিচালনা করলেও তিনি সরকারি কোনো খেতাব পাননি। কিন্তু তার প্রজারা তাকে মহারানী উপাধিতে ভূষিত করেছে এবং বৃহত্তর রাজশাহীর জমিদারদের মধ্যে রাণী ভবানীর নামটি আজও সর্বশ্রেণির মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে, থাকবে চিরকাল। এর কারণ একটিই তিনি তার প্রজাদের কল্যাণের জন্য এতবেশি কাজ করে গেছেন যে, এ এলাকার মানুষ বংশ পরম্পরায় তাঁর স্তুতি গাইবে।
রানী ভবানী প্রতি বছর ব্রাহ্মণ, গঙ্গাবাসী, আখড়াধারী মহান্ত অতিথিগণকে এক লক্ষ আশি হাজার টাকা দান করতেন। হিন্দু প্রজাদের মধ্যে ব্রহ্মোত্তর ও দেবোত্তর নামে প্রায় পাঁচ লক্ষ বিঘা ভূমি দান করে গেছেন। ঐ ভূমি মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর ও ঢাকা জেলায় বিস্তৃত ছিল। বাংলার প্রায় সকল ব্রাহ্মণ তার দান পেয়েছেন। এজন্য একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল যে, ‘যিনি রানী ভবানীর ব্রহ্মোত্তর ভোগী নন, তিনি ব্রাহ্মণ নামেরই অযোগ্য।’ ভূমিদান ছাড়াও তিনি ব্রাহ্মণদের বৃত্তি প্রদান করেছেন। ঐ বৃত্তি ‘ভবানী বৃত্তি’ নামে পরিচিত ছিল।
মহারানী ভবানী অন্ন বিতরণকে কেন্দ্র করে প্রজাসাধারণের কাছে ‘অন্নপূর্ণা’ নামে পরিচিত হন। ছিয়াত্তরের হৃদয়-বিদারক মন্বন্তরের সময় তিনি প্রজাদের সাহায্যার্থে রাজকোষ উজাড় করে দিয়েছিলেন। দিনাজপুর ও রংপুর এলাকা থেকে অধিক মূল্যে চাল ক্রয় করে অল্পমূল্যে জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় তিনি লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। রানী ভবানীর অন্নদানের বিবরণ পাওয়া যায় ড. মো. মকসুদুর রহমানের রানী ভবানী গ্রন্থে ‘রানী ভবানী নিত্যদিন জনসাধারণের মধ্যে খাদ্যদ্রব্যাদি বিতরণ করতেন।’ কথিত আছে যে, রানী ভবানী প্রথম যখন কাশীধামে গমন করেন তখন তিনি ১৭০০ নৌকা ভর্তি খাদ্য সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর তিনি যতবার কাশীতে গমন করেন ততবারই ১০০০ নৌকা ভর্তি খাদ্যদ্রব্য সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। এসব দানের জন্য কাশীতে তাকে দ্বিতীয় অন্নপূর্ণা হিসেবে মান্য করা হয়।
রানী ভবানী নাটোরের চারপাশে ৮৩টি টোল ও চতুষ্পাষ্ঠী এবং ৩৩টি বৈষ্ণব আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। আর সেগুলো পরিচালনার জন্য বহু নিষ্কর জমি ও বৃত্তি দান করেন। বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব পন্ডিতগণ ঐ সব টোল ও আখড়া পরিচালনা করতেন এবং রানী ভবানীর নিকট থেকে নিয়মিত বৃত্তি পেতেন। রানী ভবানী প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পষ্ঠী এবং বৃত্তি প্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছিলেন :
১. সিংড়া থানার তাজপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পাষ্ঠীর পন্ডিত শ্রীপতি বিদ্যালঙ্কার। এই চুতষ্পাষ্ঠীর নামে রানী ভবানী বার্ষিক নব্বই টাকা মঞ্জুরী অনুমোদন করেছিলেন। এই পন্ডিতের মৃত্যুর পর তার পুত্রগণ ঐ বৃত্তি পেতেন। ২. আমহাটিতে আরেকটি চতুষ্পাষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন ন্যায় পঞ্চানন। তিনিও মাসিক দশ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। ৩. সিংড়া থানার বড়িয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পাষ্ঠীর অধ্যাপক রুদ্র ভট্টাচার্য ভবানীর কাছ থেকে মাসিক পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি পেতেন। উল্লেখ্য যে, ১৭৯১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব ও মুসলমান ফকিরদের বৃত্তি বাবদ রানী ভবানীর বার্ষিক খরচ হতো ১৫,৫৮৩ টাকা ৫ আনা। রাজশাহী ছাড়াও বীরভূম জেলার এক চতুষ্পাষ্ঠীতে তিনি বার্ষিক ১০০ টাকা বৃত্তি প্রদান করতেন।
অধিকন্তু, অনাড়ম্বর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সাথে সাথে রানী ভবানীর উদারতা এবং সমাজ হিতৈষী মনোভাব তাঁকে সাধারণ জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করে। অর্ধবঙ্গেশ্বরী রানী ভবানী খ্যাত নাটোর অতীত গৌরব আর ঐতিহ্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে আজও। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংস্কৃতি সমৃদ্ধ দেশ বাংলাদেশ। এই দেশে রয়েছে মূল্যবান বহু ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যের নিদর্শন। আর বাংলাদেশের এই নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নাটোর রাজবাড়ি।
কবি সুফিয়া কামালের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাইÑমানবজীবন শ্রেষ্ঠ কঠোর,/ কর্মে সে মহীয়ান।
মানবজীবন কর্মের মধ্যে দিয়ে মহীয়ান হয়। আর এভাবেই কর্মের মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে ‘মহারাণী ভবানী’ মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম যুগ যুগ ধরে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৮০২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে এই প্রজাহিতৈষী মহারানী ভবানী পরলোক গমন করেন।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস
  •  পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • হারিয়ে যাচ্ছে গুম্বুজওয়ালা মসজিদ
  • একাত্তরের প্রতিরোধ যোদ্ধা
  • হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গাছ
  • হবিগঞ্জের লোকখাদ্য
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • গ্রাম বাংলার ঢেঁকি
  • হযরত শাহজালাল (রহ.) ও ইবনে বতুতার মিথস্ক্রিয়া
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • Developed by: Sparkle IT