শিশু মেলা

বিড়াল ছানা

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০১-২০১৯ ইং ০০:০৭:১৪ | সংবাদটি ৩১১ বার পঠিত


বিড়াল ছানার ম্যাও ম্যাও শব্দে ঘুম ভাঙলো আনিকার। কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করল। কোথায় ডাকছে ওটা। নিশ্চয়ই খাটের নিচে। ও লেপ সরিয়ে খাটের নিচে একটু দেখতে চাইল। আবছা অন্ধকার। ডীম লাইটের আলো যতটুকু পৌঁছেছে তাতে বিড়াল ছানার অস্তিত্ব আবিষ্কার করা গেল না। মাথা যতটুকু সম্ভব টেনে, চোখ দুটো বড় বড় করে সে গভীরভাবে তাকালো। না কিছুইতো চোখে পড়ছে না। এদিকে বিড়াল ছানার ম্যাও ম্যাও শব্দে কান ঝালাফালা। একটি বারের জন্যও বন্ধ করছে না। হঠাৎ ছাদের উপর কী যেন হুড়মুড় শব্দে লাফিয়ে উঠল। আনিকা ভয় পেয়ে লেপের নিচে মুখ লুকালো।
পাশেই মা ঘুমিয়ে। মাঝে মধ্যে নাক ডাকছে তার। আনিকা নাক ডাকাটাও ভয় পায়। সে লেপের নিচ দিয়ে মায়ের পাশ ঘেষে শুইল। ছোট্ট হাত দিয়ে ধাক্কাতে লাগল কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ করার সাহস নেই তার। আনিকার ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠলেন আয়শা আখতার। বললেন কী হয়েছে আনিকা? কন্ঠে ঘুম ঘুম রাগত স্বর। তোর হাত ঠান্ডা কেন?
-আম্মু বিড়াল ডাকছে। আমি ভয় পাচ্ছি...
-না আম্মু ভয় পায় না...। এইতো আম্মু আছি না। বিড়ালকে মারবো। এ্যাই বিড়াল- ম্যাও ম্যাও বন্ধ কর। নইলে লাঠি দিয়ে মারবো তোকে....। আনিকাকে কাছে টেনে লেপ টেনে দিয়ে পিঠে থাবা দিতে লাগলেন। ঘুমাও আম্মু...।
চার বছরের আনিকা। বাসার পাশের কেজি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওর ভাই অনিক ওয়ানে পড়ে। বাবা আব্দুল আউয়াল ঐ স্কুলেরই হেড মাস্টার। সকালে তিনিই স্কুলে নিয়ে যান ওদের। স্কুল বাসার কাছাকাছি থাকায় বেশ সুবিধাই হয়েছে। রিকশা গাড়ি চড়তে হয় না। হেঁটে হেঁটেই যাওয়া যায়। অনিক-আনিকার স্কুল সকাল আটটা থেকে। ভোরে উঠেই রেডি হতে হয়।
আজ আজানের শব্দে আনিকার ঘুম ভাঙলো। জেগে উঠেই খেয়াল করল বিড়াল ছানাটি তখনও ডাকছে- ম্যাও ম্যাও। ইতোমধ্যে অনিকও জেগে উঠেছে। আনিকা ডাকলো- ভাইয়া..... শুনছ....?
... হ্যাঁ...। কী হয়েছে?
- বিড়াল ডাকছে...
-ও হ্যাঁ... ওটাতো ডেকেই যাচ্ছে। আমিও রাতে জেগে ওর কান্না শুনতে পেয়েছি? মনে হয় ওর মা ওকে ফেলে গেছে। তাই সারারাত ওটি ঘুমায়নি। আমাদেরও ঘমে ডিস্টার্ব হয়েছে।
-কিন্তু ওটি কোথায় ডাকছে ভাইয়া? খাটের নিচে খোঁজাখুঁজি করে কোথাও পেলাম না।
-মনে হয় ছাদে ডাকছে। চল বাইরে যাই। ওরা চট করে খাট থেকে নেমে দরজার দিকে গেল। দরজা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়ার পরশ পেল ওরা। গায়ে ভারি কাপড় না থাকায় শীতে দাঁতে দাঁত লেগে ঠক ঠক শব্দ হতে লাগল। এদিকে কুয়াশার কারণে এখনও অন্ধকার দূরহয়নি। অনিক দ্রুত দরজা বন্ধ করল, আর বলল- আনিকা একটু পরে দেখব। এখন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে মা বাবা উঠে গেছেন। আনিকা দৌড়ে গিয়ে বাবাকে ধরল। বলল... বাবা বাবা শুনছ- বিড়াল ছানা কিভাবে ডাকছে?...
-হ্যাঁ তাইতো। এভাবে তো কোনদিন ডাকেনি।
-বাবা- বিড়াল ছানাটি ধরে আন। আমি ওকে দেখব। আদর করব।
-আচ্ছা মা। দেখি সূর্য উঠুক। তখন ওকে দেখা যাবে।
আয়শা আখতার নামাজ শেষ করে সবার জন্য নাস্তা রেডি করছেন। ইতোমধ্যে ভোরের আলোয় সমস্ত বাড়ি ঝলঝল করছে। আনিকা বাবাকে ধরল। বাবা... বাবা... চলনা... ঐতো ছাদের কোথাও বিড়াল ছানাটি ডাকছে। ওকে আনি গিয়ে। আব্দুল আউয়াল ছাদের দিকে গেলে ওরাও ওর সাথে উৎসুক হয়ে দৌড়ে এল। ছাদের সিঁড়ি ঘরের এক পাশে পাওয়া গেল বিড়াল ছানাটি। মা বিড়ালটি তখন সেখানে ছিল না। মনে হয় মা বিড়ালটি এই ছানাটির কথা ভুলে গেছে। পেটের ক্ষিধায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনিকের বাবা ছানাটিকে হাতে নিলেন। তখনও বিড়াল ছানাটি ম্যাও ম্যাও করছে। ঘরে এনে আয়শা আখতারকে বললেন- একটু দুধ দাও তো। আয়শা আখতার একটু বিরক্তির স্বরে বললেন... এই সাত সকালে কি শুরু করেছ?
-আরে দাও না একটু দুধ।
বাটিতে দুধ দিয়ে অনিকের বাবা বিড়াল ছানাটির মুখ বাটিতে ধরলেন। আস্তে আস্তে বিড়াল ছানাটি খেতে শুরু করল। অনিক ও আনিকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল বিড়াল ছানাটিকে। হ্যাঁ খুব মায়াবী বাচ্চাটি। আদর করতে ইচ্ছে করছে। বিড়াল ছানা ম্যাও ম্যাও বন্ধ করল। খেয়ে দেয়ে ঘরের এক কোণে ঘুমিয়ে পড়ল। অনিক আনিকা চলে গেল স্কুলে।
স্কুল থেকে ফিরেই অনিক ও আনিকা বিড়াল ছানাটির খোঁজ করল। আদর করে দুধ খাওয়ালো। কোলে নিল। বিড়াল ছানাটিও ওদের পেয়ে বেশ উৎফুল্ল মনে হলো। ওদের সাথে লুকোচুরি খেলতে শুরু করল। আস্তে আস্তে ওদের সম্পর্ক হয়ে উঠল বেশ গভীর। প্রায় একবছর কেটে গেল। ইতোমধ্যে বিড়াল বাচ্চাটি বেশ বড় আর তুলতুলে হয়েছে।
একদিন গভীর রাতে বিড়ালের আর্ত চিৎকারে সবাই হুড়মুড় করে জেগে উঠল। ছাদে দস্তাদস্তির শব্দ পাওয়া গেল। বিড়ালটি এত জোরে ম্যাও ম্যাও করছে যেন বাঁচাও বাঁচাও বলছে। টর্চ নিয়ে আব্দুল আউয়াল দ্রুত ছাদের দিকে গেলেন। অনিক ও আনিকা পিছু পিছু গেল। টর্চের আলো ফেলে দেখলেন- একটা বিড়াল খেকো পোষা বিড়ালটাকে ঘাড় কামড়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। লাফ দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। অনিক ও আনিকা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না। মনের অজান্তেই দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল অনিকার দু’গাল বেয়ে। ওরা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে ওদের খেলার সাথীকে...।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT