ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা

সুজিত দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০১-২০১৯ ইং ০১:২৭:৫৫ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

পাহাড়-টিলা, বাগান-জলপ্রপাত ও নদীবেষ্টিত অঞ্চল সিলেট। সুদীর্ঘ নদী সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইনসহ ছোট-বড় নদীগুলো ঘিরে রেখেছে পবিত্র নগরী সিলেটকে। সুরমা বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘ একটি নদী। যার উৎপত্তি ভারতের মণিপুর পাহাড়ে, সেখান থেকে নদীটি বরাক নদী নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে একটি সুরমা ও অন্যটি কুশিয়ারা নামে পরিচিতি লাভ করে। সুরমা সিলেট দিয়ে এবং কুশিয়ারা মৌলভীবাজার দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এক সময় বাণিজ্য ক্ষেত্রে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদীপথ, তখন সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব কার্যক্রমই নদীপথে পরিচালিত হতো। বর্তমানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাতায়াত ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে, সড়কপথে অতি দ্রুত সময়ে যাতায়াত করা যাচ্ছে। কাজেই নদীপথের চাহিদা একেবারেই কমে যাচ্ছে! ময়লা-আবর্জনা, নদী দখল, ভরাট ইত্যাদি কারণে ঐতিহ্যবাহী সুরমা নদী আজ মৃতপ্রায়। শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে যায়, মানুষ গড়ে তোলে ঘর-বাড়ি, বসত-ভিটা! সিলেট শহরের অভ্যন্তরেই নদীর ওপর স্থাপন করা হয়েছে তিনটি সেতু। সম্প্রতি গড়ে ওঠা কাজিরবাজার সেতু স্থাপনের পর শুস্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যায়, বাচ্চাদের খেলার জায়গা হয়ে যায় সুরমার বুক।
সুরমা, ক্বীন ব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি মানেই সিলেট। এককথায় এই তিনটি বস্তু সিলেটের সৌন্দর্যকে যেমন বাড়িয়েছে কয়েকগুণ তেমনি ঐতিহ্যকে করেছে সমৃদ্ধ। সুরমা নদীর ওপর ১৯৩৬ সালে ক্বীন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়, লোহা দিয়ে তৈরি এই ব্রিজের তৎকালীন সময়ে আর্থিক ব্যয় ছিল ৫৬ লাখ টাকা। আসামের গভর্নর মাইকেল ক্বীন সিলেটে আগমনের সময় এই ব্রিজ নির্মাণ করা হয় এবং তার আগমনকে স্মৃতিসমৃদ্ধ করে রাখতে তার নামানুসারে ব্রিজটির নাম করা হয় ক্বীন ব্রিজ। আর ব্রিজটি ঘিরেই দাঁড়িয়ে আছে আলী আমজাদের বিখ্যাত ঘড়িটি। সুরমা নদী সিলেট ও সুনামগঞ্জের কৃষির প্রাণ। বিশেষ করে বোরো মৌসুমের ধান উৎপাদনে এই নদীটির গুরুত্ব সর্বাধিক। বর্ষাকালে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ অঞ্চলই প্লাবিত হয় সুরমার স্রোতে। উজান থেকে পানির চাপ নিম্নগামী হয়ে এই দুই জেলাকে প্লাবিত করে। বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা মাছের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। আর মাছের চাহিদা পূরণ হয় সুরমা নদী ও নদী থেকে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল তথা হাওর থেকে। এ ক্ষেত্রে সুরমা নদী কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ; কিন্তু এই সুরমাই যখন আরেকটু ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখনই বন্যা হয়, যা কৃষকদের সুন্দর জীবন পরিচালনায় অন্যতম প্রধান অন্তরায় বা বাধা। সুরমা নদীর গভীরতা সর্বোচ্চ ১৭০ মিটার। নদীটি সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব বাজারের কাছে কালনী নামে মেঘনায় মিলিত হয়েছে, যার বিস্তৃতি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই সুদীর্ঘ নদীটির পানি দিন দিন ময়লা-আবর্জনায় ভরে যাচ্ছে, দখল করে নদীপাড়ে গড়ে উঠছে বসতি, ভরাট করা হচ্ছে নদী। সিলেট শহরেই নদীপাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দালানকোঠা ও মার্কেট। অচিরেই এই বেদখল হওয়া নদীপাড় উদ্ধার না হলে এবং নদী খনন করা না হলে কয়েক বছর পর সুরমা হয়তো শুধু নামেই বেঁচে থাকবে, বাস্তবে নয়! আমরা সেই সুরমা চাই যার পানির বেগ থাকবে, গভীরতা থাকবে, থাকবে দূষণমুক্ত পানি। আর এই নদী বাঁচলেই বাঁচবে কৃষক, জেলেসহ নানা পেশার মানুষ।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • লোকসংস্কৃতি ও আমাদের সাহিত্য
  • শীতের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস
  • বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অতীত ও বর্তমান
  • নাটোরের জমিদার রানী ভবানী
  • ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সাহিত্য সাময়িকী নিশানা
  • জলসার একাল-সেকাল
  • স্তম্ভবিহীন মসজিদ
  • বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা
  • হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ
  • Developed by: Sparkle IT