মহিলা সমাজ

চার দেয়ালে বন্দী শৈশব

রুমা আক্তার মুন্নি প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০১-২০১৯ ইং ০০:২১:৫৩ | সংবাদটি ২৫১ বার পঠিত


শৈশব! শৈশব শব্দটিতে লুকিয়ে আছে অজ¯্র আবেগ, চঞ্চলতা আর দুরন্ত বেগে ছুটে চলার এক অদ্ভুত শক্তি। শৈশব হল স্বপ্ন দেখার আর জীবনকে উন্মোচিত করার সময়। কিন্তু এমন মিষ্টি সময়টাতেই যদি শিশুকে নিয়মের চার দেয়ালে বন্দী করা হয় তাহলে কেবল সার্টিফিকেট অর্জনকারীই পাব, মানুষ পাব না। আজকালের শিশুরা, বিশেষ করে শহুরে শিশুরা জীবন বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ে ওঠেছে। এদের ভেতরে নেই স্বতঃর্স্ফূততা। অধিকাংশ শিশুদের পরিবেশ প্রতিবেশির নিয়ে কোনো আগ্রহই নজরে পড়ে না। কারণ সেই জগৎ তার বা তাদের কাছে অচেনা। তাদের সমানে ইটের দেয়ালের মতো নিয়মের দেয়াল সাজানো আছে, সেখানে তাদের পরিবেশ নিয়ে আগ্রহ থাকাটা বেশ অসম্ভবই বলা চলে। জসিম উদ্দীনের ছড়া ‘মামার বাড়ি’ আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই/ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই।
এই ছড়া তারা মুখস্ত করলেও বাস্তবিক জীবনে তারা ছাড়ার মানেটাই জানে না। তাদের শৈশব ইটের দেয়ালের ভেতরই আটকে যাচ্ছে। শীতের ছুটিতে, কিংবা পরীক্ষা শেষ হলে আত্মীয়দের বাড়ি বেড়াতে যাবার যে রীতি, সেটাও তাদের অজানা। আজকাল বাচ্চার মুখ দিয়ে কথা ফোটার সাথে সাথেই তাকে নামিয়ে দেওয়া হয় বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে। যার ফলে সে প্রথমেই শিখে নেয় প্রতিযোগিতা ছাড়া উপায় নেই। যে বয়সে বাতাসের মতো ছুটে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই তাদের কাঁধে তুলে নিতে হয় প্রায় সাত কেজি ওজনের ভারী ব্যাগ। কিছু দিন আগে সকাল আটটায় যাত্রা পথে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম কয়েকটা বাচ্চা ব্যাগ কাঁধে চোখ মুছতে মুছতে স্কুলে যাচ্ছিলো, দেখে মনে হলো তাকে ঘুম থেকে টেনে হেঁচড়ে তার অভিভাবক নিয়ে যাচ্ছেন, আমি একজনের ব্যাগ তুলে দেখলাম ছয় কেজির কম হবে না। আমি হতবাকের মতো ভাবলাম ব্যাগে কি আছে বই খাতা নাকি পাথর?
যে বয়সে তাদের খেলতে খেলতে শিখার কথা সেই বয়সেই তারা নিজের ওজনের তুলনায় বেশি ওজন নিয়ে শিখতে যাচ্ছে স্কুলে? সে কি সত্যিই শিখছে নাকি আতঙ্কে, ভয়ে কেবল মুখস্তই করে চলেছে? গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ খ্রি. তারিখে একটি বাচ্চা মেয়ে নার্সারীতে পড়ে, সে এসে আমাকে বলছে ‘আপু পড়াশোনা ভালো লাগে না, এতো কষ্ট, ইচ্ছা করে মরে যাই।’ তার মুখে এমন কথা শুণে আমি রীতিমত অবাক হই। চার পাঁচ বছর বয়সের একটি মেয়ে যে কি না পরীক্ষায় ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পায়, তার মুখে এমন কথা শুনলে যে কেউই আশ্চর্য্য হবেন। যদি হাসতে খেলতেই শিখানো হয়ে থাকে তবে চার পাঁচ বছর বয়সের মেয়ের মুখে এমন ভয়ঙ্কর কথা কেন?
স্কুল থেকে ফেরার পথে গাড়িতে কিছু ফাস্টফুড খেয়ে টিউশনে কিংবা কোচিংয়ে যাওয়া এবং বাসায় ফিরে আবারও গৃহশিক্ষকের সামনে বসা এর মধ্যে যদি একটু সময় মিলে তখন টেলিভিশন দেখা বা কম্পিউটারে, ট্যাবে খেলতে বসা। এই রুটিনের মধ্যেই বন্দী তাদের শৈশব।
এই ঘণ্টা মিনিটের হিসাব করা রুটিন সম্পর্কে অধিকাংশ অভিভাবকরাই উত্তর দিলেন স্কুলে এই চাপের ভেতরে যদি গল্পের বই তুলে দেই, তাহলে প্রতিযোগীতার দৌড়ে বাচ্চা পিছিয়ে পড়বে। তাছাড়া বাইরে মাঠ নেই, নেই নিরাপত্তা। সে জন্যেই ঘরেই যতটা সম্ভব বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
সত্যিই এ যেন ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগীতা, কে কার আগে প্রথম হতে পারে। অবশ্য এই কঠিন প্রতিযোগীতার যুগে অভিভাবকরা যা করেন তা তো শিশুর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই করেন।
শিশু কোন স্কুলে পড়বে, নার্সারি বিভাগ থেকেই তাকে সব পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে, এমনকি নাচ-গান ও খেলাতেও তাদের প্রথম হতে হবে এ মানসিকতার ফলে শিশুদের বিকাশে বাধা পড়ছে।
একটা সময় ছিলো যখন যৌথ পরিবারের শিশুরা কোথায় খেলতো সে বিষয় নিয়ে এতো কড়া নজরদারি ছিলো না, ফলে শৈশবে বিশাল জগৎ দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু এখন মুখস্ত করার প্রবণতা, সব কিছুতেই সবারই প্রথম হওয়ার অদম্য ইচ্ছা এবং বাবা মায়ের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে গিয়ে শিশুদের নাজেহাল অবস্থা। শিশুরা কি চায় আমরা তা জানতেও চাই না বরং আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো চাপিয়ে দেই তাদের উপর। ফলে শিশু পরীক্ষায় পাশ করে ঠিকই কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা শিখতে পারে না, যার ফলে আমরা যে একটা প্রজন্মকে ধ্বংস করে ফেলছি সেটা ভেবেও দেখছি না। অথচ আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কর্ণধার।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT