সাহিত্য

সেঁজুতি

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০১-২০১৯ ইং ০০:৩৩:০৭ | সংবাদটি ২৯০ বার পঠিত


সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালায় সেঁজুতি। দেবতার উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন সন্ধ্যায়। তার মনে পড়ে না ঠিকঠাকভাবে কতোদিন ধরে তার এই নিত্যকর্ম। তবে মনে পড়ে, এই দৈনন্দিন অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি তার ওপর অর্পন করেছেন তার মা। তিনি রবি ঠাকুরের প্রচন্ড ভক্ত। তার গান শুনেন, কবিতা পড়েন। রবি ঠাকুরের একটি কবিতা তার খুবই প্রিয়। কবিতাটি তার মুখস্ত। প্রায় সময়ই তিনি নিজের অজান্তে কবিতাটি আওড়ান। -‘শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে/ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে। জীবনের স্মৃতিদীপে আজিও দিতেছে যারা জ্যোতি/সেই ক’টি বাতি দিয়ে রচিত তোমার সন্ধ্যারতি।...’
সেই কবিতার নামেই মেয়ের নাম রেখেছেন মা ‘সেঁজুতি’। শৈশবে সে বুঝতো না তার নামের মানে কী। বলতো সবাই সেঁজুতি তোমার নামটি বড় সুন্দর। কিন্তু এতে তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতো না; কেবল চেয়ে থাকতো ফ্যাল ফ্যাল করে। যখন বেড়ে উঠলো, বড় হলো তখন জানতে পারলো তার নামের মানেটা কী। এখন তো বোঝে; এ জন্য নিজে নিজে গর্ববোধ করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মায়ের প্রতি।
সেঁজুতি মানে সন্ধ্যাবেলা দেবতার উদ্দেশ্যে যে প্রদীপ জ্বালানো হয়। দিনের সূর্য পশ্চিমে ডুবে গেলে আঁধার নেমে আসে। আঁধারে প্রদীপ জ্বালায় সে। ঘরের আঁধার দূর হয়। দূর হয় না মনের আঁধার। ভেতরে ভেতরে গুমরে মরে কষ্টের পাহাড়। কেউ জানে না, বোঝে না। বুঝতে দেয় না সেঁজুতি। বাইরে যতোটুকু প্রাণোচ্ছল চনমনে, অন্তরে ততোটুকুই আড়ষ্ট সে। এ নিয়ে ভাবেও না তেমন একটা। ভাবনার সময় কই তার? ঘর দোরের গৃহস্থালী এটা ওটা কাজ, দুৎজনের দু’বেলা রান্না-বান্না, অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা, পূজা-অর্চনা আর রাতের ঘুম- এইতো তার সারাদিনের কার্যতালিকা। এর ফাঁকে একান্ত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার সময় নেই সেঁজুতির। তবে সাবিনাকে দেয়ার জন্য সময় বের করা তার পক্ষে তেমন কোন সমস্যা হয় না। সাবিনা তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় সখী-বান্ধবী-সহপাঠী সবকিছুই। সাবিনা চাইলে সে সব কাজ ফেলে তার সঙ্গে গল্প করতে বসে যায়। সেঁজুতিদের পাশের বাড়ি সাবিনাদের। এক সঙ্গে দু’জন বড় হয়েছে। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শুরু, তবে পাশের গ্রামের হাই স্কুলে এস.এস.সি পর্যন্ত লেখাপড়া একসাথেই করেছে দু’জন। একে অন্যের ঘরে যখন তখন প্রবেশেও কোন বাঁধা নেই। তবে সন্ধ্যার পূর্ব মুহূর্তে সব কাজ ফেলে সেঁজুতি বসে থাকে অপেক্ষায়। সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপ জ্বালায় পূজার ঘরে; প্রদীপ জ্বালায় দেবতার উদ্দেশ্যে।
সাবিনা এখন থাকে শহরে চাচার বাসায়। লেখাপড়া করে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছুটি হলেই চলে আসে বাড়িতে। ছোট্ট সুন্দর গ্রামটির উত্তর প্রান্তের শেষ বাড়ি দু’টোই সেঁজুতি-সাবিনাদের। তাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি লাগোয়া কোন বাড়ি নেই। মাঝখানে কয়েকটি বাঁশঝাড় আর মূর্তা ঝোপ পরেই একে একে অন্যান্য বাড়িগুলো অবস্থান করছে। গ্রামের উত্তর পাশেই হাওর। বর্ষায় হাওরের টইটম্বুর পানি ছুঁই ছুঁই করে সেঁজুতিদের উঠোনে। শরৎ, হেমন্ত কিংবা শীতে হাওর ছোঁয়া উত্তরী হাওয়ায় অবগাহন করে তারা। শীতের বিকেল-সন্ধ্যা ঢেকে যায় কুয়াশার অবগুন্ঠনে, অনুভূত হয় তীব্র ঠান্ডা। সেই সঙ্গে আছে গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর তান্ডব। এই সবকিছুই মাথায় নিয়ে সুখে আছে তারা। যখন শরৎ কিংবা বসন্তে পূর্ণিমার চাঁদের জোসনা আকাশ ভেঙে তাদের উঠোনের নারকেল-সুপারী গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে নেমে এসে ভাসিয়ে দেয় টিনের চাল, ধ্বধবে উঠোন, তখন আনন্দ আর ধরে না দুই সখীর। মেতে ওঠে তারা উল্লাসে। উঠোনের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে হাতে হাত ধরে হাঁটাহাঁটি করে তারা। দুই বাড়ির উঠোন একাকার হয়ে যায়। গান ধরে সেঁজুতি-‘আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে আধখানা চাঁদ নীচে....।’ থামিয়ে দেয় সাবিনা। বলে-
: দূর ছাই! আধখানা চাঁদ কোথায়? চাঁদতো শুধু তুই; পূর্ণচাঁদ একটা আকাশে আর একটা আমার পাশে। লাজে চুপসে যায় সেঁজুতি, লজ্জাবতী লতার মতো। চোখ দু’টি লাল রং ধরে। সাবিনার পিঠে সজোরে একটা থাপ্পর বসিয়ে দেয় সেঁজুতি। বলে-
: আমি যদি চাঁদ হই,তবে তুই কী?
: আমি তো চাঁদহীন রাতের অমাবশ্যার অন্ধকার। একটা কালো মেয়ের সঙ্গে কি চাঁদের তুলনা হয়?
: কে বললো, চেয়ে দেখ চাঁদের মিষ্টি আলোর রশ্মি তোর মুখের ওপর এসে কীভাবে লুকোচুরি খেলছে! বলেই ওপরের দিকে চাঁদের মুখোমুখী করে দাঁড় করালো সাবিনাকে সে।
বললো-
: নড়বিনা, এক দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে চেয়ে থাকবে।
: পলক ফেলতেও পারবো না?
: না। -সেঁজুতি সামনে যায় সাবিনার। সাবিনা মাথা নামায় না, চোখও স্থির। গুরু গম্ভীর একটা ভাব নিলো সেঁজুতি। জ্যোতিষীর মতো বললো- ‘যেভাবে আছো সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো এবং চোখ দু’টি এবার বন্ধ করো।’
: করলাম।
: তুই তো দেখছিস না তোকে, কিছুই দেখছিস না এখন। তবে আমি দিব্য চোখে দেখছি আমার সামনে এক অনিন্দ্য সুন্দর দেবী প্রতিমা দাঁড়িয়ে আছে। জোসনার প্লাবনে সে ভেসে যাচ্ছে; ভেসে যাচ্ছে-যাচ্ছে ভেসে! তাকে জাপটে ধরেছে দেবদূতের রূপ নিয়ে এক সুদর্শন যুবক। সে এখন তার বাহুবন্ধনে। দু’জনে গান গাইছে এখন ‘সেদিন দু’জনে দুলেছিনু বনে ফুলো ভোরে বাধা ঝুলনা ---’। বলেই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে সেঁজুতি। ‘দেবী প্রতিমা’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাবিনাও সন্বিৎ ফিরে পায়। তেড়ে যায় সেঁজুতির দিকে। সেঁজুতি দৌঁড়ুচ্ছে, আর বাতাসে দোল খাচ্ছে তার দীঘল কালো চুলের বেনী; জোসনার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সেঁজুতির বাড়ির আঁচল। যেন এক স্বপ্নের অপ্সরী! সাবিনা দাঁড়িয়ে যায়, চেয়ে থাকে সেঁজুতির চলে যাওয়ার পথে। সে ভাবে সত্যি সেঁজুতি অপরূপ সুন্দরী। তার হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, তার হাঁটাচলা যে কোন ছেলেকে আকর্ষণ করবে, কাছে টানবে। কিন্তু আমি!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সাবিনা।
ঘরে ঢুকে সেঁজুতি। দাঁড়ায় আয়নার সামনে। ড্রেসিং টেবিলের আয়না। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যায়। হারিকেনের আলো পড়েছে তার মুখোমন্ডল জুড়ে। বাতাসে ওড়ে আসা এলোমেলো চুলগুলো কপাল আর দুই গালে পড়ে অজানা কোন মানচিত্র এঁকে দিয়েছে। আবার কখনও মনে হচ্ছে কে যেন ধ্রুপদি কোন ছবি আঁকার কসরত করছে তার মসৃন দুই গাল জুড়ে, কিংবা কপালে। দুই হাতে চুলগুলো সরাতে চায় আলতো করে। গালে হাত বুলিয়ে লজ্জা পায় নিজেই। অনুভব করে নিজের হাত নয়, যেন কোন দেবদূত দু’টি হাত বুলিয়ে যাচ্ছে তার অবয়ব জুড়ে। চোখ বুজে। জড়ো সড়ো হয়, সংকুচিত হয়। অজানা শিহরণে লজ্জাবনত হয়ে নিজেকে লুকোতে চায়; সবার আড়াল হতে চায়, হারিয়ে যায় স্বপ্নীল জগতে। পা বাড়ায়। হাত মেলে জড়িয়ে ধরতে চায় সেই দেবদূতকে। কিন্তু ধরা দেয় না দেবদূত। কেবলই সরে যাচ্ছে দূরে...দূরে....। এক সময় হাত নামায় মুখের ওপর থেকে। চোখ খুলে। পাশের ঘর থেকে মা-র ডাক-এ মোহমুক্ত হয়, স্বপ্ন ভাঙে।
: ওখানে কী করছিস?
কিছু না মা। আসছি।
মা’র কাছে এলো সে। পাশে বসলো। মা বললেন-
: সাবিনা এলো না তোর সাথে?
: কেন মা? ডেকে আনবো?
: না। এখন না। সকালে আনিস।
: কী কোন জরুরী কথা?
: না জরুরী নয়। তবে কাল মনে করে ডেকে আনবি। আর আমাকেও মনে করিয়ে দিবি।
: আচ্ছা ঠিক আছে। কালকেরটা কালকে হবে। এখন তুমি একটা গান গাও মা। -মা-কে জড়িয়ে ধরে সেঁজুতির আবদার।
: পাগলামী ছাড়। এখন কোন গান গাইতে পারবো না। খেয়ে দেয়ে ঘুমাও।
: না মা। তোমাকে একটা গান গাইতেই হবে। ওই গানটা, তুমি যে গানটি গেয়ে কলেজে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিলে। তুমি তো আমার সঙ্গে গল্প করেছো এ নিয়ে অনেক দিন।
: কোনটা?
: তুমি কি কেবলই ছবি/শুধু পটে আঁকা.....
সেঁজুতির মা রঞ্জিতা চক্রবর্তীর একটি প্রিয় গানের কলি এটি। গানের কথা মনে পড়লেই তিনি পুলকিত হন, শিহরিত হন; কখনও স্মৃতিহীন কিংবা স্মৃতিময় জগতে হারিয়ে যান তিনি। ডুবে যান অন্ধকার খাদে; আবার কখনও ভেসে ওঠেন আলোতে। আলো আঁধারীর এই খেলায় কে জেতে আর কে হারে, তার বিচার করতে পারেন না রঞ্জিতা। তাই তিনি কখনও গুনগুন করেও গানটি গাইতে চান না। তবে মেয়ের আবদার ফেলতে পারেন নি কখনও। আজও পারছেন না। গেয়ে চলেছেন...... নয়ন সম্মুখে তুমি নাই/নয়নেরও মাঝখানে নিয়াছো যে ঠাঁই....। দরাজ কন্ঠে খালি গলায় তার এই সুরেলা গানে বিমোহিত না হয়ে পারা যায় না। সেঁজুতি চেয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে পলকহীন। মায়ের দু’চোখে জল ছল ছল। ভিজে যায় মেয়ের চোখও। ঘরের পাশের আম গাছটির পাতায় জমে থাকা শিশির বিন্দু পড়ছে টিনের চালে। দূর থেকে ভেসে আসছে পেঁচা কিংবা অন্য কোন নিশাচর পাখির ডাক; হঠাৎ শোনা যাচ্ছে বাড়ির ওপর দিয়ে ওড়ে যাওয়া বাদুড়ের ডানার ঝাপটানো। সবকিছু ছাপিয়ে রঞ্জিতা চক্রবর্তীর কন্ঠের গানের রেশ পৌঁছে যাচ্ছে আশপাশের বাড়িতে। পৌঁছে যায় সাবিনার কানেও। সকালে সাবিনার ডাকেই ঘুম ভাঙ্গে সেঁজুতির।
: কীরে, আজ এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমোচ্ছিস?
: না, কাল একটু রাত জেগেছিলাম।
: হ্যাঁ শুনেছি। আন্টির গান শুনেছি। তার ওই অতি প্রিয় গানটি গেয়েছেন। কিন্তু তারপরে? কাল কি কান্নাকাটি করেছেন আন্টি?
: হ্যাঁ -বিমর্ষ সেঁজুতি এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে উদ্দেশ্যহীন। দুধে আলতা মেশানো সুশ্রী চেহারা তার হয়ে গেছে মলিন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সাবিনা। বলে-
: তুই ই বা কষ্টের ঝাপি খুলতে যাস কেন? ওঠা যেমন ছিলো, তেমনই থাকনা।
: কী করবো বল, আমি আর পারিনারে সাবিনা। আমার সুখ-আনন্দ-কষ্ট-বেদনা সবকিছুতেই মিশে আছে বাবার নাম। আর বাবাকে অনুভব করতে গেলেই মনে পড়ে যায় ওই গানটির কথা। -সদা হাস্য প্রাণচঞ্চল মেয়েটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বান্ধবীর কোলে।
[দুই]
সেঁজুতির বাবা রঞ্জিত চৌধুরী উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র। পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গেও রয়েছে সম্পৃক্ততা। একই বর্ষের ছাত্রী রঞ্জিতাও কম যায় না। খুব মেধাবী না হলেও সাহিত্যচর্চা আর গান বাজনায় রঞ্জিতারও একটা আলাদা পরিচিতি। বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রঞ্জিতার ‘তুমি কি কেবলই ছবি’ গানটি বিমোহিত করে সকলকে। মন কাড়ে মেধাবী ছাত্র রঞ্জিত চৌধুরীরও। পরে শিল্পীকে অভিনন্দন জানানোর ছলে তার মুখোমুখি হওয়া এবং এক পর্যায়ে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা। বন্ধুত্বই দু’জনকে নিয়ে যায় ছাঁদনাতলায়। বিয়ের পিঁড়িতে বসেন রঞ্জিত-রঞ্জিতা। কী অপূর্ব যোগসূত্র! দু’জনের নামের মধ্যে পার্থক্য মাত্র একটা ‘আকার’ এর। ব্যক্তিগত রুচিবোধ, পছন্দ-অপছন্দেও নেই তেমন পার্থক্য। তবে কিঞ্চিৎ পার্থক্য ছিলো এক জায়গায়। সেটা হলো রাজপথ। মিছিল-মিটিংয়ে আপত্তি ছিলো রঞ্জিতার। কিন্তু সেই পথ থেকে ফেরাতে পারেনি রঞ্জিতকে। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সামনের কাতারে। এমনি করেই একদিন উধাও কলেজ থেকে রঞ্জিত। পরদিন কলেজের পাশের ডোবায় পাওয়া যায় রঞ্জিতের লাশ। দুই বছরের সেঁজুতিকে কোলে নিয়ে সেদিন অঝোরে কেঁদেছিলো রঞ্জিতা।
বাবার স্মৃতি খুব একটা মনে নেই সেঁজুতির। চেহারাও মনে পড়ে আবছা আবছা। দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে মা যখন নীরবে অশ্রুপাত করেন, যখন শাড়ির আঁচলে চোখ মুছেন- তখন নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয় তার।
মাকে সান্ত¦না জানানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে সে। বরং নিজেই অশান্তির অন্ধকারে ডুবে যায়। পরক্ষণেই সামলে নেয় নিজেকে। কারণ, ঘরে আর তৃতীয় কেউ নেই মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে, চোখের পানি মোছে দেবে। আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশী বলতে ওই একজনই সাবিনা। সেও তো এখন বাড়িতে থাকেনা সব সময়। -ভাবতে ভাবতে নিজেকে আরও ছোট মনে হয়; মনে হয় এতো ছোট তাদের পৃথিবী! এভাবে কি বাঁচতে পারে মানুষ? মনে পড়ে যায় প্রদীপের কথা। পাশের গাঁয়ের প্রদীপ এক সময় আসতো সেঁজুতিদের বাড়িতে নিয়মিত। আত্মীয়তার বন্ধন না হলেও তাদের পরিবারের সাথে ছিলো তার একটা নিবিড় সম্পর্ক। ভদ্র সুদর্শন প্রদীপ কীসের টানে আসতো সেঁজুতিদের বাড়িতে সেটা বোঝা না গেলেও নিয়মিত আনাগোনার সুবাদে তার প্রতি কিছুটা হলেও দুর্বলতা তৈরী হয়ে গিয়েছিলো সেঁজুতির। সে নিজেও তা হয়তো বুঝতে পারেনি। বুঝেনি প্রদীপও। সেই দিন বিদায়বেলায় সেঁজুতি পথ আগলেছিলো প্রদীপের। বাড়ির উত্তর পাশের রাস্তায় শিমুল গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে সেঁজুতি বলেছিলো- আজ না গেলেই কি নয়? থেকে যান না একদিন। মা-ও বলেছিলো আপনাকে থেকে যাওয়ার কথা বলতে।
: না, কাজ আছে। -বলেই অন্যদিকে চেয়ে চেয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো প্রদীপ। মুখোমুখি দাঁড়ায় সেঁজুতি। বলে-
: আমরা এই ক্ষুদ্র দু’জন মানুষের সামান্য আবদারটুকু রক্ষা করা কি আপনার জন্যে খুবই দুঃসাধ্য? আমরা কি এতোই অবহেলার পাত্র? -বলেই সেঁজুতি দু’হাতে চেপে ধরেছিলো প্রদীপের ডান হাতটি। যদিও হাতটি জোর করে ছাড়িয়ে নেয়নি প্রদীপ; কিন্তু এতোকিছুর পর একবারও সেঁজুতির চোখে চোখ রাখেনি প্রদীপ। বরং চোখ দু’টি নামিয়ে নিলো নীচের দিকে। সেঁজুতি আস্তে আস্তে ছেড়ে দিলো প্রদীপের হাত। ভাবলো ¯্রােতস্বিনী নদীর ¯্রােততো ঠেকানো যায়না। যে চলে যেতে চায় তাকে কোনকিছুতেই আটকানো যাবেনা। পশ্চিম দিগন্তে ডুবন্ত সূর্যের শেষ অংশটুকু দেখা যাচ্ছে। সেদিকেই সরু পথ ধরে চলে গেলো প্রদীপ। সেই সন্ধ্যা কিংবা রাতকে এতোই নিকষ কালো অন্ধকার মনে হয়েছিলো তার কাছে, এমন অন্ধকার সে জীবনেও কখনও দেখেনি। সে রাতে ছিলো বাসন্তি পূর্ণিমা। বাইরে এসে নিকানো উঠোন আর বারান্দায় ছুটোছুটি করে জোসনায় হইহুল্লোর করেনি সে। এমন কি উত্তরের জানালা খুলেও একবার চাঁদের আলোয় গাছের পাতার নাচন উপভোগ করেনি। ভাবে সে এখানেই বুঝি তার নামের সার্থকতা! মনে মনে সেলুট দেয় মাকে, কবিগুরুকে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দেবতার উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরাধনায় নিমগ্ন হয়; এর প্রতিদান বুঝি এই! মনের অজান্তেই তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়-‘শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে/ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে।’ কী আশ্চর্য্য রকমের মিল রয়েছে কবিগুরুর স্বপ্নের মানসী আর সেঁজুতির মধ্যে। ‘তবে কি কবিগুরু তার মতোই কোন নিভৃত পল্লীর স্বপ্নতাড়িত কোন এক সেঁজুতিকে নিয়ে লিখেছিলেন কবিতাটি?
কিন্তু এই সবকিছুই ভুলে যেতে চায় সে। গত পাঁচ বছর অনেক চেষ্টা করেছে ভুলে যেতে। প্রায় সারা বছরই একরকম ভুলেই থাকে সে। কিন্তু বছরের শেষে চৈত্র্য সংক্রান্তি এলেই খুলে যায় স্মৃতির ঝাপি। কারণ তাদের গ্রামের পাশের মাঠে চৈত্র্য সংক্রান্তির মেলায়ই প্রথম পরিচয় ঘটেছিলো প্রদীপের সঙ্গে। বাচ্চারা যখন নাগরদোলায় দুলছিলো, সেঁজুতি বান্ধবীর সঙ্গে গিয়েছিলো নাগরদোলার মঞ্চে। তখন নিজেকে এই বাচ্চাদের মতোই মনে হয়েছিলো। কল্পনায় সে হারিয়ে গিয়েছিলো। একেবারে শৈশবে। সাবিনা যখন হাত দিয়ে পিঠে ধাক্কা দিয়েছিলো, তখনই সে সম্বিৎ ফিরে পায়। সামনে একটি ছেলেকে ইশারায় দেখালো সাবিনা -তোর সামনাসামনি তাকা।
: কী?
: ওই দেখ নীল পাঞ্জাবী পরা ছেলেটি।
: হ্যাঁ, দেখলাম।
: খুব সুদর্শন না?
: হয়তো। - হাসে সাবিনা; গড়িয়ে পড়ে সেঁজুতির গায়ের ওপর।
: কী হয়েছে তোর বলবি? -সাবিনার দুই কাঁধে একটু জোরে ধরেই ধমকের সুরে বললো সেঁজুতি।
: কিছুই হয়নি আমার। তবে তোর কিছু একটা হয়েছে।
: হেয়ালী রাখ। বল কী হয়েছে আমার।
: দেখলাম তো তোর হরিণ চোখ দু’টি কেমন যেন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিলো ওই ছেলেটির দিকে, মনে হচ্ছিলো তোর চোখ দু’টি যেন অনেক কিছুই বলতে চায়, কিন্তু বলিসনি। তবে আমি জানি অব্যক্ত সেই কথাগুলো। -সেদিন তারা নিজে থেকেই ছেলেটির সঙ্গে আলাপ করেছিলো এর পর থেকে প্রদীপ হয়ে যায় সেঁজুতিদের পরিবারের নিয়মিত অতিথি।
বিগত কয়েকটি বছর চৈত্র্য সংক্রান্তি এলেই ভেতরে কী যেন একটা কিছু তোলপাড় শুরু করে দেয়। সেঁজুতির বিশ্বাস প্রতি বছরই মেলায় আসছে প্রদীপ। কিন্তু সে যাবে না মেলায়। যায়নি গত পাঁচটি মেলায়। তবে এবার যাবে। শুনেছে সাবিনা বাড়িতে এসেছে। চলছে তার বিয়ের গুঞ্জন। সাবিনার বিয়ের আগে হয়

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT