সাহিত্য

সাহিত্যে শীতের বয়ান

মুহম্মদ তোবারক আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০২-২০১৯ ইং ০১:০৯:১৭ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত


ঋতু বেচিত্র্যের আকর্ষণীয় খেলায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে শীত। এটি ছয় ঋতুর পঞ্চম স্থান দখল করে আছে। ঋতু পরিক্রমায় হেমন্তের পর আসে শীত। হেমন্তে আগাম বার্তা ঘোষিত হয় শীতের। শীত মানেই কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘরের ভেতর অবস্থান করা। বাংলা বারো মাসের মধ্যে পৌষ ও মাঘ দুই মাস একটি নির্দিষ্ট সময় জুড়ে শীতের তীব্রতার জানান দেয়। তবে অনেকেই শীতকে বাংলাদেশের নিজস্ব ঋতু বলে মেনে নেন না। মনে করেন বাংলাদেশের প্রধান কিংবা নিজস্ব ঋতু বর্ষা। বর্ষা আসে গজেন্দ্র গমনে। কিন্তু, শীত তেমনি আসে না। শীত আসে শিশিরের মতো।
শীতকালে চারিদিক কুয়াশায় ঢাকা থাকে। কবির কল্পনায় কুয়াশাকে মশারী টানানোর সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেউ কেউ চাদর বলেও অভিহিত করেছেন। মাঝে মধ্যে অনেক বেলা অব্দি সূর্য দেখা যায় না। রোদের তাপ কমে আসে। সূর্য তখন দক্ষিণ দিকে হেলে পড়ে। তবে পৃথিবীর পূর্ব গোলার্ধে অবস্থান বলে বাংলাদেশের উপর কর্কটক্রান্তি রেখার অবস্থান হওয়ায় পুরোপুরি শীতের দেখা পায়না বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের মানুষ। শীতে রাতের তুলনায় দিন ছোট হয়। পরপর কয়েকদিন ধরে সূর্যের দেখা না পাওয়ায় শীত জেঁকে বসে। উত্তরে হীমেল হাওয়া বইতে শুরু করে এবং তখনই নামে হাড় কাঁপানো শীত। তাপমাত্রা ক্রমশঃ নিচের দিকে নামতে শুরু করে। পুকুরে, খালেবিলে এমনকি নদীতেও পানি শুকিয়ে যেতে থাকে। আসলে তখন পানি জলীয় বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায়। পুকুরের দিকে তাকালে মনে হয় ধোঁয়া উঠছে উপরের দিকে। তাপমাত্রা নিচের দিকে নেমে যেতে যেতে এক পর্যায়ে শূন্য ডিগ্রিতে নেমে আসে। তখন খুবই অসুবিধা হয় সাধারণ মানুষের। দৈনন্দিন চলাফেরায় বিঘেœর সৃষ্টি হয়। মানুষ অনেক বেলা অব্দি ঘর থেকে বের হয় না। রাস্তায় এবং নদীপথ কিংবা আকাশ পথে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নদীতে বড় বড় নৌকা ও ফেরি চলাচল মারাত্মক আকার ধারণ করে। দুর্ঘটনার আশংকায় দীর্ঘ সময় ধরে জল, স্থল এবং আকাশ পথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে থাকে। সহজ কথায় মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। তখন দরিদ্র দিন মজুর কাজ পেয়ে অর্থকষ্টে ভোগে। তাদের শীত নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাব দেখা দেয়। জীর্ণ কুটিরের বাসিন্দাদের এ সময় অশেষ কষ্ট ভোগ করতে হয়। শীতের তীব্রতায় কিংবা প্রচ- কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে দু’চারটি মৃত্যুর খবরও ভেসে আসে সংবাদ মাধ্যমে। তারপরও শীত আমাদের আপদ নয়; যেমনটি হয় পশ্চিমে, উত্তর কিংবা দক্ষিণ মেরুতে।
শীত যে শুধুই কষ্ট বয়ে আনে এমনটি নয়। শীতের আনন্দও কম নয়। দরিদ্র ব্যাপক জনগোষ্ঠির কষ্ট হলেও, সম্পন্ন লোকজন এ সময় দামী ও চোখ জুড়ানো শীতের কাপড় পরিধান করে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। ঝড়বৃষ্টি থাকে না বলে অনেক দূরে আনন্দ ভ্রমণে চলে যায় সৌখিন লোকেরা। দূরের পাহাড়, নদীর তট, সমুদ্র সৈকত তখন অপরূপ শোভায় জেগে ওঠে। মাঠ জুড়ে সোনালী ফসলের সমারোহ। যদ্দূর চোখ যায় হলুদ পাপড়ি গালিচা বিছানো দৃশ্যই শুধু দেখা যায়। কবির বর্ণনায় তা হয়ে ওঠে বাক্সময় ‘সরষে বালা নুইয়ে গলা হলদে হাওয়ার সুখে/মটর বোনের ঘুমটা খুলে চুম্ দিয়ে যায় মুখে।
সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা জুড়ে আছে শীত। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি পশ্চিমা সাহিত্য জুড়ে আছে শীতের তীব্রতা। মার্কিনী কবি রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর কবিতায় শীতের ছবি আঁকতে গিয়ে বলেন, স্টপিং বাই উড্স্ অন এ স্নোয়ী ইভিনিং। সি এস লুইস তাঁর 'দ্য লায়ন, দ্য উইচ এন্ড দ্য ওয়ারড্রোব’ গ্রন্থের বিষয়বস্তু নির্বাচন করেছেন শীতকে। গ্রন্থটির আখ্যান ভাগে সর্বদা শীত বিরাজিত। আরসুলা কে জেন্স তাঁর ‘দ্য লেফট হ্যান্ড অব ডার্কনেস' এবং আলেক্স রেমন্ড তাঁর ফ্লাস গর্ডন' উপন্যাসে শীতকে ব্যবহার করেছেন সার্থকভাবে। কিন্তু, কবি সিডোন গাব্রিয়াল শীতকে দেখেছেন অন্যভাবে। তার বর্ণনায় আমরা পাই জানুয়ারী মান্থ অব
একটি পকেট! লেট আস এনডিউর দিস এভিল মান্থ।' অর্থাৎ শীতকে তিনি তুলনা করেছেন শয়তানের সাথে। তবে ইংরেজ নাট্যকার আন্তন চেখভ সহজ কথায় প্রতীকী উপমা দিতে গিয়ে সবচেয়ে সুন্দর কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন- মানুষ সুখী হলে জানতে চায় না এটি শীত না বসন্ত। ইংরেজী কবিতায় শীত এসেছে ব্যাপকভাবে। ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপিয়ার তাঁর উইন্টার টেল’ নাটকে শীতকে উপস্থাপন করেছেন শৈল্পিকভাবে। তবে কবি কালিদাস কী জানি এক অজানা কারণে শীত ভুলে বর্ষাকে মাধ্যম করেছিলেন। প্রিয়তমার সাথে দেখা করার জন্য। বৈষ্ণব কবিতায় অবশ্য বর্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এমনকি চর্যাপদেও শীতের উপস্থিতি নেই। তবে মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্যে নায়িকার বারো মাসের কষ্ট বর্ণনায় শীত এসেছে অনিবার্যভাবে। ষোড়ষ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চ-ীমঙ্গল কাব্যে শীতকে উপস্থাপন করেছেন এভাবে-
‘পউষে প্রবল শীত মুখী যগজন
তুলিপাড়ি আছাড়ি শীতের নিবারণ
ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক
মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক।’
আবহমান বাংলার প্রবাদ প্রবচনে শীতের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন ‘এক মাঘে শীত যায় না’ কিংবা কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ ইত্যাদি। কিন্তু বাঙালি কবির আহবান আমরা শুনতে পাই শীতেই। যেমন- ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে ছুটে আয়। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, শীতের হাওয়া হঠাৎ ছুটে এলো/গানের হাওয়া শেষ না হতে/মনের কথা ছড়িয়ে এলোমেলো/ভাসিয়ে দিল শুকনো পাতার স্রোতে। তখন সত্যিই আমরা নতুন এক আবেশ মনে অনুভব করি। তবে কখনো কখনো মনে হয় কবিগুরু শীতকে মৃত্যু কিংবা নির্মম অর্থে উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘শীতের প্রবেশ’ কবিতায় তিনি যখন বলেন, শীত যদি তুমি মোরে দাও ডাক দাঁড়ায়ে দুয়ারে/সেই নিমেষেই যাব নির্বাক অজানার পাড়ে। তখন মনে হয় শীত সব খোয়ানোর কাল। এই কবিই আবার বলেন, ‘এসেছে শীত গাহিতে গীত বসন্তেরই জয়। শীতকে জীবনের একটি পর্যায় হিসেবে দেখেছেন ইংরেজ কবি পি বি শেলী। তিনি লিখেন, ‘ও উইন্ড! ইফ উইন্টার কাম্স, ক্যান স্প্রিং বি কার বিহাইন্ড। পি বি শেলীর কবিতার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন আমাদের প্রিয় বিদ্রোহী ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর শীতের সিন্ধু’ কবিতায় আমরা পাই ‘ওগো মোর লীলা সাথী অতীত বর্ষার/আজিকে শীতের রাতে নব অভিসার। কাজী নজরুল ইসলামের মতো শীতকে আহ্বান জানিয়েছেন পল্লী কবি জসীম উদ্দিনও। তাঁর ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায় যখন পড়ি ‘ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির ঝরা ঘাসে/সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।' কিংবা চলতে পথে মটরশুটি জড়িয়ে দু’খান পা/বলছে ডেকে গায়ের রাখাল একটু খেলে যা’ তখন শীতকেই পাই কাছে। জসীম উদ্দিন তার কাল সে আসিবে কবিতায় শীতকে তাপসী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার নিমন্ত্রণ কবিতায় শীতের বহু উপমা আমরা লক্ষ্য করি।
আধুনিক গদ্য কবিতার নান্দনিক নির্মাতা কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর রূপসী বাঙলা' কাব্যগ্রন্থে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রূপায়িত করেছেন তা শীতকে অবলম্বন করেই। ‘শীত রাত’ শীর্ষক কবিতায় কবি বলেন, ‘এসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে/বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে কিংবা পাতা। বস্তুতঃ প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র রচনায় শীত ও হেমন্তকেই ধারণ করেছেন। কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের রচনায় শীতকে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত ‘কোনো এক মাকে’ শীর্ষক কবিতায় কুমড়ো ফুলের বর্ণনায় শীতের সন্ধান মেলে। নগর কবি শামসুর রাহমান তাঁর প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্য গ্রন্থে বলেন, ‘দু’টুকরো রুটি না পাওয়ার ভয়ে শীতের রাতেও এক গা ঘুমেই বিবর্ণ হই’ কিংবা শান্ত রূপালী স্বর্গ শিশিরে স্নান করি আমি’ (রূপালী স্নান)। শক্তিমান আধুনিক কবি আল মাহমুদ শীতকে তাঁর রচনায় এনেছেন কালেভদ্রে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তরে আমরা পাই কখনো ভোরের রোদে শিশিরের রেণু মেখে পায়/ সে পুরুষ হেঁটে যায় কুয়াশার দেহ যায় ঢেকে। এভাবে আধুনিক কবিদের কিছু পংক্তিমালা উল্লেখ করা যায়। কবি মহাদেব সাহা লিখেন- শীতের সেবায় তবে সেরে ওঠি। বুকের ভেতর মাঘ নিশীথের আবছা কুয়াশা’ (তুমি: মাহবুব সাদিক)। শীতের ঢেউ নামি আসিবে ফের/ আমার বুড়ো হাড়ে ঝনাৎকার’ (আব্দুল মান্নান সৈয়দ)।
সাহিত্য যেহেতু জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, তাই জীবনের সাথে মিশে শীতও এসেছে প্রচ্ছন্নভাবে। কুয়াশার চাদর সরে গিয়ে ধীরে ধীরে এক সময় জেগে ওঠে সূর্যি মামা। ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে মানুষ। শীতল দেহে যেন নতুন এক প্রাণ জেগে ওঠে। কিষাণ বধূরা ওঠোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কাজে। কেউবা ধান শুকানো, কেউবা পিঠা বানানো, কেউবা খেজুরের রস সগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটায়। এ সময় নানা রকম পিঠা হয় ঘরে। পুলি, ভাপা, চিতই, পাটিসাপ্টা, নারিকেল, চই, মুড়কি মোয়া, পায়েস এ রকম অসংখ্য প্রকৃতির খাবার প্রস্তুত হয় এই ঋতুতে। চিড়া কুটার ধুম পড়ে পাড়ায় পাড়ায়। নতুন বধূ শ্বশুর বাড়ি যায় আবার কেউবা যায় বাপের বাড়ি। তবে সময়ের তালে এখন আর বধূর পালকী চড়ার দৃশ্য চোখে পড়ে না। পালকীর স্থান দখল করেছে সুসজ্জিত দামি কার’। ঘোড়া কিংবা গরুর গাড়িও আজকাল চোখে পড়ে না। গাঁয়ের বধূরা চিড়া কুটার সময় কোনো কোনো অঞ্চলে গেয়ে থাকে ‘চিড়া কুটি সইলো/মনের কথা কইলো’। শীতে শুধু যে পিঠা পায়েস হয় তাই নয়, শীতের প্রধান আকর্ষণ হরেক রকম শাক সজি। এ সময় পাওয়া যায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, টমেটো, শালগম, মুলা, লাউ, লালশাক, পালংশাক, ক্ষিরা ইত্যাদি। ঘ্রাণযুক্ত স্বাদ বর্ধনকারী ধনে পাতার কথা না বললেই নয়। এ সময় নতুন আলুর ভর্তা, টাকি মাছ কিংবা শুটকী ভর্তা, বেগুন ভর্তা এমনকি সকল প্রকার তরকারিতে ধনে পাতার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে যা বছরের অন্য আর কোনো ঋতুতে পাওয়া যায় না।
শীতকে অনেকেই রুক্ষ্ম ঋতু বলে শান্তি পান। কিন্তু, এই রুক্ষ্মতার আড়ালে এই শীতকালেই আমরা দেখা পাই বিশেষ প্রকৃতির কিছু ফুলের। পাতা ঝরার মর্মর ধ্বনি প্রকৃতি প্রেমিদের উদাস করে তোলে। কোননা কোনো গাছ এ সময় সত্যিকার অর্থে পত্রহীন হয়ে পড়লেও গাঁদা, ডালিয়া, কসমস, গোলাপ ইত্যাদি ফুল দূর করে দেয় মানুষের মনের সেই রুক্ষ্মতা। কুয়াশার শিশির বাহারি ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা অবস্থায় তার উপর যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন তা হীরার মতো ঝলমল করতে থাকে। ভাবুক দৃষ্টিতে এক পলক সেদিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায়। মনে হয় মহান সৃষ্টিকর্তা কী এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে সাজিয়েছেন শীত ঋতু!
শীতের অতিথি পাখি এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। উত্তরে হিমালয় অঞ্চল বিশেষ করে সাইবেরিয়া, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি এলাকায় প্রচ- শীতের কারণে বরফ পড়ে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে এবং শীতের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে দল বেঁধে পাখিরা চলে আসে আমাদের এলাকায় বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে যেখানে বিরাজ করে অপেক্ষাকৃত উষ্ণতা। এ সময় প্রায় ৯৮ প্রজাতির পাখি আসে বাংলাদেশসহ আশপাশের অঞ্চলে। ডাহুক, জলপায়রা, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, পানডুবি, গিরিয়া হাঁস ইত্যাদি হরেক প্রজাতির অজস্র পাখি এসে অধিক হারে বাড়িয়ে দেয় শীতের সৌন্দর্যকে। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার হাকালুকি এবং সুনামগঞ্জ জেলার টাংগুয়ার হাওরসহ বাংলাদেশের প্রায় সব হাওর বিলেই এই অতিথি পাখিদের দেখা মিলে এবং তা শুধুমাত্র শীত ঋতুতেই। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিতে পাখি এক বিশাল জায়গা জুড়ে আছে। মৌরিস মেটারলিংক নামে এক বেলজিয়ান নাট্যকার ‘নীল পাখি’ শীর্ষক রচনার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাবান পুরস্কার নোবেল অর্জন করেন। শীতের পাখি আমাদের এক প্রকার সম্পদ। অথচ আজকাল প্রায়ই দেখা যায় এক ধরণের মানুষ নামের পশু বিষটোপ দিয়ে এ সকল পাখিদের হত্যা করে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করছে। শিকারের নামে হত্যা করছে তাদের।
শীতের সকাল এক বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয় আমাদের দেহ মনে। গ্রামের স্বল্প আয়ের মানুষেরা চাদর মুড়ি দিয়ে বসে থাকে ঘরে। কেউবা নাড়ার আগুনের পাশে বসে উত্তাপ গ্রহণ করে শীতার্ত শরীরে। কিন্তু শহুরে নাগরিক জীবনে শীত আসে ভিন্নভাবে। সেখানে ইট শুড়কির চার দেয়াল ঘেরা কংক্রিটের নিচে শীত আসে গরম চায়ের কাপে। অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগামী ব্যস্ত নাগরিকদের দৈনিক পত্রিকা হাতে শীতের সকাল অনুপস্থিত। সেখানে দৃশ্যমান নগর সভ্যতার ছাপ। নগরীর সুসজ্জিত ড্রইংরুমে শীতের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। শীতের সকালের আমেজ কোনো দিনই পায় না ইট পাথরের মাঝে বন্দী হয়ে থাকা উচ্চবিত্তের মানুষেরা। তবে রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, স্টীমারঘাট, ফুটপাত ও উঁচু ভবনের সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র লোকদের জন্য শীত বিশেষ কষ্টের কারণ। কখনো বা শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেকেই অগ্নি প্রজ্বলিত করে সময় অতিবাহিত করে থাকেন। একটু সূর্যের প্রত্যাশা তখন সকলের। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য এমন পরিস্থিতিতে বলেন, ‘হে সূর্য তুমিতো জানো/আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব/সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে/এক টুকরো কাপড়ে কান চেপে কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই।’ শীতে কষ্ট হয় বয়স্ক ও শিশুদের। এ সময় চর্ম জাতীয় রোগ কফকাশির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
পৃথিবীর অনেক শীতলতম কিংবা উষ্ণতম স্থান অপেক্ষা বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এখানে শীত যেমন কষ্টের তেমনই আবার আরামদায়কও। কোনো কোনো অঞ্চলে শীতের তীব্রতা থাকলেও তা সরকারি বেসরকারি সহায়তায় মোকাবেলা করা সহজ হয়ে ওঠে। সাধারণতঃ বড় ধরণের কোনো বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। অপরদিকে শীতের কতিপয় সুযোগ সুবিধা সমাজের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ নানাভাবে উপভোগ করে থাকে। নতুন সব্জি, ফুল, বনভোজন মানুষের জীবনের একঘেয়েমি চলার পথে ছন্দের বিকাশ ও বিন্যাস ঘটায়। বৈচিত্রময় মানব জীবনের পরিপূর্ণতা লাভ করতে হলে শীতকে পূর্ব পরিকল্পিত উপায়ে উপভোগ করার প্রেক্ষাপট তৈরি করতে হবে। উৎসবে বিপর্যয়ে সমানভাবে তাই আহ্বান জানাই শীতকে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT