ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০১৯ ইং ০০:৩৭:০৯ | সংবাদটি ৬৮ বার পঠিত


সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
এ আয়াতে বণী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে এরশাদ হয়েছে : ‘এবং তোমরা আমার অঙ্গিকার পূরণ কর।’ অর্থাৎ, তোমরা আমার সাথে যে অঙ্গিকার করেছিলে, তা পূরণ কর। হযরত কাতাদাহ্ (রা.) এর মতে তওরাতে বর্ণিত সে অঙ্গিকারের কথাই কুরআনের এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে :
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহপাক বনী-ইসরাঈল থেকে অঙ্গিকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাদের মাঝে থেকে ১২ জনকে দলপতি নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলামÑ(সূরা : মায়েদাহ, রুকু :৩)। সমস্ত রসুলের উপর ঈমান আনার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গিকারই এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। যাদের মধ্যে আমাদের হুযুরে পাক (সা.) ও বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এছাড়া, নামায, যাকাত এবং অন্যান্য সদ্কা-খয়রাতও এ অঙ্গিকারভুক্ত। যার মূল মর্ম হল রসুলে করিম (সা.) এর উপর ঈমান ও তার পুরোপুরি অনুসরণ। এজন্যই হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন যে, অঙ্গিকারের মূল অর্থ মুহাম্মদ (সা.) এর পূর্ণ অনুসরণ।
‘আমিও তোমাদের অঙ্গিকার পূরণ করব।’ অর্থাৎ, উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ এ ওয়াদা করেছেন যে, যারা এ অঙ্গিকার পালন করবে, আল্লাহপাক তাদের যাবতীয় পাপ মোচন করে দেবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদেরকে জান্নাতের সুখ-সম্পদের দ্বারা গৌরবান্বিত করা হবে।
মূল বক্তব্য এই যে, হে বনী-ইসরাঈল, তোমরা মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসরণ করার ব্যাপারে আমার সাথে যে অঙ্গিকার করেছ, তা পূরণ কর, তবে আমিও তোমাদের সাথে কৃত ক্ষমা ও জান্নাত বিষয়ক অঙ্গিকার পূরণ করবো। আর শুধু আমাকেই ভয় কর। একথা ভেবে সাধারণ ভক্তদেরকে ভয় করো না যে, সত্য কথা বললে তারা আর বিশ্বাসী থাকবে না, ফলে আমদানী বন্ধ হয়ে যাবে।
মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতের বিশেষ মর্যাদা : তাফসিরে কুরতুবীতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহপাক বনী-ইসরাঈলকে প্রদত্ত সুখ-সম্পদ ও অনুগ্রহরাজির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁর যিক্র ও অনুসরণের আহবান করেছেন এবং উম্মতে মুহাম্মদিয়াকে তাঁর দয়া ও করুণার উদ্ধৃতি না দিয়েই একই কাজের উদ্দেশে আহবান করা হয়েছে।
এরশাদ হচ্ছে : ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব।’ এখানে উম্মতে মুহাম্মদীর এক বিশেষ মর্যদার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে, দাতা ও করুণাময়ের সাথে তাদের সম্পর্ক মাধ্যমহীনÑএকেবারে সরাসরি। এরা দাতাকে চেনে।
অঙ্গিকার পালন করা ওয়াজিব এবং তা লঙ্ঘন করা হারাম : এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, অঙ্গিকার ও চুক্তির শর্তাবলী পালন করা অবশ্য কর্তব্য আর তা লঙ্ঘন করা হারাম। সূরা মায়েদা’তে এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘তোমরা কৃত অঙ্গিকার ও চুক্তি পালন কর।’
রাসুলে করিম (সা.) এরশাদ করেছেন যে, অঙ্গিকার ভঙ্গকারীদিগকে নির্ধারিত শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে এই শাস্তি দেয়া হবে যে, হাশরের ময়দানে যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমগ্র মানবজাতি সমবেত হবে, তখন অঙ্গিকার লঙ্ঘনকারীদের মাথার উপর নিদর্শনস্বরূপ একটি পতাকা উত্তোলন করে দেয়া হবে এবং যত বড় অঙ্গিকার করবে, পতাকাও তত উঁচু ও বড় হবে, এভাবে তাদেরকে হাশরের ময়দানে লজ্জিত ও অপমানিত করা হবে।
পাপ বা পুণ্যের প্রবর্তকের আমলনামায় তার সম্পাদনকারীর সমান পাপ-পুণ্য লেখা হয় : যে কোন পর্যায়ে কাফের হওয়া চরম অপরাধ ও জুলুম। কিন্তু এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, প্রথম কাফেরে পরিণত হয়ো না। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, যে ব্যক্তি প্রথম কুফুরী গ্রহণ করবে, তার অনুসরণে পরবর্তীকালে যত লোক এ পাপে লিপ্ত হবে, তাদের সবার কুফরী ও অবিশ্বাসজনিত পাপের বোঝার সমতুল্য বোঝা তাকে একাই বহন করতে হবে। কারণ, সে-ই কেয়ামত পর্যন্ত সংঘটিতব্য এ অবিশ্বাস-প্রসূত পাপের মূল কারণ ও উৎস। সুতরাং তার শান্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
এতে বুঝা গেল যে, কোন ব্যক্তি যদি অন্য কারও পাপের কারণে পরিণত হয়, তবে কেয়ামত পর্যন্ত যত লোক তার কারণে এ পাপে জড়িত হবে, তাদের সবার সমতুল্য পাপ তার একারই হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি অন্য কারও পুণ্যের কারণ হয়, তাকে অনুসরণ করে কেয়ামত পর্যন্ত যত লোক সৎকাজ সাধন করে যে পরিমাণ পুণ্য লাভ করবে, তাদের সবার সমতুল্য পুণ্য সে ব্যক্তির আমলনামায় লিপিবদ্ধ করে দেয়া হবে। এ মর্মে কুরআন পাকের অসংখ্য আয়াত এবং রসুল (সা.) এর অগণিত হাদিস রয়েছে।
‘এবং তোমরা আমার আয়াত সমূহ কোন নগণ্য বস্তুর বিনিময়ে বিক্রয় করো না।’ আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলার আয়াতসমূহের বিনিময়ে মূল্য গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো মানুষের মর্জি ও স্বার্থের তাগিদে আয়াতসমূহের মর্ম বিকৃত বা ভুলভাবে প্রকাশ করে কিংবা তা গোপন রেখে টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করা। এ কাজটি উম্মতের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT