ধর্ম ও জীবন

আবহা থেকে মদীনা

সাঈদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০২-২০১৯ ইং ০১:১৪:১৮ | সংবাদটি ১০৯ বার পঠিত

১৯৮৬ সালের এক ঐতিহাসিক ক্ষণে আবহা থেকে পবিত্র মদীনায় এসে পৌঁছি। আমার জন্য অপেক্ষমান ছিলেন ভাইজান মাওলানা রশীদ আহমদ চৌধুরী। তিনি মদীনায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। তখন আমাদের পারিবারিক মূল ব্যবসা খামিস মতির মাহাইল আল আবহা।
বড় ভাইজান ডা. শাব্বির আহমদ চৌধুরী ১৯৭২ সাল থেকে সাউদী আরবে বসবাস করেন। প্রায় এক যুগ ছিলেন মক্কা মুকাররমায়। তারপর চলে আসেন মদীনা মুনাওয়ারায়। খামিস মতির বাষিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, খুব বেশি দিন হয়নি। সেখানে তিনি আমাদের কন্সট্রাকশন ব্যবসা তদারকি করেন। মেঝো ভাইজান হাফেজ মাসউদ আহমদ চৌধুরী ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও গাওয়া দেখাশোনা করেন। সেঝো ভাইজান মাওলানা ফায়্যাজ আহমদ চৌধুরী ওয়েল্ডিং এবং আমি ওয়ার্কশপ এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট পরিচালনা করি।
বাদশাহ ফাহাদ আসবেন মদীনা মুনাওয়ারায়। তিনি আসছেন খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধি ধারণ করে অর্থাৎ কাস্টোডিয়ান অফ টু হলি মস্কস বা দুই পবিত্র মসজিদের অভিভাবক হিসেবে। হিজ ম্যাজেস্টি উপাধি বাদ দিয়ে নতুন উপাধি গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম মদীনায় আগমন। বাদশাহ ফাহাদকে কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স পরিদর্শন এবং মক্কা-মদীনা জিয়ারত ও সরেজমিন ফিচার তৈরী করাই আমার মুখ্য উদ্দেশ্য।
বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ চর্চা ও অনুশীলন ছড়িয়ে দেয়ার ব্রত নিয়ে আগের বছর (১৯৮৫ সালে) ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে মদীনায় এ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন বাদশাহ ফাহাদ। যেখান থেকে অনুবাদ ও অনুবাদ ছাড়া দু’ধরনের কুরআন মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়। অন্ধজনও যাতে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারেন সেজন্য রয়েছে ব্রেইল পদ্ধতির সংস্করণ। এ প্রকল্পে বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের অডিও ও ভিডিও ফর্মে কুরআনের সিডি, ডিভিডি তৈরি ও সরবরাহ করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৭ কোটি কুরআন ছেপে বিশ্বব্যাপী বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে সাউদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল খতীব কর্তৃক আমন্ত্রণের সুযোগ পেয়ে নিজেকে খুব প্রসন্ন মনে হল। খতীবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে মন। ইসলামী ব্যাংক, ইবনেসিনা হাসপাতাল সহ বাংলাদেশে তার অনেক সৃষ্টিশীল কর্মকান্ড ইতিহাস হয়ে আছে। তারপরও একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাকে যেভাবে জেনেছি, এখানে এসে মনে হল তিনি তার চেয়ে অনে বড় মাপের মানুষ।
আবহার খামিস মতির থেকে মদীনা অনেক দীর্ঘ পথ। প্রায় সারা রাত কেটেছে রাস্তায়। দীর্ঘ ভ্রমণ খুব ক্লান্তিকর হলেও প্রাপ্তির পরিমাণটা বেশিই ছিল। দূরন্ত গতিতে দু’ঘন্টা চলার পর গাড়ি থেমেছে একটি পেট্রোল স্টেশনে। আধ ঘন্টার যাত্রা বিরতি। প্রচন্ড গরম আর গাড়ির ঝাকুনিতে খানিকটা ক্লান্তি আর গলায় খুশখুশে কাশি ধরেছে। নিকটস্থ গাওয়া তথা আরবীয় কফি শপে ঢুকেছি আমরা।
গাওয়া সাউদি আরবে বহুল প্রচলিত পানীয়। গরম পানিতে এলাচির গুঁড়া, লবঙ্গের গুঁড়া সহ নানা রকম মসলা দিয়ে এটা তৈরি করা হয়। ছোট কাপে বেশ সময় নিয়ে ছোট ছোট চুমুকে খেতে হয়। এতক্ষণে তিন কাপ খাওয়া হয়ে গেছে।
গাওয়া খেয়ে শরীর মন বেশ চাঙা মনে হল। গলায় খুশখুশে ভাবও সরে গেছে। আমার সাথে আব্দুল্লাহ আবু জাহের। মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার সাথে গল্পে মশগুল হয়ে পড়ি। গাড়ির ড্রাইভার মনে করিয়ে দিলেন দশ মিনিটের মধ্যে যাত্রা শুরু হবে। জানতে চাইলাম পরবর্তী বিরতি কোথায়, কখন? ড্রাইভার সালিম বললেন বাওবাব। এখান থেকে ষাট মাইল হবে।
পাথুরে পাহাড়ের মধ্য দিয়ে পথঘাট। অপেক্ষাকৃত ঢালে কোথাও কোথাও বসতি রয়েছে। মাঝে মাঝে ঝোপ আর গুল্ম। ক্যাসেট প্লেয়ারে চলছে আরবী হামদ। কখন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেছি। হঠাৎ সালিমের কন্ঠস্বর। স্যার, আমরা বাওবাব এসে গেছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT