ধর্ম ও জীবন

রাসুলের সমরনীতি

সাঈদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০১৯ ইং ০০:৪০:২৩ | সংবাদটি ২৩৬ বার পঠিত

২৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নানা রকম স্থাপনা ও দুর্গ সমূহ দেখা হলো। খাইবার মরুভূমির বুকে ঘুরে বেড়ানো ও বিভিন্ন পাহাড়ে ট্রাকিং বেশ ভালোই লেগেছে। মাঝখানে জেনারেল কোর্ট সংলগ্ন আল গাজওয়া মসজিদে কিছু সময় কাটালাম। ইমাম ওসামা জানালেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর ইহুদি ও খ্রিস্টানদের হিংসাত্মক কর্মকা- আরো বেড়ে যায়। মুসলমানদের আত্মরক্ষা ও মদিনার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তাদের সাথে অনেক সময় যুদ্ধ করতে হয়েছে। খাইবার ফ্রন্ট ছিল অন্যতম। এসব যুদ্ধ শ্রেণীভেদে গাজওয়া ও সারিয়া নামে অভিহিত। রাসুল স্বয়ং যে সব যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন সেগুলোকে বলা হয় গাজওয়া। আর সাহাবিদের কারো নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ সারিয়া নামে অভিহিত। নবী জীবনে ২৩টি গাজওয়া ও ৪৩টি সারিয়া যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
ইমাম আরো জানালেন, যুদ্ধে রাসুল (সা.)’র হাতে একজন অমুসলিমও নিহত হয়নি। তিনি তরবারির কৌশলী ব্যবহার জানতেন। শত্রু বধ করা নয়, পরাস্ত করে ক্ষমা করে দেয়াই ছিল তার রণকৌশল। শিশু, বৃদ্ধ, নারি এবং যারা যুদ্ধে নেই, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরার নির্দেশ প্রতিনিয়তই ছিল। যুদ্ধ বন্দিদের প্রতি সব সময়ই মানবিক ব্যবহার রাসুলের সমরনীতির অত্যাবশ্যকীয় অংশ। সন্ধি বা শান্তির প্রস্তাব তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং শান্তি চুক্তি কখনো ভঙ্গ করেননি। কখনো শত্রু সম্পদ নষ্ট না করা এবং শত্রুদের বিকলাঙ্গ না করার নীতি ছিল তার। যদিও কাফেররা মুসলিমদের পেট চিরে কলিজা পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছে।
আল গাজওয়া মসজিদে স্থানীয় আরবদের সাথে কথা হয়। খাবারও খেয়েছি তাদের সঙ্গে। অধিকাংশই যাযাবর। ছাগল, ভেড়া, কিংবা ও উট পালনই তাদের কাজ। কেউ কেউ খেজুর, গম ও বার্লি চাষ করেন। আর্টেজীয় কূপের সাহায্যে জলসেচ করে কৃষিকাজ করেন তারা। সমন্বিত এসব কৃষি খামার পরিবেশসম্মত খাদ্য জোগান ও সমৃদ্ধির মূল সোপান। খামার ও বসতি সমূহে হেঁটে হেঁটে কথা বলেছি বেদুইনদের সাথে। চলতে চলতে তাদের ফেলে আসা শৈশব ও কৈশোর নিয়ে গল্প শুনেছি। নিজেদের জীবনের সুখকর স্মৃতির অনেক ঘটনা বলাবলি করছিলেন। খুবই আপন মনে হয়েছে। আতিথেয়তা প্রিয় মানুষ তারা। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ নির্দেশক হিসেবে সাগ্রহে সহায়তা করেন। এটা তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে তারা খুবই গর্বিত। সেই নবী যুগের কাহিনী এখনো প্রবলভাবে আন্দোলিত করে তাদের।
সালাতুল আসরের পর আমরা মদীনার দিকে ফিরলাম। বিদায়ের প্রাক্কালে একটি পাখি মাথার ওপর দিয়ে ঘুরপাক খেলো। এরপর আরো এক ঝাঁক পাখি টি-টি, টি-টি শব্দ করে উড়ে গেলো। এটা তাদের খাবার সংগ্রহের কসরত নাকি আমাদের বিদায় সম্ভাষণ! মরুভূমির আকাশে পাখির এই অকৃত্রিম মায়াময় দৃশ্যের অবতারণা অবর্ণনীয়। জীবন চলার পথে কত মজার অভিজ্ঞতা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। তাই ব্যস্ততার ফাকে লেখার কাজটিও আমাকে সেরে নিতে হয়। মাঝে মাঝে আমার নুট বুকে আরো কিছু তথ্য সংযোজন করেন জাবের আব্দুল্লাহ। তার ডাইরিতেও লিখে রাখেন প্রয়োজনীয় অংশটুকু।
ফেরার পথে আল তামাদ এসে খোরমা বাগানের সামনে আমাদের গাড়ি থামলো। মাত্র ১৮ কিলোমিটার এসেই বিরতি কেন? জানতে চাইলে ড্রাইভার সালিম বললেন, এই জায়গাটা সাহারা মরুভূমির মতো। মিশর, মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, চাদ, সুদান, নাইজার, মালি প্রভৃতি দেশ পর্যন্ত সাহারা মরুভূমি বিস্তৃত। এই মরুভূমিতে তামা, লোহা ও ফসফেট জাতীয় অনেক খনিজ দ্রব্য আছে। বালুময় মরুভূমির কোনো কোনো জায়গায় রয়েছে ঘাস, গুল্ম ও ছোট ছোট গাছ। পানির সন্ধানে গাছগুলোর মূল মাটির খুব গভীরে পৌঁছায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বাতাস থেকে পাতার মাধ্যমে পানি গ্রহণ করে বলে জানালেন জাবের আব্দুল্লাহ।
খোরমা বাগানে আমরা প্রবেশ করলাম। শুনেছি এখানে উন্নত মানের ফ্রেস খেজুর কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাগানের প্রধান কর্মকর্তা কোন খেজুর খুচরা বিক্রি করবে না। ভাইজান রশীদ আহমদ চৌধুরী কিছুটা মনক্ষুণœ হলেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে পাশে থাকা মালিক তোহফা স্বরূপ প্রচুর খেজুর নিয়ে এলেন। বহু চেষ্টার পরও কোন টাকা গ্রহণ করেন নি। তাকে মোবারকবাদ জানিয়ে সামনের দিকে এগুতেই চোখে পড়লো চমৎকারভাবে সাজানো উটের বহর। তাদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। হাত তুলে সালাম জানালাম। উটগুলো দাড়িয়ে গেলো। একজন বয়সী মানুষ জোরগলায় আমাদের কাছে যেতে আমন্ত্রণ জানালেন। আমরাও এগিয়ে গেলাম। চারটা উট থেকে নারি-পুরুষ মিলে সাতজন নেমে এলেন। তারা আমাদের হাল খবর জানতে চাইলেন। তাদের প্রাণবন্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরাও আলাপচারিতায় মেতে উঠলাম।
তিনটি সাজানো উটের সাথে একটি উট বোঝার ভারে নুইয়ে আছে। তার পিঠে চামড়া জাতীয় কয়েকটি বৃহদাকার শক্তপোক্ত ব্যাগ। এর মধ্য থেকে একটি নামানো হলো। মরুভূমিতে মালামাল সংরক্ষণ, খাবার পরিষ্কার ও আর্দ্রতা থেকে রক্ষার জন্য এমনটি ব্যবহার করা হয়। ব্যাগ খুলে এক তরুণ নানা জাতের ফলমুল আমাদের খেতে দিলেন। নিজেরাও খাচ্ছেন সমান তালে। শান্ত ও সম্মোহিত চিত্বের এক তরুণী জানতে চাইলেন কি করি? পর্যটন বিষয়ে লেখালেখির কথা জেনে অনেকটা আবেগঘন ভালোবাসায় মেহমানদারি শুরু করলেন। রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রিধারী আবিদা মাঝে মধ্যে কবিতা লেখেন। ফলে একজন লেখকের প্রতি তার এই সম্মানবোধ! মোহময় মরুপ্রান্তরে একদল পথিকের সাথে পুরনো বন্ধুর মতো আচরণে আমরা মুগ্ধ হই। গাড়ির জানালায় দৃষ্টি মেলিয়া তাদের বিদায় দৃশ্যকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করি। মনের গভীরে প্রোথিত হয় এক টুকরো স্মৃতি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT