ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০১-২০১৯ ইং ০১:২২:৪৫ | সংবাদটি ১৮১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং- বৃহস্পতিবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪০৬ বাংলা, ১৮ নভেম্বর ১৯৯৯ খ্রি., দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি।)
দফা নং-খ-১৪। জেলা পরিষদ আইনের ‘(ক) ৩২ নং ধারার উপধারা (১) ও উপধারা (২) এ পরিষদে সরকারের উপসচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সচিব হিসাবে থাকিবেন এবং এই পদে উপজাতীয় কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
‘খ) ৩২ নং ধারার উপধারা (২) সংশোধন করিয়া নি¤েœাক্তভাবে প্রণয়ন করা হইবে ও পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবে এবং তাহাদেরকে বদলী ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে উক্ত নিয়োগ ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।
‘গ) ৩২ নং ধারার উপধারা (৩) এ পরিষদের অন্যান্য পদে সরকার পরিষদের পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ করিতে পারিবে এবং এই সকল কর্মকর্তাকে সরকার অন্যত্র বদলি সাময়িক বরখাস্ত অপসারণ অথবা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে। বিধি বহির্ভুতভাবে এখানে সাম্প্রদায়িক স্বশাসন ও আঞ্চলিক স্বশাসন ক্ষমতা প্রদত্ত হয়েছে, অথবা এটা স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা ও বলা যায়। তবে সংবিধানের স্থানীয় শাসন আইনে এরূপ ক্ষমতা মান্য নয়। বাঙালিদের পক্ষে বঞ্চনামূলক এরূপ আইন সংবিধান বিরোধী।
আইনে স্থানীয় বাঙালিদের প্রতিপক্ষ করে উপজাতীয় পশ্চাদপদতার জন্য তাদের দায়ী করাও শাস্তি প্রদান দুর্ভাগ্যজনক।
এখানে চুক্তির ভূমিকাংশের অঙ্গিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। ভূমিকায় অঙ্গিকার ছিলো : পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন।
কেবল উপজাতীয়দের জন্য অগ্রাধিকার মানে তা সর্বাধিকার। বাঙালি জনগোষ্ঠী বেজাত অউপজাতীয় তো হয়েছেই, তাদের সংখ্যানুপাতিক অধিকারও রহিত। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দান ও অমান্য করা হয়েছে। উপজাতীয় অগ্রাধিকার তা গ্রাস করে নিয়েছে। এর মানে হলো সংবিধানে প্রদত্ত সমানাধিকার ও লজ্জিত। বাঙালিরা এখানে বর্নাশ্রমে আক্রান্ত নি¤œশ্রেণীর নাগরিক।
যদি বাস্তবে উপজাতীয়রা পশ্চাতপদ হয়ে থাকে, আর তা কাটাবার জন্য অগ্রাধিকার দান প্রয়োজনীয় হয়, তা হলে তার প্রতিকারে বাঙালিদের বঞ্চিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ ন্যায্য কাজ নয়। উপজাতীয় উন্নয়নকে স্থানীয় বাঙালিরা কোন ভাবে গ্রাস করেনি বা ঠেকিয়ে রাখেনি। উন্নয়ন বা পশ্চাদপদতা সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। বাঙালিরা খোদ বঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠি। তাদের বঞ্চিত আর দরিদ্র রেখে প্রতিবেশি উপজাতিদের ভাগ্যোন্নয়ন করা অসম্ভব। উভয়ের জীবন পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হবেই। উন্নয়নের স্থানীয় ভোগ্য অংশ, উপজাতীয়দের পশ্চাদপদতা কাটাতে এককভাবে যথেষ্ট নয়। উপজাতীয় উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন তাদেরকে জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। স্থানীয় বাঙালিদের ভোগ্য সুযোগ-সুবিধা অতি অল্প ও নগণ্য। তা থেকে বাঙালিরা বঞ্চিত হলে, তদ্বারা উপজাতীয় বঞ্চনা ও চাহিদা পূরণ হবে না। এর পরিণতি হবে বাঙালি অসন্তোষ আর সাথে সাথে উপজাতীয় চাহিদার অপূর্ণতা জনিত তাদেরও অসন্তোষ। এটা হলো বাঁদরের পিঠা ভাগ। অংশীদারদের তাতে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। যদি সরকার উপজাতীয় কল্যাণে সত্যিকার আন্তরিক হোন তা হলে ভেদনীতি ত্যাগ করে জাতীয়ভাবে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ সুবিধা-দানের নীতি গ্রহণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হতে পারেন। ভিক্ষার চাল ছিনতাই করে লাভ নেই, দরকার ভা-ারের।
উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ কেবল আঞ্চলিক ক্ষমতা লাভের প্রতি প্রলুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক কুপমন্ডুকতায় আবদ্ধ।
জাতীয় রাজনীতিকরা ও তাদেরকে ক্ষুদ কুড়োতে তুষ্ট রাখতে ব্যস্ত। এ ধারার রাজনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের ভাগ্যোন্নয়নের আশা করা যায় না।
পার্বত্য অঞ্চল বাসী পাহাড়ী বাঙালি যতদিন রাজনৈতিক চেতনায় পরস্পর থেকে ভিন্ন থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তারা সাম্প্রদায়িক ভাবে পরস্পরের বৈরী হয়ে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত এখানে অশান্তি আর পশ্চাদতার অবসান হওয়া অনিশ্চিত। এখানকার পশ্চাদপদতা কাটাতে তাদেরকে জাতীয় ভান্ডারে ভাগ বসাতে হবে। দুই সম্প্রদায়ের পরস্পরের বিরোধ ও কাড়াকাড়িতে তার নাগাল পাওয়া যাবে না। যার পরিণতি অশান্তি ও পশ্চাদপদতা। উদার অসাম্প্রদায়িক ও দুরদৃষ্টি সম্পন্ন পার্বত্য নেতৃত্বের পক্ষে দরকার, প্রতিদ্বন্দ্বী দুই সম্প্রদায়কে এক রাজনৈতিক সূত্রে গ্রথিত করে একত্রে আন্দোলন করা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা। আর তখনই কেবল সুখ ও শান্তির আশা করা যাবে। বর্তমান সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী চিন্তা চেতনা পশ্চাদমুখী। এ থেকে রেহাই কাম্য। দরকার অসাম্প্রদায়িক ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির।
দফা নং-খ এর নং ১৫ থেকে ২৫ পর্যন্ত বিষয়গুলো সম্পূর্ণ প্রশাসনিক এবং সরকার ও জেলা পরিষদের আভ্যন্তরীন ব্যাপার তাতে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত নেই। তাই সেগুলো আলোচনা থেকে বাদ রাখা হলো।
‘খন্ড-খ ২৬। জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে :
ক) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাস জমি সহ কোন জায়গা জমি পরিষদের পুর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত ক্রয় বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না। এই বক্তব্যটি সংবিধান ও সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতার উপর হস্তক্ষেপ।
তবে শর্ত থাকে যে রক্ষিত বনাঞ্চল কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
চুক্তিভুক্ত এই দফার বলে, আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে দাবী উত্থাপিত হয়েছে যে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট ভূমি ব্যবস্থাপনা হস্তান্তর করা হোক এবং জেলা প্রশাসন কর্তৃক বন্দোবস্ত দানের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করে আদেশ জারি হোক। অথচ আসল ব্যাপার হলো চুক্তির উপরোক্ত সিদ্ধান্ত আর জনসংহতি সমিতির দাবীকৃত দফা নং ২/(৫ ক) ও ২(৫ ক) ও (২৫ খ) মূলে ৪৬৫২.৯৬ বর্গ মাইল এলাকা বিরোধমুক্ত জাতীয় অঞ্চল, পরিষদীয় অঞ্চল নয়।
উপজাতীয় পক্ষের এই দাবীর ভিত্তি হলো সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনের প্রথম তপসিলভুক্ত ২৪ নং আইটেমটি, তাতে ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার কথা অন্তর্ভুক্ত আছে। চুক্তিভুক্ত এই ক্ষমতা ও ছাড় ৪৬৫২.৯৬ বর্গ মাইল এলাকার উপর প্রযোজ্য নয়।
এই ছাড়ের দ্বারা উপজাতীয় পক্ষ উল্লসিত হলেও চুক্তিতেই শুভঙ্করের ফাঁকি বিদ্যমান। কোন জেলা পরিষদের হাতেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য খাস জায়গা জমি নেই। সরকারের প্রাপ্য বিরাট অঞ্চলই তাকে ছাড়তে হবে। আমার হিসাবে তিন জেলা পরিষদের এখতিয়ারাধীন অঞ্চল মাত্র ৪৪০.০৪ আর জনসংহতি সমিতির হিসাবে ৪৪৬ বর্গ মাইল মাত্র। উপরোক্ত আইনের দ্বিতীয় প্যারার তাৎপর্য্য তা-ই।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT