শিশু মেলা

দুর পাহাড়ের কান্না

জাফর সাদেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০১৯ ইং ০০:৫৬:৪৫ | সংবাদটি ৪৭ বার পঠিত

সে অনেকদিন আগের কথা। এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় ছিল একটি ছোট্ট ঝর্ণা। সে ঝর্ণার জলে বাস করত একটি প্রতিবন্ধী ব্যাঙ।
ব্যাঙটির মনে খুব দুঃখ, তার সামনের বাম পা ছিল ডান পায়ের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা। এই লম্বা পায়ের জন্য তাকে সারাজীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে লাফাতে হয়েছে, সাঁতার কাটতে হয়েছে। অথচ তার অন্য ভাই-বোনেরা দেখতে এত সুন্দর ছিল যে পুরো জলাভূমিতেই তাদের সৌন্দর্য নিয়ে অনেক কল্পকথা রচিত হয়েছে। তার মনে প্রচ- আক্ষেপ, সে যদি তার অন্য ভাই-বোনদের মতো দেখতে হতো!
খুঁড়িয়ে চলে বলে সবাই তাকে নিয়ে উপহাস করে। তার বাব-মাও কখনো তাকে ভালো জামা কাপড় কিনে দিত না, ভাল খাবার দিত না। অন্যদের একটি করে ডিম খেতে দিলে তাকে অর্ধেক ডিম খেতে দিত। অন্য ভাই বোনদের মতো সে পর্বতের চূড়ায় ঘাস ফড়িংদের সঙ্গে খেলতে যেত পারত না, তাকে কেউ খেলায় নিত না। কিন্তু তার মনটা ছিল বেশ উদার। তার দুঃখকে চাপা দিয়ে অন্যের বিপদে সে সবার আগে হাজির হতো।
সেই দুঃখী ব্যাঙটির মতোই একটি দুঃখী ছোট্ট মেয়ে বাস করত সেই ঝর্ণার কাছেই। সে ছোট্ট মেয়েটির নাম ছিল কলিউর। কলিউর নামের অর্থ ‘সকালের তারা’। সে ছিল তারার মতোই সুন্দর এবং ফুটফুটে। কলিউরের বাড়ি ছিল পাহাড়ি উপত্যকার একটি ছোট গ্রামে। তাদের গ্রামটিও ছিল ছবির মতো সুন্দর। তরুলতায় ঘেরা নীল পাহাড়ি গ্রাম পাখিদের কলতানে সারাক্ষণ মুখর থাকত।
কলিউর ছিল এক মেষ পালকের মেয়ে, সে নিজেও মেষ চরাত। একদিন মেষ চরানোর সময় এক প্রকা- দুষ্ট শকুন তাকে ছোঁ মেরে নখে আটকে তুলে নিয়ে আসে। সেদিন থেকে কলিউরের বন্দি জীবন কাটে শকুনের প্রকা- বাসায়। শকুনটি ছিল যেমন কুৎসিত তেমনি ছিল অত্যাচারী। কলিউরকে দিয়ে বাসার সব কাজ করাত। তার বিছানা বুনন, কার্পেট বুনন, জামা সেলাই, কাপড় কাচা এবং রান্না-বান্নাসহ সব কাজ। কাজে একটু ভুল হলেই তার ধারালো নখ দিয়ে খুঁচিয়ে কলিউরকে রক্তাক্ত করত। কলিউর ভাবত এ জীবনে তার এ বন্দি দশা থেকে কখনো মুক্তি মিলবে না। তার দীর্ঘশ্বাস ভারি করে তুলত পুরো পাহাড়ের বাতাস।
প্রতিবন্ধী ব্যাঙটি মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখত প্রকা- শকুনটি বিশাল ডানা মেলে আকাশে উড়ছে আবার ছোঁ মেরে তার শিকার ধরে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ব্যাঙটি জলের ওপর এসে শকুনের বাসার দিকেও নজর রাখত। ব্যাঙটি শুনতে পেত একটি ছোট্ট মেয়ের কান্না ভেসে আসছে শকুনের বাসা থেকে। এই কান্নায় ব্যাঙটি ভীষণ কষ্ট পেত।
একদিন বিষয়টি ভালভাবে বোঝার জন্য দয়ালু ব্যাঙটি ঘুরতে ঘুরতে চলে আসল শকুনের বাসার কাছে। দেখত পেল দুষ্ট শকুন বন্দি করে রেখেছে একটি ফুটফুটে মেয়েকে। বুঝতে পারল এ মেয়েটির কান্নাই সে সব সময় শুনতে পেত। ব্যাঙটি আড়ি পেতে শকুন আর মেয়েটির কথা শোনার চেষ্টা করল। শুনতে পেল-
-এই, আমার দুপুরের খাবার কই !
-জ্বি মনিব, এটা প্রস্তুত আছে, আপনি যখন চাইবেন খেতে পারবেন।
-মনিব, আমাকে কিছুক্ষণের জন্য ঝর্ণার ধারে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমি আমার কাপড় চোপড়গুলো একটু ধোব।
- না দুষ্ট মেয়ে, মোটেই না, আমার সঙ্গে চালাকি করো না, তুমি ঠিক পালিয়ে যাওয়ার ফন্দি আঁটছ।
-না মনিব, আমি পালাব না, আমি কাপড় ধুয়েই চলে আসব। আপনি যতক্ষণ আমার কাপড় পেটানোর শব্দ শুনবেন, বুঝবেন আমি কাপড় কাচছি।
-ঠিক আছে যাও, তোমার কাপড় কাচার শব্দ যদি শুনতে না পাই আমি তক্ষণি তোমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে আসব।
তারপর কলিউর তার কাপড় চোপড় একটি গাঁটে বেঁধে ঝর্ণার ধারে গেলে। একটি পাথরের ওপর বসে কলিউর কাপড় আছড়ে ধুতে লাগল ঝর্ণার জলে। প্রতিটি আছাড়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কান্নার শব্দ মিশে যাচ্ছিল পাহাড়ের বাতাসে। এমন সময় একটি ছোট আওয়াজ কানে আসলো কলিউরের। কলিউর দেখতে পেল একটি কিম্ভুতকিমাকার ব্যাঙ বসে আছে তার পাশেই একটি পাথরের ওপর। ব্যাঙটির একটি পা বিদখুটে রকমের লম্বা। এমন ব্যাঙ কলিউর কখনো আগে দেখেনি।
ব্যাঙটি অত্যন্ত সহানভূতির সঙ্গে কলিউরকে বলল, আমি তোমাকে এখান থেকে পালাতে সাহায্য করব। কলিউর ঘুরে গিয়ে আবার কাপড় আছড়াতে আছড়াতে বলল, এ পৃথিবীতে আমাকে সাহায্য করারমতো কেউ নেই। ব্যাঙটি আবার বলল-
-কিন্তু আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। আমি দেখতে কদাকার হলেও আমি একটি যাদু জানি। আমি ইচ্ছে করলেই যে কারও রূপ ধারণ করতে পারি। আমি তোমার রূপ ধারণ করে তোমার মতো কাপড় আছড়াতে থাকব সেই ফাঁকে তুমি পালিয়ে যাবে। আর এভাবে দুষ্ট শকুনটিকে আমরা বোকা বানাব।
কলিউর বলল, এভাবে কী কাজ হবে? তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ব্যাঙটির দিকে তাকিয়ে দেখল সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। আনন্দে সে ব্যাঙটিকে হাতে তুলে নিয়ে তার কপালে একটি চুমু খেল। মুহূর্তেই ব্যাঙটি অবিকল কলিউরের মতো হয়ে গেল এবং কলিউরের হাত থেকে কাপড় নিয়ে কলিউরের মতো আছড়াতে লাগল। কলিউরকে বলল আর একটুও দেরি নয়, তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাও, আমি তোমার কাজ করতে থাকি।
মুহূর্তেই কলিউর ব্যাঙের কথামতো কাজ করলো, এবং প্রাণপনে ছুটে তার পাহাড়ি গ্রামের দিকে দৌড়াতে থাকল। ব্যাঙটি কাপড় আছড়াতে থাকল। দুষ্ট শকুন বুঝতেই পারল না এখানে কী ঘটছে, সে শুয়ে শুয়ে শুধু কান খাড়া করে রাখল কাপড় আছড়ানোর আওয়াজ বন্ধ হয় নাকি। দীর্ঘক্ষণ পরও যখন আওয়াজ বন্ধ হচ্ছে না, শকুন ভাবল কী হচ্ছে একবার দেখে আসি। মেয়েটি সারাটি দিন এখানেই কাটিয়ে দেবে নাকি!
এটা ভাবতেই শকুন দ্রুত উড়ে গিয়ে ঝর্ণার ধারে গেল, দেখল কলিউর কাপড় আছড়ে যাচ্ছে। শুকুন রাগে গজগজ করতে করতে তারা লম্বা ধারালো ঠোঁট দিয়ে কলিউরের গায়ে আঘাত করতে গেলে। কিন্তু সে আঘাত বাড়ি খেল পাথরের বুকে। মুহূর্তেই ব্যাঙটি ঝর্ণার জলে মিলিয়ে গেল।
শকুনটি বেশ কিছুক্ষণ জলের উপর থেকে কলিউরকে খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পেল না। রাগে গজ গজ করতে করতে শকুন ফিরে যায় তার বাসায়।
এদিকে ব্যাঙটি তার অন্য ভাইবোনদের কাছে ফিরে আসল। ব্যাঙটি হঠাৎ দেখল তার লম্বা পা একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সেও তার ভাইবোনদের মতো অনেক সুন্দর হয়ে গেল। এমন সময় তার অন্য ভাইবোনেরা কলিউর কলিউর বলে চিৎকার করতে লাগলো। দয়ালু ব্যাঙটির কপালে যেখানে ছোট্ট মেয়ে কলিউর চুমু খেয়েছিল ঠিক সে জায়গায় একটি তারা সৃষ্টি হল যে তারাটি সকালের তারা কলিউরের মতো জ্বলজ্বল করে পুরো ঝর্ণার জলকে উজ্জল করে দিল।
[গল্পটি পেরুভিয়ান রূপকথা ‘দ্য ফ্রগ অ্যান্ড দ্য কনডর’ অবলম্বনে রচিত]

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT