ধর্ম ও জীবন

মহানবির চারিত্রিক গুণাবলী

মোঃ মোস্তফা মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০২-২০১৯ ইং ০১:১৩:৩৫ | সংবাদটি ৩০১ বার পঠিত

মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্বের সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব। তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার কল্যাণ ও করুণার আলোকিত দৃষ্টান্ত। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল অনুপম। তাঁর সৌন্দর্যে সমস্ত অন্ধকার আলোকিত হয়েছিল। অপূর্ব চরিত্র আর অনুপম সৌন্দর্যে তিনি মন্ডিত ছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত।’ মহানবি (সা.)-এর চরিত্র সব মানুষের জন্য একটি উত্তম অনুকরণীয় আদর্শ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের জীবনে রয়েছে সুন্দরতম আদর্শ।’ তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।
আল্লাহর উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস : মহানবি (সা.) একজন একনিষ্ট বিশ্বাসী হিসেবে আল্লাহর মনোনিত ধর্ম ইসলামের জন্য কাফেরদের অত্যাচার সহ্য করলেও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারাননি। আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাসী হওয়ার জন্য তিনি নিঃস্ব ও রিক্তহস্তে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন এবং স্বল্পসংখ্যক মুসলমানকে নিয়ে বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হন। উহুদের যুদ্ধে পরাজিত হলেও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা বিশ্বাসের কারণে পরবর্তী সময়ে সমগ্র আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেন।
সত্যবাদিতা : মহানবি (সা.)-এর চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ছিল সত্যবাদিতা। তিনি বাল্যকাল থেকেই মিথ্যা, বঞ্চনা ও প্রতারণাকে ঘৃণা করতেন। যার ফলে তিনি অল্প বয়সেই ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর ঘোর শুত্রু আবু জেহেল প্রায়ই বলতেন, ‘মুহাম্মদ, আমি বলি না তুমি মিথ্যাবাদী, কিন্তু তুমি যা প্রচার করছ তা আমি সঠিক বলে মনে করি না।’ মহানবি (সা.)-এর সত্যবাদিতা সম্পর্কে টমাস কার্লাইল বলেন, ‘মুহাম্মদ শৈশব থেকেই চিন্তাশীল ছিলেন। তাঁর সাথিরা তাঁকে ‘আল-আমিন’ বলে ডাকত। সত্যবাদী ও বিশ্বাসী এ মানুষটি কথায়, কাজে ও চিন্তায় তাঁর পরিচয় দিয়েছেন।’
বিনয়ী ও ন¤্র : মহানবি (সা.) ছিলেন ন¤্রতা ও বিনয়ের অমর প্রতীক। তিনি কোনো দিন কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলেননি। চরম শুত্রুদের সাথেও তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কথা বলতেন এবং কেউ তাঁর ক্ষতি করলেও তাকে ক্ষমা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। উধারফ এবড়ৎমব ঐড়মধৎঃয-এর ঞযব চবহবঃৎধঃরড়হ ড়ভ অৎধনরধ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে পি. কে. হিট্টি বলেন, ‘যরং ফধরষু নবযধারড়ঁৎ যধং রহংঃরঃঁঃবফ ধ পধহড়হ যিরপয সরষষরড়হং ড়নংবৎাব ড়ভ ঃযরং ফধু রিঃয পড়হংপরড়ঁং সরসপৎু. ঘড় ড়হব ৎবমধৎফবফ নু ধহু ংবপঃরড়হ ড়ভ ঃযব যঁসধহ ৎধপব ধং ঢ়বৎভবপঃ সধহ যধং নব বসরঃধঃবফ ংড় সরহঁঃবষু.” অর্থাৎ, ‘তাঁর দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অথবা মামুলি ধরণের আচরণগুলোও এক-একটি অনুশাসন তৈরি করেছে, লাখ লাখ মানুষ সেগুলো আজও সচেতনতার সাথে অনুসরণ করে আসছে। মানবজাতির আর কোনো অংশই তাঁর মতো আর কাউকে পরিপূর্ণ মানুষরূপে গ্রহণ করে তাঁর আচরণগুলো এত সুক্ষভাবে অনুসরণ করেনি।
ক্ষমাশীল : মহানবি (সা.) ছিলেন ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রাণঘাতী দুশমনকেও তিনি ক্ষমা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। মক্কা ও তায়েফ বিজয়ের সময় তিনি যে ক্ষমার আদর্শ দেখান বিশ্বের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত নেই। পি. কে. হিট্টি বলেন, ‘বিজয়ী (মক্কা বিজয়) মুসলিম বাহিনী মক্কা প্রবেশের সময় যেরূপ মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছিল প্রাচীন ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। তাঁর আচার-ব্যবহার, ক্রিয়াকর্মাদি বিশ্বের এক-অষ্টমাংশ লোকজনের জীবনাদর্শের ভিত্তি হয়ে গেছে। সৈয়দ আমীর আলী বলেন, ‘এত কোমল অথচ বীরোচিত স্বভাব শুধু শ্রদ্ধাই নয়, ভালোবাসাও অনুপ্রাণিত করত।’
শান্তিপ্রিয় : শৈশব থেকেই মহানবি (সা.) একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। যুদ্ধের হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদ, তাঁর হৃদয়কে ব্যথিত করত। যুদ্ধের অবসান ঘাটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে গঠন করেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি শান্তিসংঘ। তিনি একজন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে সর্বদাই অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করতেন। তাঁর কাছে বন্ধু-শত্রু সবাই সমান সম্মান ও মর্যাদা পেত।
অনাড়ম্বর জীবনযাপন : শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে করতে মহানবি (সা.)-এর জীবনে সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনাচরণ স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই মদিনার বিশাল ইসলামি সা¤্রাজ্যের শাসক হয়েও তিনি কখনো রাজকীয় আড়ম্বরে জীবন অতিবাহিত করেননি। পি. কে. হিট্টি বলেন, ‘তাঁর জীবনের অখ্যাত অধ্যায়ের মতো গৌরবময় অধ্যায়েও তিনি একটি মাটির বাড়িতে সাদাসিধা জীবন যাপন করতেন। বর্তমান আরব ও সিরিয়ার পুরানো ধাঁচের বাড়ির মতো তাঁর বাড়িতেও ছিল কয়েকটি ঘর এবং তার সামনেই ছিল উঠোন। আর এই উঠোন দিয়ে প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করা যেত। প্রায়ই তাঁকে নিজের কাপড় সেলাই করতে দেখা যেত এবং সর্বদাই সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর দ্বার ছিল অবারিত (আরব জাতির ইতিহাস, অনুবাদ জয়ন্ত সিং, পৃষ্টা-১১২)।
আর্তের ও দুঃখী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু: মহানবি (সা.) ছিলেন এতিম, অনাথ, অসহায় ও সর্বহারাদের অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি নিজে অভুক্ত থেকে এবং অশেষ কষ্ট স্বীকার করে তাদের সাহায্য করতেন। আর্ত ও দুস্থ মানবতার নিঃস্বার্থ সেবায় তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি অশেষ দুঃখ ভোগ করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর মতো মানুষের শুভাকাঙ্খী এবং অকৃত্রিম দরদি বন্ধু আর কাউকে দেখা যায় না।
ন্যায়পরায়ণতা : ন্যায়পরায়ণতা ছিল মহানবি (সা.)-এর অত্যুজ্জ্বল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক ছিলেন। সর্বপ্রথম পৃথিবীতে তিনিই ন্যায়পরায়ণতার আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমার ¯েœহধন্য কন্যা ফাতিমাও চুরি করে, তবে আমি তার হাত কাটতেও ইতস্তত করতাম না।’
ওয়াদা পালন : ওয়াদা পূরণ করা মহানবি (সা.)-এর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতিশ্রুতি পালন না করাকে তিনি জঘন্যতম পাপ বলে অভিহিত করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে অঙ্গীকার পালন করে না তার ধর্ম নেই।’ তিনি নির্দেশ দেন, ‘তোমরা যখন অঙ্গীকার করবে, তখন তা পালন করবে।’ পরিশেষ এস. এম. ইমামুদ্দিনের কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বলা যায়, ‘মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে সব নবির ব্যক্তিত্ব প্রোথিত ছিল। তাঁর মাঝে মুসার পৌরুষত্ব, দাউদের সাহসিকতা এবং ঈসার মানবিকতা গুণ উপস্থিত ছিল। তিনি ছিলেন নবিদের নক্ষত্রপুঞ্জের সূর্য, যিনি ঐ আলো সব গতিপথে বিকিরণ করেছেন। বিশ্বব্যাপী হতাশাগ্রস্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের স্বার্থে সমগ্র বিশ্ব মুসলিমদেরকে মহানবির আদর্শ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলী বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা আবশ্যক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT