মহিলা সমাজ

সহিফা বানু ও প্রাসঙ্গিক কথকতা

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৬ ইং ০২:০২:৪১ | সংবাদটি ৩১৩ বার পঠিত

সিলেটের তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে বসবাস করেও কাব্যচর্চা যিনি চালিয়ে গেছেন তিনি হলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় হাজী সহিফা বানু। সহিফা বানু বৃহত্তর সিলেটের প্রথম মহিলা কবি ছিলেন। তাদের মধ্য দিয়েই সিলেটের কাব্য ও সাহিত্য সাধনার যাত্রা শুরু হয়। কবির পিতা ছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথ থানার রামপাশার জমিদার দেওয়ান আলী রাজা এবং মাতা বালাগঞ্জ থানার সুলতানপুর নিবাসী নূরজাহান বিবি।
সিলেট শহরের কুয়ারপারে অবস্থিত আধ্যাত্মিক মহিমান্ডিত এবং অতি প্রাচীন একটি বাড়ি। যে বাড়িতে অর্থাৎ নানার বাড়িতে কবি সহিফা বানু ১৮৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯১৮ সালে। তিনি একাধিকবার অর্থাৎ অনেকে বলেন সাতবার হজ্ব পালন করেছেন। সেজন্য তাকে সবাই ‘হাজী বিবি’ বলে সম্বোধন করত এবং এ কারণেই এই বাড়িটির নামকরণ হয় ‘হাজী বিবি হাউস।’
কবির পৈতৃক নিবাস বিশ্বনাথ থানার রামপাশায় হলেও তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং শেষ জীবন কেটেছে কুয়ারপারের নানার বাড়িতেই। সিলেট জেলার সর্বজনপ্রিয় মরমি ও ভাবুক কবি দেওয়ান হাছন রাজার বৈমাত্রেয় বড় বোন ছিলেন সহিফা বানু। সিলেট অঞ্চলে সহিফা বানুই প্রথম মুসলিম মহিলা কবি।
কবি সহিফা বানুর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও নিজের আগ্রহ ও চেষ্টায় তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখেছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের মেয়েরা ঘরে বসে উর্দু, ফার্সী, হিন্দি, নাগরী, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা চর্চা করতেন। গভর্নিস পি. ব্যানার্জীর কাছে কবি পারিবারিক পরিবেশে শিক্ষা লাভ করেন। সিলেট অঞ্চলের প্রথম ও প্রধান যে তিনজন মহিলা কবির নাম পাওয়া যায় কবি সহিফা বানু তাদের মধ্যে একজন।
কবি সহিফা বানুর বুদ্ধিমত্তা, তেজস্বিতা, ব্যক্তিত্ব, সৃজনশীল প্রতিভা, সংস্কৃতিমনা এবং জ্ঞানপিপাসু হওয়ায় ভাই হাছন রাজা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা তাকে ¯েœহ, ভালোবাসা ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন।
কবি একজন বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। তাই তাঁর পরামর্শ নেওয়ার জন্য সেই সময়কার সিলেটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার তাঁকে প্রায়ই আমন্ত্রণ জানাতেন।
সেই সময় তাদের মধ্যে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের বিষয় নিয়ে মত বিনিময় হত বলে জানা যায়।
কবি রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও আধুনিকমনা, উদারপন্থী একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর সময়ে কঠোর পর্দাপ্রথার কারণে মুসলিম মহিলারা বোরখা পরতেন। কিন্তু তিনি বোরখা পরতেন না, তবে ইসলামী পোশাক পরিধান করতেন যা ছিল শালীনতার ও আধুনিকতার পরিচায়ক। তিনি মেমসাবদের মতো মাথায় টুপি পরতেন এবং নিজস্ব ঘোড়ার গাড়িতে করে তিনি যাতায়াত করতেন। তাঁর জীবনে আভিজাত্য, সৌন্দর্য, শিক্ষা, জমিদারী, স্বাধীনতা সব কিছুরই পরিপূর্ণতা ছিল। এতকিছু থাকা সত্ত্বেও তাঁর জীবনে একটি শূন্যতা কাজ করত। কারণ তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। এই শূন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফিরত। কবি সহিফা বানু রচিত তিনটি বই হচ্ছেÑ সহিফা সঙ্গীত, ইয়াদগারে সহিফা ও সাহেবানের জারী।
কবি ছিলেন খোদাপ্রেমিক। তিনি অনেক মারেফতি গান ও রচনা করেছেন। কবির কাব্যে জগৎ সংসারের মোহ থেকে মুক্তির বাণী উচ্চারিত হয়েছে। দুনিয়ার এই মায়াজালে বন্দি থেকেও প্রতিনিয়ত তিনি উপলব্ধি করেছেনÑ ‘একদিন এই জগৎ সংসার ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমাতে হবে।’ তাই তিনি উচ্চারণ করেছেনÑ
ছাড় ছাড় ছাড়রে মন এই ভবের ফিকির।
হুশ থাকিতে কর তুমি ইল্লাল্লার জিকির।
ওমন আর কি তর ফিকির।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু অমূল্য রতন।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ করহে সাধন।
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেও সহিফা বানু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিচরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমনÑ কবিতা, সঙ্গীত, জারী ইত্যাদি। এখানে আমি একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, যিনি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, তাকেও রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকে নারী শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের কাজ করতে হয়েছে। আর সহিফা বানু ছিলেন রোকেয়ার দুই বা তিন দশক আগের সময়কার। সুতরাং সহিফা বানুর কাব্যচর্চা তথা গান রচনা ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে।
বেগম রোকেয়ার কথা উল্লেখ করার কারণ হল, তাদের দু’জনের মধ্যে একটি জায়গায় মিল রয়েছে। সেটা হল তারা দু’জনেই অত্যন্ত রক্ষণশীল সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও প্রবল ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করেছেন ঘরের ভিতরে থেকেই। সহিফা বানু আধ্যাত্মিক ভাবধারায় কাব্যচর্চা করেছেন এবং মহিয়সী রোকেয়া সমাজসেবা তথা সমাজসংস্কারে আত্মনিয়োগ করেছেন তার লেখালেখির মধ্য দিয়ে।
সিলেটের জনপ্রিয় মরমি কবি হাছন রাজা। নানাবিধ কারণে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। কবি সহিফা বানু কাব্য প্রতিভা তথা নানাগুণের অধিকারী হওয়ায় ভাই হাছন রাজার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। হাছন রাজা লোকজনকে উপদেশ দিয়ে বলতেনÑ ‘আমার বোনের মতো তোমরা তোমাদের স্ত্রী, কন্যা, বোনদের শিক্ষিত করে তুলো’।
শৈশবে দেওয়ান হাছন রাজা খুব ডানপিটে ও দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। তিনি প্রজাগণকে অনেক সময় কষ্ট দিতেন। তাই কবি সহিফা বানু বলেনÑ
‘হাছন রাজানে এয়াসা জুলুম কিয়া
এতিম বেকছকো লেকে আগমে ঢাল দিয়া।’
সহিফা বানু নানা সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় অনিয়ম এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা কাব্যে তাঁর প্রতিফলন ঘটাতে দ্বিধাবোধ করতেন না। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে অসুস্থাবস্থায় এক মাসের পরিবর্তে এক দিনের জন্য হলেও কারাবরণ করতে হয়েছিল।
কবি সহিফা বানু হিন্দি এবং উর্দু ভাষায়ও গান রচনা করেছেন। তিনি ছিলেন কাব্যরসিক ও কাব্যসাধক। আমরা তাঁর সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি। তিনি আমাদের সিলেটের মুসলিম মহিলাদের কাব্য চর্চার পথিকৃৎ। অথচ আমরা অনেকেই সেটা হয়ত জানি না। আমাদেরকে কবি সম্পর্কে জানতে হবে। আর জানতে হলে তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিশদ গবেষণা প্রয়োজন। কবি সিলেট অঞ্চলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাঙালি নারী সমাজের গৌরব। আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মের অর্থাৎ কবিতা, গান, জারী বহুল প্রচার আশা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT