শিশু মেলা

মাঝরাতে জানালার পাশে খচমচ আওয়াজ

কণিকা রশীদ প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০১৯ ইং ০০:৫৩:০৯ | সংবাদটি ১৯৬ বার পঠিত

সব ঠিকঠাক আছে, এই মর্মে ডাক্তার কাকু অন্তুর পায়ের প্লাস্টারটা খুলে দিলেন। পরদিন সকালেই অন্তুকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো। অনেক দিন পর বাড়িতে এসে খুব ভালো লাগল অন্তুর। কিন্তু তারপর ফের খারাপ লাগা। কতো আর শুয়ে দিন কাটানো যায়! সে-ই কবে থেকে এক নাগাড়ে শুধু শুয়ে থাকা। স্কুলে যাওয়া নেই, খেলাধুলা নেই, এমনকি হেঁটে চলে বেড়ানোর উপায়ও নেই। কতো আর ভালো লাগে! অথচ একদম বিনা দোষে ভেঙে গেলো পা-টা। অন্তুর দোষ ছিলো না। বড় ভাইয়ারা ফুটবল খেলছিলো। অন্তু আর ওর প্রিয় বন্ধু আবির খানিকটা দূরে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছিলো। ফজলু কাকাও বসে ছিল মাঠের পাশে, সন্ধ্যা হলে অন্তুকে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। তার মধ্যেই হঠাৎ তীরবেগে ছুটে এলো ফুটবলটা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচ- জোরে আঘাত করলো অন্তুর পায়ে। আট বছরের ছোট্ট অন্তু মাটিতে পড়ে গিয়েও কিন্তু প্রথমে বুঝতে পারেনি ওর আঘাতটা কতটুকু। ফজলু কাকা ছুটে এসে যখন ওকে দাঁড় করাবার চেষ্টা করলো, তখন অন্তু আর দাঁড়াতেই পারলো না। ফজলু কাকা কোলে তুলে ছুটে বাড়ি নিয়ে এলো। ভাগ্যিস ছুটির দিন ছিলো। তাই বাবা বাড়িতে। তক্ষুণি অন্তুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পরীক্ষা করে দেখা গেলো হাঁটু আর গোড়ালির মাঝ বরাবর ভেঙেছে হাড়টা। পুরো পা-জুড়েই বড় একটা প্লাস্টার করে দিলেন ডাক্তার কাকু। আর অন্তু হয়ে গেলো বিছানাবন্দি। শুরুর দিকে ব্যথা আর কষ্ট ছিল বেশি। তবে খারাপ লাগতো না অন্তুর। তারপর যতোই দিন যেতে লাগলো ব্যথা-বেদনা কমে গেলো। আর মনের ভেতর জমতে শুরু করলো মন খারাপের মেঘ। হাঁটা-চলা বন্ধ হয়ে গেলো যে! তাই কিচ্ছু ভালো লাগে না ওর। খেতে, শুতে, এমনকি কথা বলতেও একদম ইচ্ছে করে না। হাসপাতালে পালা করে সবাই দেখতে আসতো। সঙ্গে আনতো খেলনা, বই কিংবা চকোলেট। প্রথম প্রথম ভালো লাগতো অন্তুর। কিন্তু পরে আর সেগুলোও ভুলিয়ে রাখতে পারতো না। বাড়ি আসার পর ওর ঘরটা খেলনা আর বইয়ে ভরে উঠল। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ছোট কাকু এলেন বিদেশ থেকে। সুটকেসভর্তি অন্তুর জন্য খেলনা এনেছেন। খেলনার পাহাড় হয়ে উঠল তার ঘর! তবু অন্তুর মন ভালো হলো না। কারণ এখনও ও হেঁটে বেড়াতে পারে না। একটা ছোট ক্রাচ দিয়েছেন ডাক্তার কাকু। তাই বলে হাঁটা এতো সহজ! অন্তুর তো মাটিতে পা ফেলতেই ভরসা হয় না। হাঁটার চেষ্টা তো দূরের কথা!
মাঝরাতে অন্তুর জানালার পাশে বারান্দা থেকে খচমচ আওয়াজ হলো। তার সঙ্গে আবার মৃদু একটা কুঁই কুঁই শব্দ। ঘুম ভেঙে গেলো অন্তুর। আবার ঘুমোবার অনেক চেষ্টা করেও আর ঘুম এলো না। ভোরবেলা যখন ফজলু কাকা এলো ওকে সকালের কর্মকা-গুলোতে সাহায্য করতে, তখনই অন্তু ওকে জানালো। ফজলু কাকা বারান্দায় গিয়ে ‘ওমা; এ কী কা-!’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। তারপর ঘরে এলো একটা সাদা ধবধবে কুকুরছানা কোলে করে। সেটার একটা পায়ে কালচে লাল ছোপ। ফজলু কাকা বললো, ‘কেউ মেরে ঠ্যাং ভেঙে দিয়েছে ছানাটার।’ শুনে অন্তুর মন কেমন করতে লাগলো। ফজলু কাকা হাঁটাবার চেষ্টা করলো ওটাকে। কিন্তু না, ব্যথায় কুঁই কুঁই করে উঠলো ছানাটা। শুয়ে পড়লো মাটিতে। চুন-হলুদ গরম করে কুকুরছানার পায়ে লাগিয়ে দিলো। বেঁধে দিলো পা। অন্তুকে বড়ো ভালোবাসে ফজলু কাকা। এতোদিন বাদে ওকে অনেকখানি উত্তেজিত আর খুশি হতে দেখে ভীষণ ভালো লাগলো তার। আর তাই অন্তুকে আরও খানিকটা খুশি করতেই কোথা থেকে যেন একটা পুরনো ঝুড়ি খুঁজে আনলো। তার ভেতরে পুরনো কাপড়-চোপড়, আরও কী কী সব দিয়ে একটা সুন্দর ছোট্ট বিছানা বানালো। তারপর সেটার মধ্যে ছানাটাকে রাখলো। ছানাটাও দিব্যি আরামে রইলো তাতে। ছোট্ট, আদুরে ছানাটার নাগালের মধ্যে দুধ, বিস্কুট, রুটি এমন নানা খাবার রেখে যায় ফজলু। অন্তু শুয়ে শুয়ে কিংবা খাটে হেলান দিয়ে দেখে ছানাটাকে। কতোই না কষ্ট হয় ওর! তবু হ্যাঁচড়প্যাঁচড় করে উঠে আসে, খাবারটুকু খায়। দিন পনেরো পরে একদিন অন্তু দেখলো, ছানাটা তার ঝুড়ি থেকে নেমেছিলো কিংবা পড়ে গেছে। কিন্তু কিছুতেই আর তার ঝুড়ির বিছানায় উঠতে পারছে না। তবুও অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত ছানাটা ঘরের কোণে বসে রইল চুপটি করে। অন্তুর ভীষণ ইচ্ছে করলো বুকে জড়িয়ে ধরে ওকে ওর নরম বিছানায় শুইয়ে দিতে। কিন্তু কীভাবে! অন্তুকেই তো সবকিছু করিয়ে দিতে হয়। আধঘণ্টাও হয়নি। অস্থির হয়ে আবার উঠে বসলো। ওমা, অবাক কা-! ছানাটা দিব্যি উঠে পড়েছে ঝুড়িতে। কেবল তাই নয়, ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে গভীর ঘুমে। কী যে ভালো লাগলো অন্তুর! মন খারাপের মেঘেরা পালিয়ে যেতেই বুকের ভেতরটা ঝলমল করে উঠল রঙিন আলোয়। আরও দিন সাতেক পর অন্তু খেয়াল করলো কুকুরছানাটা অনেক কষ্ট করে হেঁচড়ে, ঝুলে ঝুলে নেমে আসে ওর ঝুড়ি থেকে। তারপর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করে। খানিক বাদে আবার কখন যেন উঠে পড়ে নিজের জায়গায়। অন্তুর কী জানি কী মনে হলো! দুপুরে যখন খাবার নিয়ে এলো ফজলু কাকা, অন্তু বললো, ‘খাবার টেবিলে নিয়ে যাও। আমি ওখানে খাব।’ ফজলু যখন ওকে কোলে তুলে নিতে এলো, মৃদু বকুনি দিল অন্তু ‘আরে না! আমি তো নিজে নিজেই যাবো।’ ফজলুর মুখ শুকিয়ে গেলো, ‘যদি কিছু হয়!’ কিন্তু না। খোঁড়াতে খোঁড়াতে অন্তু ঠিকই গিয়ে বসল খাবার জায়গায়। মাসখানেকের মধ্যেই অন্তু মহা আনন্দে পা টেনে টেনে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতে লাগলো। অন্তুর মনের সব মেঘ সরে গিয়ে যেন ঝলমলে রোদ্দুর উঠেছে ওর মনের ভেতরে। তাই বোধহয় ও ছানাটার নাম রাখল ‘রোদ্দুর’। আর পরের মাসে ও যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, ওর পিছু পিছু খুশিতে নেচে নেচে খোঁড়া পায়ে ছুটতে লাগলো রোদ্দুরও। মহা আনন্দে মেতে রইলো দু’টিতে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT